Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ট্রাম্প ফেরায় বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা

যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক ৬০% পর্যন্ত বাড়াতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পণ্য বিক্রি প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২৪, ১২:০৬ পিএম

নীতি অনুযায়ী ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়াতে পারে। চীন ইতোমধ্যে এই নীতিকে মাথায় নিয়ে তাদের তৈরি পোশাকসহ আরও অনেক শিল্প বাংলাদেশে স্থানান্তর করতে পারে। তারা বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগও করছে। আর বাংলাদেশও এই সুযোগ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও বিজিএমইএর প্রশাসক মো.আনোয়ার হোসেন।

তিনি বলেন, “চীন থেকে আমাদের সঙ্গে ইতোমধ্যে যোগাযোগ করা হচ্ছে। আমরা তাদের আগ্রহের জায়গাগুলো বিবেচনা করছি।”

তবে অর্থনীতিবিদ ও অর্থনীতি বিষয়ক জাতীয় শ্বেতপত্র কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, “এর আগেও ট্রাম্প যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে দেওয়ায় সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু আমরা তো তখন সেই সুযোগ নিতে পারিনি। কারণ, তখন আমাদের সেই সক্ষমতা ছিল না।”

যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক ৬০% পর্যন্ত বাড়াতে পারে। এই পরিমাণ শুল্ক আরোপ হলে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পণ্য বিক্রি প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। গত ৫ নভেম্বর নির্বাচনের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি বিজয়ী হলে চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক ৬০% পর্যন্ত বাড়িয়ে দেবেন। ফলে চীন তার অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশে স্থানান্তর করতে পারে। আবার তারা ওইসব দেশে যৌথ বিনিয়োগেও শিল্প স্থাপন করতে পারে। চীনের তৈরি পোশাক ও চামড়াজাত পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক বাধার মুখে পড়লে ওইসব বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানিও বেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের গড়ে ১৫.৬২% শুল্ক দিতে হয়। চীনাদের দিতে হয় ২৫%।

আর বাংলাদেশ বর্তমানে চীনে রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এ দেশ থেকে পণ্য নিয়ে নিজ দেশে সস্তায় বিক্রি করতে পারছে।

ট্রাম্প তার আগের মেয়াদে চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক প্রায় ৩% থেকে বাড়িয়ে ২৫% করেছিলেন। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর হয়। এবার নতুন পরিস্থিতিতে কয়েক মাস ধরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম সুতা, বস্ত্র এবং তৈরি পোশাক খাতে বিনিয়োগ নিয়ে চীনের অনুসন্ধান চলছে।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশে ১.০৩ বিলিয়ন ডলার ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৬২৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিনিয়োগ কমে হয় মাত্র ৯১ মিলিয়ন ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে চীন ৪০৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার পর তা আরও বাড়বে বলে আশা করা হয়েছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে ১৮৭ মিলিয়ন ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৬০ মিলিয়ন ডলার হয়।

চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ শুল্কের কারণে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশের মতো দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক বিক্রি বেড়েছে। কমেছে চীনের পণ্য বিক্রি। পাঁচ বছর আগে পোশাকের বিশ্ববাজারে চীনের অংশ ছিল ৩৬%-এর বেশি, এখন তা ৩১%। পাঁচ বছরে বিদেশে পোশাক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অংশ ৫% থেকে বেড়ে প্রায় ৮% হয়েছে। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্ববাজারে চীনের পর দ্বিতীয় অবস্থান বাংলাদেশের।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও বিজিএমইএ-র প্রশাসক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “আমরা এখন যে পোশাক রপ্তানি করি, তা কটন-বেজড। কিন্তু বিশ্বে কৃত্রিম সুতার তৈরি পোশাকের বাজার মোট বাজারের ৭০%। এখন আমাদের এখানে কৃত্রিম সুতার পোশাক তৈরি বাড়ছে। চীনা বিনিয়োগ এবং কারখানা এখানে স্থানান্তর হলে ওই বাজারও ধরতে পারবো।”

তিনি বলেন, “আমরা ওই বিনিয়োগ ধরার জন্য নানা পরিকল্পনা করছি। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে যাতে কোনো সমস্যা না থাকে তার জন্য আমরা কথা বলছি। কারণ, জ্বালানি সমস্যা থাকলে আমাদের বিনিয়োগ আনতে বেগ পেতে হবে।”

