মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষ বেড়ে চলায় পুরো অঞ্চলজুড়ে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী তেহরানে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, ফলে একাধিক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে তেহরান।
এমন তীব্র উত্তেজনার মধ্যে তেহরানের একটি বড় অংশের বাসিন্দাদের এলাকা ছেড়ে অবিলম্বে অন্যত্র সরে যেতে বলেছে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী (আইডিএফ)। অন্যদিকে, ইসরায়েলের তেল আবিব শহরের বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। ফলে বৃহত্তর সংঘাতের শঙ্কা আরও বেড়েছে।
এমন নজিরবিহীন সংঘর্ষের মধ্যেও ইরানে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা এখন পর্যন্ত নিরাপদ রয়েছেন, যদিও দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলা পুরো অঞ্চলকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায় ইসরায়েল। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রবিবার জানিয়েছে, গত শুক্রবারের পর থেকে ইরানজুড়ে ইসরায়েলের হামলায় মোট ২২৪ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন পারমাণবিক বিজ্ঞানীও রয়েছেন, এবং আহত হয়েছেন শত শত মানুষ।
জবাবে ইরানও ইসরায়েলের জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, এতে বহু হতাহত হয়েছে। এই ইরান-ইসরায়েল পাল্টা হামলার মধ্যে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং কূটনৈতিক সংযমের আহ্বান জানিয়েছে।
সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ দূতাবাস জরুরি হটলাইন নম্বর চালু করেছে। এছাড়াও বাংলাদেশিদের সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। ইরানের বিভিন্ন শহরে অবস্থানরত ৬৬ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নিরাপদে রয়েছেন বলেও নিশ্চিত করেছে দূতাবাস।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সরকার বাংলাদেশিদের তেহরানের বাইরে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
ইসরায়েলের চালানো হামলার জেরে তেহরানজুড়ে বাজছে সতর্কতামূলক সাইরেন। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মনে, কিন্তু তেহরানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলার কর্মকর্তা ওয়ালিদ ইসলাম জানিয়েছেন, বাংলাদেশিদের মধ্যে এখনও শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
তিনি বলেন, “ইরান ও তুরস্কে নিযুক্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূতরা একসঙ্গে কাজ করছেন। বৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের তুরস্ক হয়ে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। সীমান্ত থেকে দূরে হওয়ায়, সবাইকে আপাতত তেহরানের আশপাশের এক নিরাপদ স্থানে রাখা হবে, যতক্ষণ না ভিসা সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।”
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জরুরি প্রয়োজনে তেহরানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জরুরি প্রয়োজনে ঢাকায় স্থাপন করা হটলাইনে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার এই হটলাইন শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয়; প্রায় ৮০০ বৈধ বাংলাদেশি, ৪০০ চিকিৎসারত রোগী এবং আনুমানিক ৮,০০০ থেকে ১২,০০০ অবৈধ অভিবাসীদের সাহায্য করার উদ্দেশ্যে চালু করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মো. হুমায়ুন কবীর ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি যাতে যোগাযোগ বজায় থাকে। কিন্তু ইরানে মাঝে মাঝে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। তবে আমাদের ওয়েস্ট এশিয়া ফোকাল পয়েন্ট প্রতি মুহূর্তে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।”
তিনি আরও বলেন, “ইরানে বসবাসরত সকল বাংলাদেশি নাগরিক ও তাদের স্বজনরা দূতাবাসে ফোন করে তাৎক্ষণিক তথ্য, নিরাপত্তা নির্দেশনা বা উদ্ধার পরিকল্পনার বিষয় জানতে পারবে। কনস্যুলার কর্মীরা প্রয়োজন হলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহায়তায় নিরাপদে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করবেন।”
‘স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও শঙ্কার সহাবস্থান’
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, এক অদ্ভুত স্বাভাবিকতা ও শঙ্কার মধ্যে বসবাস করছেন তারা। তেহরানে অবস্থিত খাজা নাসিরুদ্দিন তূসী প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. শাকিল হোসেন বলেন, “গত রবিবার আমাদের পাশের হোস্টেলে হামলা হয়েছে। এর পরপরই আমাদের সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে অ্যাম্বুলেন্স ও বাস চলাচল স্বাভাবিক ছিল। বেশিরভাগ হামলাই রাতে হচ্ছে, এখনও সাধারণ মানুষ মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের সদরদপ্তর ও বিমান ঘাঁটি ঘিরে থাকা তেহরানের পশ্চিমাঞ্চলেই প্রথম বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। অনেকেই তখন উত্তর দিকে, কাস্পিয়ান উপকূলের দিকে পালিয়ে যান।”
৫০০ কিলোমিটার দূরে ইরানের কোম শহরে অবস্থিত আল-মোস্তফা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মো. মুততাকিন বলেন, “এখানে এখনও কোনো বিস্ফোরণের শব্দ শুনিনি। জীবন স্বাভাবিক- দোকানপাট খোলা, নামাজ হচ্ছে, শিক্ষকরাও আমাদের খোঁজখবর নিচ্ছেন।”
ইরানের তেহরানে অবস্থিত শহিদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো. নাকিব হাসান বলেন, “অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবা সচল রয়েছে, যান চলাচলও স্বাভাবিক। তবে আমাদের সবার মধ্যেই উদ্বেগ কাজ করছে- কারণ এই সংঘাত শহরের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।”
তবে সবাই চুপচাপ বসে থাকতে চান না। আলজাহরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মারজিয়া আলী সালসাবিল বলছেন, “আমাদের দূতাবাসকেও এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। ভারত ও পাকিস্তান ইতোমধ্যে তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নিচ্ছে। আমাদের দূতাবাসকেও ততটাই দ্রুততা দেখাতে হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে দূতাবাসের নতুন হটলাইনের তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে, রেডিও তেহরানের সহকারী বার্তা সম্পাদক মো. আমীর হোসেন বলেন, “ইরান সরকার তখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তাই এত বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এখন সরকার চেষ্টা করছে সব নাগরিককে দেশি ও বিদেশি সুরক্ষা দিতে।”
ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, “এই সংকট আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার নাজুকতা তুলে ধরছে। আমরা ইরানের সঙ্গে সম্পর্ককে মূল্য দিই, কিন্তু যেকোনো বিপদের আশঙ্কায় আমরা আমাদের নাগরিকদের ঘরে ফেরাতে প্রস্তুত।”
‘আমরা প্রয়োজনীয় সবকিছু করব’
১৩ জুন তেহরান শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েল জানিয়েছে, তাদের আকস্মিক বিমান অভিযানটি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো হয়- এতে ইরানের বহু বিজ্ঞানী, সামরিক কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন। এর পাল্টায় ইরানও ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
এই দ্রুতগতির উত্তেজনা বৈশ্বিক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে: চীনসহ বিভিন্ন দেশ অবিলম্বে পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানিয়েছে, আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন নেতারা বলেছেন, কেবল আলোচনাই এই সংকটকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৩ জুন ইসরায়েলের হামলাকে জাতিসংঘ সনদের সরাসরি লঙ্ঘন উল্লেখ করে তা “নির্বিচার আগ্রাসন” হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, “এ হামলা জাতিসংঘ সনদ, আন্তর্জাতিক আইন এবং ইরানের সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক ও বিশ্বশান্তির ওপর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী।”
বাংলাদেশ এ ঘটনায় সকল পক্ষকে সংযত থাকার এবং উত্তেজনা বাড়ায়- এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানায়। পাশাপাশি, কূটনৈতিক উপায়ে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ।
এই মুহূর্তে, বাংলাদেশিদের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা।
বাংলাদেশিদের পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা আমাদের নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছু করব।”



