Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

জাবিতে অতীত হওয়ার পথে অতিথি পাখি

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, বহিরাগতদের অবাধে বিচরণ, গাড়ির উচ্চ শব্দের সমস্যার ফলে বর্তমানে লেকগুলোতে পরিযায়ী পাখি কম দেখা যায়

আপডেট : ৩০ মে ২০২৩, ০৯:৫৭ পিএম

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) দেশে পরিযায়ী বা অতিথি পাখিদের একটি সুপরিচিত আশ্রয়স্থল। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বলছে, আশঙ্কাজনক হারে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পরিযায়ী পাখির আগমন কমেছে। কারণ হিসেবে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, সময়মতো লেকগুলো সংস্কার না করা, গাছ কাটা, লেক ইজারা দেওয়া, বহিরাগতদের উৎপাতসহ নানা অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র জানায়, জাবিতে বর্তমানে মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় ২৩টি প্রকল্পের কাজ চলছে। অনেকগুলো প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে, অনেকগুলো আবার চলমান। এসব প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে অনেক গাছ কাটা পড়েছে, যা পাখির জন্য বড় হুমকি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, বহিরাগতদের অবাধে বিচরণ, যানবাহনরে উচ্চ শব্দ ইত্যাদি কারণে আজকাল লেকগুলোতে পরিযায়ী পাখি কম দেখা যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান বলছেন, ‍‍“উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অনেক জায়গায় গাছ কাটা পড়ছে। বিষয়টি পাখিদের বাসস্থান ও বংশবিস্তারের অন্তরায়। লেকের পাশের গাছগুলো পাখিদের বাচ্চা ফোটানোর মতো ততোটা উপযোগী নয়। সংরক্ষণ উপযোগী বাকি জায়গাগুলো যদি এখনও রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়, আরও বেশি পরিমাণে গাছ লাগানো যায় তাহলে সবুজের পরিমাণ বাড়বে, তখন ক্যাম্পাস পাখি থাকার উপযোগী হবে।”

পরিসংখ্যান বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মঈম হাসান বলেন, “এখন আর আগের মতো আর পাখি দেখা যায় না। আমরা যখন এই ক্যাম্পাসে আসি তখনও পাখি দেখা যেত। কিন্তু দিন দিন সেই সংখ্যা কমে গেছে। কেন কমেছে তার সঠিক কারণ বলা কঠিন। তবে অবকাঠামো নির্মাণে পরিকল্পনার অভাব, আবহাওয়ার পরিবর্তন, জলাশয়ের পরিবেশ নষ্ট, বহিরাগত ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের উৎপাত পাখিদের সংখ্যা হ্রাসের কারণ হতে পারে।”

এক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকাও অপ্রতুল বলে মনে করেন এই শিক্ষার্থী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (এস্টেট) আব্দুর রহমান বলেন, “ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ বাজেটে পরিযায়ী পাখি ও লেক নিয়ে আলাদা কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয় না। ক্যাম্পাস উন্নয়ন খাতের মধ্যেই এই খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতি বছর বর্ষাকালে পলি মাটি, আবর্জনা ও অন্যান্য কারণে লেকগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ২০১২-১৩ সালে তৎকালীন উপাচার্য আনোয়ার হোসেনের সময়ে কাবিখার অন্তর্ভুক্ত একটি বরাদ্দ থেকে লেক সংস্কারের জন্য প্রায় আড়াই কোটি টাকা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে দেওয়া হয়। তখন লেক সংস্কার করা হলেও পরে টাকার অভাবে লেক সংস্কার করা হয়নি। পরবর্তীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে জাবি প্রশাসনিক অফিস থেকে অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হলেও তা আর পাওয়া যায়নি।”

আব্দুর রহমান আরও জানান, প্রতি বছর অক্টোবর মাসে লেকগুলো পরিষ্কার করতে হয়। এজন্য বাইরে থেকে ঘণ্টা বা দিন হিসেবে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। গত বছর অর্থাভাবে লেকগুলো সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার করা হয়নি।

ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে বেশ কয়েকটি লেক অর্থের বিনিময়ে ইজারা দেওয়া হয়েছে। ফলে লেকগুলোতে উন্মুক্তভাবে পাখি বিচরণ, খাদ্য সংগ্রহ ইত্যাদিতে বাধা সৃষ্টি করেছে। 

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জাবি কর্মকর্তা বলেন, “যেসব লেকগুলোতে পাখি বিচরণ করে না ওইসব লেক ইজারা দেওয়া হয়েছে। ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্যাম্পাসের পাখি গবেষকদের পরামর্শ ও অনুমতি নেওয়া হয়েছে।”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা পরিযায়ী পাখির দল/মাহবুব রিনাদ

তবে এ বক্তব্য মানতে নারাজ পাখি গবেষক কামরুল হাসান। তিনি বলেন, “লেক ইজারার ব্যাপারে আমাদের কিছু জানায়নি বা পরামর্শও নেয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটিই ঠিক করে দেয় কোন লেকটি ইজারা দেওয়া হবে, কোনটি হবে না। আর দুঃখের বিষয় হলো এই কমিটিতে গত ১৫-২০ বছর যাবত প্রাণীবিদ্যা বিভাগের কাউকে রাখা হয়নি।”

তিনি আরও বলেন, “ইজারা দেওয়া লেকগুলোতে পাখিরা বিচরণ করতে পারে না। ইজারাদাররা বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করে যা পরিযায়ী পাখির জন্য হুমকি। কিছু লেকে মাছ চাষের কারণে পানি অনেক বেশি পরিষ্কার করে ফেলা হয়, এতে আর পাখিদের প্রাকৃতিক খাবার থাকে না।”

বহিরাগতদের উৎপাত প্রসঙ্গে প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা সুদীপ্ত শাহীন বলেন, “অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি এই চার মাস ক্যাম্পাসে প্রচুর বহিরাগত আসে। ইদানিং আরেক অরাজকতা দেখা যাচ্ছে, অনেকে ফ্যামিলি গেট টুগেদার করতে আসছে জাহাঙ্গীরনগরে। এগুলো আমরা নিরুৎসাহিত করেছি, বন্ধের চেষ্টা করছি। মাঝে মধ্যে নিরাপত্তার স্বার্থে বহিরাগতদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হলে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী, কর্মকর্তাদের সহায়তায় তারা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক শিক্ষার্থী ও বর্তমান শিক্ষক বলেন, “আগের সময়ের তুলনায় ক্যাম্পাসে পাখির পরিমাণ অনেক কমেছে। বর্তমানে ক্যাম্পাসে গাড়ির সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে, গাড়ির উচ্চ শব্দে পাখিরা ভয় পায়। ছুটির দিনগুলোতে বহিরাগতদের অনেকে পাখির দিকে ঢিল ছুঁড়ে; যার ফলে এখন পরিবহন চত্বরের পাশের লেকগুলোতে পাখি বসে না।”

এ বিষয়ে প্রশাসনের মনোযোগী হওয়া উচিত বলে মনে করেন এই শিক্ষক। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার রহিমা কানিজ গণমাধ্যমকে বলেন, “পাখিদের অভয়ারণ্য হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যা যা করা দরকার আমরা তাই করব।”

   

About

Popular Links

x