মিয়ানমারে দমন-পীড়নের শিকার রোহিঙ্গা মুসলমানরা অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। ২০১৭ সালের আগে চার লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। সে বছর মিয়ানমারে দমন অভিযান শুরুর পর এই সংখ্যা ১১ লাখ ছাড়িয়ে যায়।
এই রোহিঙ্গা শরণার্থীরা অধিকাংশই থাকছে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার আশ্রয় শিবিরে। পরবর্তীতে কিছু রোহিঙ্গাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় নোয়াখালীর ভাসানচরে। ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি অভিযোগ উঠেছে, ভাসানচরে সরিয়ে নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মির (আরসা) অনেক সদস্যও রয়েছে।
অভিযোগ আছে, আরসার সাবেক সদস্যদের মধ্যে ভাসানচরে নেওয়া হয়েছে মৌলভী হাসান শরীফ, মুফতি জিয়া রহমান, রফিক উল্লাহ, মুস্তফা, ফারক, আবু বক্কর ও আইয়ুবকে। এদের মধ্যে অন্তত তিনজন রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লা হত্যাকাণ্ডে জড়িত। তাদের নাম অভিযুক্ত ২৯ জনের তালিকায় রয়েছে। মুহিবুল্লা হত্যা মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।
হত্যাকাণ্ডের শিকার রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাফাইল ছবি/রয়টার্সএই পরিস্থিতিতে ভাসানচরের সাধারণ রোহিঙ্গারা উদ্বিগ্ন। তারা বলছে, ক্যাম্পে নানা অপরাধে যুক্ত এমন আরসা সদস্যরা ভাসানচরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাজার ও মসজিদে তাদের দেখা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ভাসানচরে যাওয়া আরসা সদস্যদের মধ্যে একজন আবু আনাস। সে আরসার দ্বিতীয়-সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ছিল। তবে ভাসানচরে তার সম্পর্কে খুব কম মানুষই জানে।
ভাসানচরের একজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, আরসার চাপের মুখে আনাস ভাসানচরে এসেছে। আরসা সদস্যরা তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছিল। অবশেষে কোনো উপায় না পেয়ে সে ভাসানচরে আসতে বাধ্য হয়।
আরেকজ রোহিঙ্গার ভাষ্য, তার পরিবারের সদস্যরা এর আগে আরসার নির্যাতনের শিকার হয়েছে। সে ভাসানচর প্রশাসনের কাছে আরসা সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে চায়; তবে এ বিষয়ে প্রশাসন কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে সে বিষয়ে তার সন্দেহ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই রোহিঙ্গা বলে, “রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লা হত্যাকাণ্ডে জড়িত আরসা সদস্যরা ভাসানচরে কীভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে তা বোধগম্য হচ্ছে না। এই বিষয়টি ভেবে আরসার সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতেও ভয় পাচ্ছি।”
আরও পড়ুন- পরিবারের অভিযোগ: মুহিবুল্লাকে খুন করেছে আরসা
মুহিবুল্লা রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন দেশে পাচার প্রতিরোধে সোচ্চার ছিলেন। এছাড়া রোহিঙ্গাদের খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন ধরনের অপকর্মের বিরোধিতা করতেন তিনি। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন, অধিকার আদায় ও শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে এআরএসপিএইচ নামে সংগঠন তৈরি করেছিলেন তিনি।
শিক্ষিত ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষ হওয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আসা আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি ও বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে মুহিবুল্লার যোগাযোগ হতো। তিনি সাধারণ রোহিঙ্গাদের কাছেও জনপ্রিয় ছিলেন। হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাত করেছিলেন এই রোহিঙ্গা নেতা।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে কক্সবাজারের কুতুপালং ক্যাম্পে তার অফিসে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
মুহিবুল্লা হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন শোক প্রকাশ করে বলেছিলেন, “বিশ্বব্যাপী রোহিঙ্গা মুসলমানদের মানবাধিকারের পক্ষে সাহসী কণ্ঠস্বর ছিলেন মুহিবুল্লা।” এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করেছিলেন ব্লিঙ্কেন।
মুহিবুল্লা হত্যাকাণ্ডের পর জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টেফানি ট্রেম্বলেও এক বিবৃতিতে এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন- বন্ধ হলো রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সবচেয়ে বড় স্কুল
মুহিবুল্লা হত্যাকাণ্ডের পরে তার পরিবারের সদস্যরা হুমকির মুখে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। তাদের একজন সাম্প্রতিক ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, “এটি স্পষ্টত ইঙ্গিত দেয় যে মুহিবুল্লা হত্যাকাণ্ডের কোনো তদন্ত হবে না, বিচার হবে না।”
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলীও একই মত ব্যক্ত করেন।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক ঘটনায় জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এর কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এক রোহিঙ্গা আইনজীবী।
ইউরোপে বসবাসকারী রোহিঙ্গা অ্যাডভোকেট নে সান লুইন বলেন, “এসব ঘটনার মাধ্যমে বোঝা যায় ইউএনএইচসিআর শরণার্থীদের সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য থেকে সরে এসেছে।”
তিনি আরও বলেন, “শরণার্থীদের সঙ্গে সংঘটিত অপরাধের বিষয়ে অবশ্যই ইউএনএইচসিআরকে গুরুত্ব দিতে হবে। অপরাধীরা কীভাবে নিরাপদে ঘুরে বেড়াচ্ছে? সংস্থাটিকে এসব ঘটনার যথাযথ তদন্ত করতে হবে। নিরীহ শরণার্থীদের সুরক্ষায় আরও প্রচেষ্টা চালাতে হবে।”
শফিউর রহমান একজন সাংবাদিক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা।



