ফেওয়া লেকে নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর সময়টা আমার মনে আছে। ইন্ডিয়া গেটে আরব সাগরের পাশে বসে সন্ধ্যা নামতে দেখেছি। পেনাংয়ের সূর্যাস্ত দেখেছি। পুত্রজায়ায় বৃষ্টি থামার পর ঠিক সূর্য ডোবার সময়ে আকাশজুড়ে রংধনু উঠতে দেখেছি। কোহ সামুই, বেনটোটা, গল, কক্সবাজার কিংবা সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া - যখন যেখানে গিয়েছি, সেই সময়টুকু সেখানকার মতো করেই সুন্দর ছিল।
আমি তাই ভ্রমণের জায়গাগুলোর মধ্যে তুলনা করতে পারি না। করতেও চাই না। একটা সূর্যাস্তের সঙ্গে আরেকটা সূর্যাস্তের কীসের প্রতিযোগিতা? ফেওয়া লেকের সেই নৌকাভ্রমণ তার জায়গায় থেকে গেছে, পেনাংয়ের বিকেল তার জায়গায়, পুত্রজায়ার সেই হঠাৎ রংধনুটাও। কিছু স্মৃতিকে পাশাপাশি রেখে বিচার না করে, আলাদা আলাদা বাক্সে যত্ন করে রেখে দিতেই আমার ভালো লাগে।
টাঙ্গুয়ার হাওরের জন্যও তেমনই একটা আলাদা বাক্স তৈরি হয়ে গেল।
তবে এবারের ব্যাপারটা একটু অন্যরকম ছিল। টাঙ্গুয়ার হাওরের যেন এক রূপে বেশিক্ষণ থাকার ধৈর্যই নেই। এই রোদ, এই মেঘ, একটু পরেই বৃষ্টি। আবার সেই মেঘ সরিয়ে কোথা থেকে ঝলমলে রোদ। কখনো আকাশজুড়ে গাঢ় মেঘ, তার নিচে বাতাসে অস্থির হাওরের পানি; কিছুক্ষণ পরেই সবকিছু নরম হয়ে আসে। বিকেল গড়িয়ে গোধূলি নামে। আলো বদলায়, সঙ্গে বদলে যায় হাওরের চেহারাও। এই বদলে যাওয়াটাই আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে।
আবহাওয়া আমাদের পরিকল্পনার খুব একটা ধার ধারেনি। অথচ তাতে বিরক্ত হওয়ার বদলে মনে হয়েছে - যা হচ্ছে, হোক। আজ কোথাও পৌঁছানোর তাড়া নেই।
কখনো নৌকার সামনে শুধু পানি আর পানি। দূরে মেঘালয়ের পাহাড়। কখনো পাহাড়গুলো স্পষ্ট, কখনো মেঘ এসে তাদের অর্ধেকটা ঢেকে দিয়েছে। কোথাও ছোট-বড় নৌকা চলে যাচ্ছে, কোথাও পাড়ঘেঁষা জনপদ। একা একজন মানুষ ছোট্ট ডিঙি বেয়ে ফিরছেন। হাওরের ধারে দুই মেয়ে ছুটছে, খেলছে। বিশাল আকাশ আর পানির মাঝখানে তাদের সেই ছোট্ট ছুটে চলার দৃশ্যটাও কী যে ভালো লেগেছিল!

এই সফরে প্রকৃতি যেন আমাকে কোনো একটি দৃশ্য দিয়ে মুগ্ধ করার চেষ্টা করেনি। বরং সারাক্ষণ কিছু না কিছু বদলে দিয়ে বলেছে - আরেকটু থাকো, আরেকটু দেখো। আর আমিও দেখেছি।
যাদুকাটা নদীতে নেমে ছেলেমানুষের মতো ঝাঁপাঝাঁপি করেছি। আবার সেই জলেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে মাথার ওপর শান্ত শরতের আকাশ দেখেছি। একই জায়গায় এত উচ্ছ্বাস আর এত শান্তি - দুটোই যে পাশাপাশি পাওয়া যায়, সেই তৃপ্তিটুকু বেশ অন্যরকম।
সাদাপাথর, ভোলাগঞ্জের স্ফটিকস্বচ্ছ জলে নামার অনুভূতিটাও মনে থাকবে। ঠান্ডা জল পায়ে লাগার পর মনে হচ্ছিল, ছুটি বোধহয় এমনই হওয়া উচিত - শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মাথার ভেতরটাও একটু হালকা হয়ে আসবে। কোথাও পৌঁছানোর তাড়া থাকবে না, ঘড়ির দিকে তাকানোর প্রয়োজন থাকবে না। কয়েকটা দিনের জন্য জীবনটা শুধু নিজের গতিতে চলবে।
নীলাদ্রি লেক, লাস্ট বর্ডার, বা ওপারে মেঘালয়ের পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে মেঘ আর দূরে নেমে আসা ঝরনা - একটার পর একটা দৃশ্য চোখের সামনে খুলেছে। সবকিছু ক্যামেরায় ধরে রাখার চেষ্টাও করিনি। কিছু দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার চেয়ে তাকিয়ে থাকতেই বেশি ভালো লাগে। মনে হয়, থাক না - এটা শুধু চোখেই জমা থাক।

