আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দাম বাড়ছে। ব্যাংকে ডলারের দাম দুই টাকার মতো বেড়েছে। তবে খোলাবাজারে ডলারপ্রতি বেড়েছে ৫ থেকে ৭ টাকা। এই পরিস্থিতিতে নতুন অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি বিলাসপণ্যের ওপর আমদানি পর্যায়ে বাড়তি আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বসানোর কথা ভাবছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাতে এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে দৈনিক প্রথম আলো।
সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী বাজেটে নতুন করে যে অর্ধশতাধিক পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক বসানো হচ্ছে, তার কোনোটির ওপর আমদানি শুল্ক বাড়বে, আবার কোনোটির ওপর বাড়তি সম্পূরক শুল্ক বসবে। আবার কিছু পণ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বসবে।
আমদানি পর্যায়ে বাড়তি শুল্ক বসানোর তালিকায় আছে উচ্চ সিসির ব্যক্তিগত গাড়ি, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, এসি, ওয়াশিং মেশিন, ওভেন, টেবিলওয়্যার, শোপিস, ঝাড়বাতি, সাধারণ বাতি, সাবান, শ্যাম্পু, বিস্কুট, চকলেট, পাদুকা, টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার, টেবিলওয়্যার, মদজাতীয় পণ্য ইত্যাদি।
ইতিমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কিছু পণ্য সাময়িক আমদানি নিষিদ্ধ করার চিন্তাভাবনা করেছিল। কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বাণিজ্য উদারীকরণের শর্ত হিসেবে আপাতত তাও সম্ভব হচ্ছে না। তাই এখন বাড়তি শুল্ক বসানোর পথেই হাঁটছে সরকার।
তবে, সরকারের এমন উদ্যোগে ইতিবাচক কোনো প্রভাব দেখছেন না বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর।
বিলাসপণ্য/বিগস্টকতিনি সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, শুল্ক বাড়ানোর এই উদ্যোগ তেমন কাজে আসবে না। যারা এ ধরনের বিদেশি বিলাসপণ্য ব্যবহার করেন, তারা দাম নিয়ে চিন্তা করেন না। তারা কিনবেনই, তাই আমদানিও কমানো যাবে না। সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্ত জনগণের কাছে জনপ্রিয় হয় বলেই নেওয়া হয়। এটা অনেকটা মলম লাগানোর মতো।
এর আগে গত ২৩ মে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ১৩৫টি পণ্যের আমদানি পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ৩% থেকে বাড়িয়ে ২০% করে। ওই তালিকায় মূলত আসবাবপত্র, প্রসাধনসামগ্রী, ফুল ও ফলজাতীয় পণ্য আছে।
এসব পণ্যের বাইরে তখন তুলনামূলক কম প্রয়োজনীয় ও বিলাসপণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক বসানো হয়নি। শুল্ক কর্মকর্তাদের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি বলছে, জাতীয় সংসদের অনুমোদন ব্যতীত আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক বসাতে পারে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এনবিআরের শুধু নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বসানোর এখতিয়ার আছে। সে ক্ষেত্রে ৫০% পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বসানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের এই উদ্যোগকে যৌক্তিক বলে মনে করেন সংস্থাটির সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ।
তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অর্থনীতির এই পরিস্থিতিতে কৃচ্ছ্রসাধনের পথে যেতেই হবে। আপাতত যেসব জিনিস সাধারণ মানুষের জন্য জরুরি নয়, সেগুলো বিদেশি মুদ্রা খরচ করে কেন আনব? বাড়তি শুল্ক-কর বসালে বরং স্থানীয় শিল্প খাত সুরক্ষা পাবে। দেশের যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে এ ধরনের কম গুরুত্বপূর্ণ পণ্য আমদানিতে নিরুৎসাহিত করার উদ্যোগ কাজে লাগবে।
যেসব পণ্যে বাড়তি শুল্ক অব্যাহত
আসবাব, প্রসাধন, ফুল-ফলে গত ২৩ মে বসানো ২০% নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আগামী অর্থবছরেও অব্যাহত রাখা হতে পারে।
এনবিআরের সূত্রের বরাতে প্রথম আলো আরও বলছে, আগামী ৩০ জুন ওই সব পণ্যের আমদানির ওপর বাড়তি শুল্কের মেয়াদ শেষ হবে। কিন্তু এটি অব্যাহত রাখতে চায় এনবিআর। ফুল-ফল, আসবাবপত্র, প্রসাধনের আমদানিপ্রবাহ যদি ঠিক থাকে, তাহলে ৮৮ কোটি টাকার বাড়তি শুল্ক পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে অপেক্ষাকৃত কম প্রয়োজনীয় ও বিলাসপণ্য ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে আমদানি পর্যায়ে প্রায় ১ হাজার ৭০০ পণ্যের ওপর ঢালাওভাবে ৩% নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বসানো হয়। যেসব পণ্যে ২৫% আমদানি শুল্ক আরোপ ছিল, সেসব পণ্যের ওপর এই শুল্ক বসানো হয়। এরপর সেই নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানো হয়নি। বর্তমানে ৩ হাজার ৪০৪টি পণ্যের ৩ থেকে ৩৫% নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আছে।
সামগ্রিক বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের আহসান এইচ মনসুর সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, নতুন করে বাড়তি শুল্ক বসানোর ফলে আমরা আবার শুল্ক সুরক্ষা বাড়িয়ে দিচ্ছি। এ ধরনের উদ্যোগ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) থেকে উত্তরণপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এখন আমরা উল্টো পথে চলা শুরু করেছি।
মুদ্রানীতির মাধ্যমেই বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ধরে রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি আরও বলেন, এলডিসি থেকে বের হয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য টেকসই করতে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে হলে শুল্ক সুরক্ষা কমাতে হবে।



