Monday, November 02, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

গণধর্ষণের পর আত্মহত্যার ৫ দিনেও হয়নি মামলা

মেয়েটির মায়ের অভিযোগ, ‘যারা অপরাধী তাগের (তাদের) শাস্তি দেয় না, কেস না নিয়ে তাগের বাড়ি পাঠায় দেয় ক্যাম্মায়ে?’

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার আড়পাড়া ইউনিয়নে গণধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরী। তবে এরপর ৫ দিন পেরিয়ে গেলেও মামলা নেয়নি পুলিশ বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীর পরিবারের।

রবিবার (১ নভেম্বর) দুপুরে ওই বাড়িতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় শোকে স্তব্ধ পুরো পরিবার।  

সাংবাদিকদের দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মা জেসমিন খাতুন। 

পরিবারটির অভিযোগ, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৭ টায় স্কুলে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ওই তরুণী। স্কুলে যাওয়ার পথে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে পৌঁছুলে মোটরসাইকেলে তিন যুবক তাকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর মাগুরায় একটি নদীর পাশে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করে।

একপর্যায়ে তাদের হাত থেকে বাঁচতে নদীতে ঝাঁপ দেয় ওই তরুণী। তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে উদ্ধার করে পুলিশকে ফোন দেয় এবং ঘটনাস্থলে এসে তারা তাকে উদ্ধার করে নাকোল পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যায়।  

এরমধ্যে একদিন দুপুরে পুলিশ ফাঁড়ির বাথরুমে দরজা লাগিয়ে বিষাক্ত হারপিক পান করে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে সে। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে মাগুরা হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং পরদিন উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

সেখানে ১১ দিন চিকিৎসা শেষে বাড়িতে নিয়ে যায় পরিবারের সদস্যরা। এরপর থেকে শারীরিক নানা জটিলতা নিয়ে বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা চলছিল তার। 

গত ২৬ অক্টোবর দিবাগত রাত একটার দিকে বাড়িতেই মারা যায়। খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেন মধুখালী থানা পুলিশ। পরে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।  

পরিবারটির অভিযোগ, ধর্ষণকারীদের মধ্যে রয়েছে পাশ্ববর্তী মাগুরা জেলার নাকোল ইউনিয়নের রাফি শেখ (২১), রায়নগর গ্রামের রাহুল শেখ (২০) ও সায়মন বিশ্বাস (২০) নামে তিন যুবক। 

ওই মেয়ের মৃত্যুর তিনদিন আগে পরিবারের সদস্যদের ধারণ করা একটি ভিডিও সাক্ষাৎকারেও ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জড়িত এই ৩ যুবকের নাম উল্লেখ করে মেয়েটি। 

পুরো ঘটনায় তার মামাতো ভাইয়ের সহযোগিতায় হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন ভুক্তভোগী মেয়েটি। 

মেয়েটির ভগ্নিপতি অভিযোগ করে বলেন, “আমার শ্যালিকার তিন মাস আগে অন্য জায়গা কাবিন হয়েছিল। মেয়েটি সুস্থ হওয়ার পর ধর্ষণের বিষয় জানিয়েছিল৷ এরপর ওর নতুন বিয়ে হওয়ায় আমরাও কোথাও জানাইনি। কিন্তু সে এসব মেনে নিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত চলে গেল। আমরা এই চারজনের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।"

ভুক্তভোগীর মায়ের ভাষ্যমতে, এ ঘটনার পর পরিবারের সদস্যদের থানায় ডেকে নেন মধুখালী থানা পুলিশ। পরে তাদের শ্রীপুর থানায় পাঠানো হয়। সেখানে মামলা না নিয়ে একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর রেখে তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

তার অভিযোগ, "যার সন্তান যহন হারায় যায় তারা কি বইস্যা থাহে? কিন্তু এই পুলিশ-দারোগা, যারা অপরাধী তাগের (তাদের) শাস্তি দেয় না, খালি ওগো টাহার দরকার! দুই থানায়তে কেস নিলো না ক্যাম্মায়ে (কেমনে)? কেস নেবে না কেন বলেন? আপনি যে অপরাধী, আপনার শাস্তি নাই? যার মৃত্যু অয়ে গ্যাছে- কেস (মামলা) না নিয়ে তাগের বাড়ি পাঠায় দেয় ক্যাম্মায়ে?"

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওলি মিয়া বলেন, “এ ঘটনায় আমরা একটি তদন্ত প্রতিবেদন করেছি। তদন্তে ওই ঘাট এলাকায় ধর্ষণের শিকার হয়েছে, এমন আলামত পাওয়া যায়নি। কারণ, ঘাটটির আশপাশে ঝোপঝাড় নেই এবং ফাঁকা। তাছাড়া সেখানে মানুষের যাতায়াত এবং সার্বক্ষণিক মাঝি থাকে। তারা কেউ এ ধরনের দৃশ্য দেখেনি। তবে অন্য কোথাও ধর্ষণ করেছে কি-না সেটা আমার জানা নেই।"

তিনি আরও বলেন, "মেয়েটিকে যখন উদ্ধার করা হয় তখন ধর্ষণের কথা জানায়নি। এমনকি দেড়মাসেও কেউ জানায়নি। তার মৃত্যুর পর  একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে পরিবার, যা রহস্যজনক। এছাড়া পরিবারের অভিযোগমতে, তাকে বাড়ির পাশ থেকে তুলে নেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে মধুখালী থানা পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নেবে।"

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকদেব রায় বলেন, "ঘটনাটি জানার পর শ্রীপুর থানায় যোগাযোগ করি এবং ওসি পরিবারটিকে থানায় পাঠিয়ে দিতে বলে। এরপর তারা শ্রীপুরে গেলে একটি অপমৃত্যুর মামলা নেওয়া হয়।”

“পরবর্তীতে জানতে পেরেছি, মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। কিন্তু দেড়মাস আগের ঘটনাটি আমাদেরকে কেউ জানায়নি। তবে এ বিষয়ে পরিবার লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

   

About

Popular Links

x