হাওরের পানিতে নেমে আকাশের দিকে মুখ তুলে অকারণে হেসেছি। পরে সেই ছবিটা দেখে নিজেরই মনে হয়েছে - আমি বোধহয় তখন খুব সুখী ছিলাম। কেনো, তার খুব গোছানো কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। হয়তো সব সুখের ব্যাখ্যা থাকতেও নেই।
এই দুটো দিন টাঙ্গুয়ার হাওর আমাকে রোদ দিয়েছে, মেঘ দিয়েছে, বৃষ্টি দিয়েছে। কখনো ভিজিয়েছে, কখনো ঝলমলে রোদে চোখ কুঁচকে দিয়েছে। দিয়েছে হাওরের দমকা বাতাস, গোধূলির নরম আলো, দূরের পাহাড়ের দিকে চুপ করে তাকিয়ে থাকার সময়। সব মিলিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরের এই ট্রিপ আমাকে অনেক দিয়েছে - ঠিক কতটা, সেটা সংখ্যায় বা কথায় মেলানো কঠিন।
এই সফরে নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হয়েছে। কোনো বড় প্রাপ্তির জন্য নয়। বরং এতগুলো ছোট ছোট ভালো লাগা একই সঙ্গে আমার ভাগে এসেছিল বলে। তবে ভ্রমণের সবচেয়ে ব্যক্তিগত মুহূর্তটি এসেছিল একেবারে শেষে।
হাওর থেকে ফেরার পথে শেষ বিকেলে একটা সময় সবার মাঝ থেকে নিজেকে একটু আলাদা করে নিয়েছিলাম। দিনের আলো তখন নরম হয়ে আসছিলো। চারপাশ কালো করে বৃষ্টি নামছিলো আর একটা একান্ত একটা বিকেলে আমি হাউসবোটের ছাদে চুপচাপ বসে ছিলাম। কোনো ছবি তুলছিলাম না, কারও সঙ্গে কথাও বলছিলাম না। শুধু নিজের সঙ্গে ছিলাম। সেই অল্প সময়ের নিঃসঙ্গতায় যে প্রশান্তিটুকু পেয়েছিলাম, তার সঙ্গে কোনো জায়গার সৌন্দর্যের তুলনা চলে না। মনে হচ্ছিল, অনেকদিন পর নিজের ভেতরের মানুষটার সঙ্গে একটু মন খুলে কথা হচ্ছে।

আমরা অন্য মানুষের সঙ্গে কত কথা বলি। কাজের কথা, সংসারের কথা, প্রয়োজনের কথা, অপ্রয়োজনের কথাও। অথচ নিজের সঙ্গে বসে কথা বলা হয় কই কেমন আছি, কী চাই, কী আর চাই না - এমন খুব সাধারণ প্রশ্নগুলোও কখনো কখনো জমে থাকে। হয়তো উত্তরগুলোও আমাদের ভেতরেই থাকে। শুধু শোনার সময়টুকু হয়ে ওঠে না।
সেদিন শেষ বিকেলের সেই নরম আলোয় নিজের ভেতরের কথাগুলো একটু শুনেছিলাম। কী কথা হয়েছিল, সব হয়তো মনে থাকবে না। কিন্তু নিজের সঙ্গে সেই কথোপকথনের পর যে শান্তিটুকু নিয়ে ফিরেছিলাম, সেটুকু আমার আজীবন মনে থাকবে।
সম্ভবত এ কারণেই আমি ঘুরতে এত ভালোবাসি। শুধু নতুন জায়গা দেখার জন্য নয়। কত দেশ দেখলাম, কত জায়গায় গেলাম - সেই তালিকা বড় করার আগ্রহও আমার নেই। আমি ঘুরি, কারণ শহরের প্রতিদিনের ব্যস্ততায় কাজ, দায়িত্ব, সময়ের পেছনে ছুটতে ছুটতে আমার যে ‘একান্ত আমি’টা কখনো একটু আড়ালে চলে যায়, ভ্রমণে তার সঙ্গে আমার আবার দেখা হয়।
কখনো সেই দেখা হয় কোনো নৌকায় বসে। কখনো বৃষ্টির পর রংধনুর নিচে। কখনো সমুদ্রের পাশে সন্ধ্যা নামতে দেখতে দেখতে।
এবার দেখা হলো হাওরের জলে, যাদুকাটা নদীর উচ্ছ্বাসে, সাদাপাথরের স্বচ্ছতায়, মেঘালয়ের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আর ফেরার পথের সেই চুপচাপ শেষ বিকেলে।
ছুটি শেষ হয়েছে। শহরে ফিরেছি। আবার কাজ, ব্যস্ততা, চেনা জীবনের তাড়া শুরু হবে। কিন্তু এই সফর থেকে একটা অনুভূতি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি - জীবনে এমন কয়েকটা দিন মাঝেমধ্যে খুব দরকার। যে দিনগুলোর কোনো অর্জন নেই, কোনো হিসাব নেই - অথচ ফিরে এসে মনে হয়, অনেক কিছু নিয়ে ফিরলাম।
আর সেই ‘একান্ত আমি’র সঙ্গে কাটানো শেষ বিকেলটা? সেটা বোধহয় আমার ভেতরে আরও অনেক দিন থেকে যাবে।