২০২৬ সালের পরে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য হতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কর্পোরেট সাসটেইনেবিলিটি ডিউ ডিলিজেন্স নির্দেশনা। এই নির্দেশনার লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজে টেকসই ও দায়িত্বশীল কর্পোরেট আচরণকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ, স্থায়িত্ব ও কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আর সেই কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে কমপ্লায়েন্স কারখানা বাড়ছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন সনদ পাওয়া পোশাক কারখানার সংখ্যা ২৩০টি। পরিবেশবান্ধব কারখানার হিসাবে এটিই সবচেয়ে বেশি।

বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, “বাংলাদেশে কমপ্লায়েন্স কারখানা আরও বাড়ছে। গ্রিন কারখানা যত বাড়ছে, বাংলাদেশের পোশাক খাত আরও শক্তিশালী হচ্ছে। আর চীনা পণ্যের ওপর ট্রাম্প প্রশাসন আরও শুল্ক আরোপ করলে বাংলাদেশ দুইভাবে লাভবান হতে পারে। প্রথমত, চীনা তৈরি পোশাকের রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রে কমে গেলে আমাদের রপ্তানি সেখানে বাড়বে। যদি ২০% কমে, তাহলে সেটা অনেক বড় সম্ভাবনা তৈরি করবে। আর চীনা পোশাক কারখানাসহ আরও অনেক শিল্পের কারখানা বাংলাদেশে স্থানান্তর হতে পারে। আমাদের সঙ্গে চীন থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে। চীনারা এখনই এখান পোশাক তৈরি করে মেইড ইন বাংলাদেশ সিল দিয়ে রপ্তানি করছে।”

বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, “চীনারা বাংলাদেশের তৈরি পোশাকখাতসহ আরও কয়েকটি খাতে খোঁজ খবর নিচ্ছে। তারা এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ট্রাম্প কী করতে পারেন, সেটা মাথায় নিয়ে কাজ করছে। তবে আমাদের দেশের রাজনৈতিক ও বিনিয়োগ পরিস্থিতিও তারা দেখছে। আমাদের এখানকার পরিস্থিতিও স্বাভাবিক হতে হবে।”

তিনি বলেন, “তারা কিছু পোশাক কারখানা বা টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি বাংলাদেশে শিফট করতে চাচ্ছে। তবে আমরা বলছি, তোমরা এখানে জয়েন্ট ভেঞ্চারে কাজ করো। আর বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে তাদের আগ্রহ আছে। বিশেষ করে তারা বাংলাদেশের কয়লা খনি নিয়ে কাজ করতে চায়।”

বাংলাদেশে চীন বিনিয়োগে আগ্রহের আরেকটি কারণ ইইউ কর্পোরেট সাসটেইনেবিলিটি ডিউ ডিলিজেন্স। তাদের ইইউর কঠোর শর্তের মুখে পড়তে হবে। আর বাংলাদেশে চীনের চেয়ে পরে এটা কার্যকর হবে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ(বিডা)-ও চীনের নতুন বিনিয়োগ আগ্রহ নিয়ে খোঁজ খবর রাখছে বলে জানা গেছে। তারা মনে করছে, জানুয়ারিতে ট্রাম্প দায়িত্ব নিলে পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যাবে।

তবে অর্থনীতিবিদ ও অর্থনীতি বিষয়ক জাতীয় শ্বেতপত্র কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, “ট্রাম্প প্রশাসন চীনা পণ্যের ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপ করবে, সেটা স্পষ্ট। কিন্তু আমরা কি সুযোগ নেওয়ার আশায় থাকবো? আসলে দেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা দরকার। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার। তাহলে বিনিয়োগ এমনিতেই আসবে। এর আগে যখন ট্রাম্প ক্ষমতায় ছিলেন, তখনো কিন্তু এই সুযোগ তৈরি হয়েছিলো। কিন্তু আমরা সেই সুযোগ নিতে পারিনি। ​দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশ সুবিধা নিয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। ইইউ কর্পোরেট সাসটেইনেবিলিটি ডিউ ডিলিজেন্স নির্দেশনা আমাদের মানতে হবে। আমরা যখন এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাবো, তখন অনেক ধরনের সুবিধা পাবো না। আমাদের শিল্পে কাজের পরিবেশ ও শ্রম অধিকারের দিকে নজর দিতে হবে।”

   

About

Popular Links

x