Saturday, July 11, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

‘যে হারে দাম বাড়ছে, কয়দিন পর তো ইলিশ কিনে খেতে পারব না’

ইলিশ ধরা পড়ছে কম, তবে বেড়েছে আকার, সেইসঙ্গে বেড়েছে দাম

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৪, ০৫:৩৭ পিএম

ভরা মৌসুমেও বরগুনার নদ-নদীতে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা। বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক জেলেদের জালে কিছু মাছ উঠলেও তা গত বছরের তুলনায় কম। জেলেরা বলছেন, সাগরে ৬৫ দিন মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশ শিকারে গিয়ে কেউ কেউ মাছের দেখা পেলেও অনেকেই ফিরছেন খালি হাতে। বৈরি আবহাওয়া, অবৈধ জালে মাছ শিকার, ট্রলিং জাহাজের দাপট ও ভারতীয় জেলেরা অনুপ্রবেশ করায় ভরা মৌসুমেও ইলিশের এমন আকাল দেখা দিয়েছে। তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর বেড়েছে মাছের আকার। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে মণপ্রতি ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে ইলিশের দাম।

বরগুনা জেলা মৎস্য বিভাগ সুত্রে জানা গেছে, জুলাই থেকে অক্টোবর ইলিশের ভরা মৌসুম। প্রতিবছর এ সময় নদী ও সাগরে ধরা পড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে রূপালী ইলিশ। কিন্তু এ বছরের চিত্র অনেকটা ভিন্ন। ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে ২৩ জুলাই থেকে জেলেরা সাগরে নামলেও জালে ধরা পড়ছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ।

শনিবার (১৭ আগস্ট) সকালে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বিএফডিসি মৎস্য ঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, ভোর রাত থেকেই ঘাটে এসে নোঙ্গর করছে বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকারে যাওয়া ট্রলারগুলো। সকাল ৭টা নাগাদ দেখা গেছে ঘাটে কমপক্ষে ২০টি ট্রলার নোঙ্গর করা রয়েছে। এর মধ্যে কিছু কিছু ট্রলারে মাছের দেখা পেলেও অধিকাংশ ট্রলারেই কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মেলেনি।

নোঙ্গর করা অবস্থায় ছিল এফবি তরিকুল নামের একটি মাছ ধরা ট্রলার। ১০ দিন আগে সাড়ে চার লাখ টাকার জ্বালানি ও রসদ নিয়ে ১৮ জন জেলেসহ মাছ শিকারে গিয়েছিল তারা। গতকাল তারা ঘাটে ফিরে এসেছে সামান্য কিছু মাছ নিয়ে। জেলেরা জানান, যে পরিমাণ মাছ তারা পেয়েছেন তাতে লাভ তো দূরের কথা খরচের টাকাই উঠবে না তাদের।

 

এফবি তরিকুল ট্রলারের মাঝি জয়নাল বলেন, “আমরা ১৮ জন জেলে নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সাগর বেশি উত্তাল ছিল তাই আমরা প্রথম দিকে জাল ফেলতে পারিনি। পরে কিছুটা ভেতরের দিকে এসে জাল ফেলেছিলাম কিন্তু সেখানে তেমন মাছ ওঠেনি। ৫টা খেও দিয়েছিলাম তাতে যে পরিমাণ মাছ নিয়ে ফেরত এসেছি এরকম চলতে থাকলে মহাজন পথে বসবে। আর আমাদের অবস্থা তো আরও খারাপ যাবে।”

বরগুনার ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরি বলেন, “উপকূলের বিভিন্ন স্থানে এখনও নিষিদ্ধ জালে ইলিশের পোনা নিধন করা হচ্ছে। এছাড়াও ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময় বাংলাদেশের জেলেরা মাছ শিকার থেকে বিরত থাকলেও ভারতীয় জেলেরা ঠিকই বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করে মাছ শিকার করে নিয়ে যায়। এছাড়াও চট্টগ্রামের ট্রলিং জাহাজের দাপট তো রয়েছেই। তারা যেখানে জাল ফেলে সেখান থেকে সবকিছু কাছাইয়া নিয়ে যায়।”

বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন(বিএফডিসি) পাথরঘাটা কার্যালয় সুত্রে জানা গেছে, গতবছর ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে ২৩ জুলাই থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত বিএফডিসি ঘাটে মোট মাছ বিক্রি হয়েছিল ৫৩৯.৮৯ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ইলিশ ছিল ৩১৭.৪১ মেট্রিক টন, অন্যান্য মাছ ছিল ২২২.৪৮ মেট্রিক টন। এ বছর ২৩ জুলাই থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত মোট মাছ বিক্রি হয়েছে ৫০১ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ইলিশ ২৭৯.৪৭ মেট্রিক টন ও অন্যান্য মাছ ২২১.৬৪ মেট্রিক টন। যা গত বছরের তুলনায় কম।

পাথরঘাটা বিএফডিসি মৎস্যঘাটের মার্কেটিং অফিসার ও মৎস্য গবেষক বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, “গতবছরের তুলনায় এখন পর্যন্ত ইলিশ কম দেখা গেলেও এ বছর ইলিশের আকৃতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা অবশ্যই ইলিশের জন্য ভালো দিক। সরকার আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা যথাযথ ভাবে পালনসহ এ বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টি থাকায় মা ইলিশ কিংবা বড় ইলিশগুলো বঙ্গোপসাগরের মোহনাসহ উপকূলের নদ-নদীতে প্রবেশ করেছে। আমরা আশাবাদী এ ধারা অব্যহত থাকলে আরো বেশি ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।”

শূন্য হাতে ফিরতে হচ্ছে জেলেদের/ঢাকা ট্রিবিউন

পাথরঘাটা বিএফডিসি মৎস্য ঘাটের ব্যবস্থাপক লে. কমান্ডার জিএম মাসুদ শিকদার বলেন, “গত বছর ৫৬ দিনের নিষেধাজ্ঞার পরে যে পরিমাণ মাছ ধরা পড়েছিল এ বছর তার চেয়ে কম। মাছ পাওয়া না পাওয়ার ওপর সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির বিষয়টি নির্ভর করে। গতবছরের  তুলনায় এ বছর সমুদ্র বেশি উত্তাল ছিল। অনেকেই সাগরে গিয়ে জাল ফেলতে না পেরে ফিরে এসেছে। এর ফলে সরকারও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এখন ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে আশা করছি মাছও বৃদ্ধি পাবেন রাজস্বও বাড়বে।”

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বিএফডিসি ঘাট, তালতলী মৎস্য ঘাট, বরগুনা পৌর মৎস্য বাজারসহ বিভিন্ন বাজার ও মৎস্যঘাট ঘুরে দেখা গেছে, একদিকে যেমন ইলিশ কম পাওয়া যাচ্ছে ঠিক তেমনি গতবছরের তুলনায় এবার বরগুনার পাইকারি বাজারে ইলিশের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। গতবছর ১ কেজির ওপরে ইলিশের মণ বিক্রি হয়েছে ৫৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা। এ বছর তা বিক্রি হচ্ছে ৬০ হাজার থেকে ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। গতবছর ৮০০ গ্রাম থেকে ১ কেজির নিচের ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ৪৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকায়। এ বছর তা বিক্রি হচ্ছে ৫৪ হাজার থেকে ৫৬ হাজার টাকায়। ৫০০ গ্রাম থেকে ৭০০ গ্রাম ইলিশ গত বছর বিক্রি হয়েছে ৩৮ হাজার থেকে ৪২ হাজারয়। এ বছর তা বিক্রি হচ্ছে ৪৫ হাজার থেকে ৪৮ হাজার টাকায়। ৫শ গ্রামের ছোট ইলিশ এ বছর বিক্রি হচ্ছ ৪০ হাজার থেকে ৪২ হাজার টাকায়, গত বছর যা বিক্রি হয়েছিল ৩২ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকায়।

বরগুনা পৌর মাছ বাজারের কয়েকজন ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বরগুনায় খুচরা বাজারে ১ কেজির ওপরের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত। ১ কেজি সাইজের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১,৪০০ থেকে ১,৬০০ টাকা। ৮০০ গ্রামের ওপরের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকায়। ৫০০ গ্রামের ওপরের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা। আর ৫০০ গ্রামের নিচের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি দরে।

বরগুনা মাছ বাজারের ক্রেতা ইব্রাহিম বলেন, “যে হারে ইলিশের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে আর কিছুদিন পর আর আমরা ইলিশ কিনে খেতে পারব না। প্রতিবছরই শুনি ইলিশের উৎপাদন বাড়ে তাহলে ইলিশের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে কেন? এর কি উত্তর কারো কাছে আছে?”

বরগুনা পৌর মাছ বাজারের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির লিটন বলেন, “গত বছরের চেয়ে এ বছর বাজারে কম ইলিশ আসছে যার ফলে মাছের দামটাও একটু বৃদ্ধি পেয়েছে। বরগুনার মাছ দেশের বিভিন্ন জেলা রপ্তানি হয় বলেও মাছের দাম একটু এখানে বেশি।” মাছের সরবরাহ বাড়লে দামও কমবে বলেও জানান তিনি।

বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মহসীন বলেন, “বৈরি আবহাওয়া শেষ হলেই আশানুরুপ মাছ ধরা পড়বে জেলেদের জালে। প্রতিবছরই আমাদের ইলিশের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।” সেইসঙ্গে ভারতীয় ট্রলার অনুপ্রবেশ ঠেকাতে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা অব্যহত আছে বলেও জানান তিনি।

   

About

Popular Links

x