Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

শিশু-কিশোরদের মনোজগৎ নিয়ন্ত্রণের কৌশল

শিশুদের সামনে কখনোই- ‘তুই কিছুই পারিস না, তোকে দিয়ে কিছুই হবে না,’ এ ধরনের কথা বলা অনুচিত

আপডেট : ১২ মে ২০২২, ১২:০৫ পিএম

ছোট থেকে বড় হওয়ার পথে প্রতিটি শিশু বিভিন্ন ধরনের মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। শারীরিক পরিবর্তন চোখে দেখা গেলেও মানসিক পরিবর্তন নিয়ে আমাদের দেশে চর্চা খুব কম হয়। বাচ্চাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে বেড়ে ওঠার অনেকগুলো ধাপ আছে। 

জন্ম থেকে ৫ বছর, ৬ থেকে ১০ বছর এবং ১২ থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত ধাপে ধাপে আসে মনস্তাত্বিক পরিবর্তন। ১৮ বছর বয়সের পর থেকে মানুষকে পূর্ণবয়স্ক ধরা হলেও বাস্তবে আরও কয়েকটি বছর লেগে যায় মানসিক পরিবর্তনগুলোর গঠনমূলক পরিপূর্ণতা পেতে। 

এই পুরো সময়টা জুড়ে অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে। বিষয়ভিত্তিক পর্যালোচনা এবং বাস্তব থেকে শিক্ষা নিতে হবে। 

সন্তানের মনোজগতে প্রবেশ

মা-বাবা হিসেবে আমরা প্রথমেই সন্তানের মনস্তাত্তিক বিষয়গুলো জানা ও বোঝার চেষ্টা করব। ১২ বছরের পর থেকেই শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন দিক নিয়ে মানুষের মাঝে কৌতূহল উঁকি দিতে শুরু করে। নিজের শরীরকে তারা বিভিন্নভাবে বুঝতে শেখে। এই সময়টাতেই তারা যৌনাচার নিয়ে উৎসাহী হয়ে উঠবে। এই সময়টাতে এসব সংবেদনশীল কিন্তু অত্যাবশ্যকীয় ব্যাপারগুলো তাদের সঙ্গে কৌশলে এবং খোলামেলাভাবে আলোচনা করতে হবে। পরিবার থেকে এ বিষয়ে সঠিক শিক্ষা দেওয়া হলে অনেক ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। কৈশোরে বন্ধু, পরিচিত মানুষ কিংবা অনলাইন থেকে ভুল শিক্ষা পাওয়ার আগে পরিবার থেকে সঠিক জ্ঞানদান উত্তম। 

যেভাবেই ব্যাখ্যা করি না কেন, জৈবিক চাহিদা, যৌনাঙ্গ, যৌনতার বিষয়গুলো লুকিয়ে বা ভুল ব্যাখ্যা করে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যাবে না। 

সন্তান কৈশোরে পৌঁছালে, তাদের সঙ্গে আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত?

প্রথম কথা হলো, শিশুদের সামনে কখনোই- “তুই কিছুই পারিস না, তোকে দিয়ে কিছুই হবে না,” এ ধরনের কথা বলা অনুচিত। প্রতিটি শিশু যেহেতু ভিন্ন, তাই তাদের মেধা বা পারদর্শিতার ধরনও ভিন্ন হবে। পড়াশোনায় ভালো না হওয়া শিশু অন্যান্য ক্ষেত্রে তার দক্ষতার ছাপ রাখতে পারে।

একটি ডে কেয়ার সেন্টারে পড়ছে শিশুরা/ ঢাকা ট্রিবিউন

বাবা মা ও পরিবারের সদস্যদের উচিত বাচ্চাদের মেধা ও চর্চার ক্ষেত্র আবিষ্কার করার আগ পর্যন্ত বন্ধুর মতো পাশে থাকা অথবা তাকে পথ দেখানো। শিশুরা যাতে কল্পনাপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে, নিজেদের মননশীলতার চর্চা করার সুযোগ পায়, তাদের চিন্তার জগত যাতে প্রসারিত হতে পারে, এই ব্যাপারে মা বাবা ও শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। 

অতিরিক্ত চাপ দিলে তারা পড়াশোনায় আগ্রহ ও আনন্দ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে। তাদের একটি নির্দিষ্ট স্কোরের লক্ষ্যমাত্রা বেধে দেওয়া অনুচিত। তাদের চিন্তার জগতকে বিকশিত করে পড়াশোনার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি হয়, সেভাবে তাদের গড়ে তুলতে হবে। 

বাচ্চারা চাইলে সাঁতার শিখতে পারে, গল্পের বই দিয়ে দিন শুরু করতে পারে, বিভিন্ন প্রদর্শনী বা সহপাঠ কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে। এগুলো খেয়াল রাখা বাবা-মায়ের কর্তব্য।

বাস্তবিক ক্ষেত্রে আনন্দদায়ক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েরা বেশি বেশি শিখতে পারে। টেবিলে বসে মুখস্থ করতে থাকা ও অনবরত পাঠ্যবই গিলতে থাকার মধ্যে কোনো সৃজনশীলতা নেই। 

অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন

বাচ্চাদের বইয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাখতে হলে মা-বাবাকেও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। মা-বাবা যদি বইয়ের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে, বাসায় যদি পড়ার একটি ভালো পরিবেশ গড়ে তোলা যায় যেখানে মজার ছলেও গল্পের বই নিয়ে আলোচনা হবে অথবা পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি থাকলে বই পড়ার একটি আসর বসতে পারে প্রতি সপ্তাহে। এতে গল্প আর আনন্দও হবে, আর শেখাও হবে। 

বাচ্চারা পড়ার ঘরে ব্ল্যাকবোর্ড, রং পেন্সিল, বিভিন্ন শিক্ষণীয় ফ্ল্যাশ কার্ড, অয়েল পেইন্টিং রাখা যেতে পারে। জন্মদিন বিভিন্ন উপলক্ষে শিশুদের রংবেরংয়ের বই, ফ্ল্যাশ কার্ড উপহার দেওয়া যেতে পারে। বাসায় সংবাদপত্র রাখলে তারা দেশ-বিদেশের খবর জানার পাশাপাশি নতুন নতুন জ্ঞান আহরণের খোরাক পাবে। বাসার বড়রাও কিন্তু অভিধান, পিকচার বুকে চোখ রাখতে পারেন সময় করে। আপনাকে দেখেই শিখবে শিশুরা। 

শাসনের কৌশল

এবার আসা যাক লিঙ্গভিত্তিক মনস্তাত্ত্বিক বিভাজনে। বিষয়টিকে কখনোই এমন পর্যায়ে নেওয়া যাবে না, যেখানে ছেলে বা মেয়ে শিশু নিজেকে অবহেলিত ভাবতে শুরু করে অথবা কেবল লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্যের কারণে নিজেকে ছোট ও অকেজো মনে করে। বাবা-মা, শিক্ষক হিসেবে আমাদের ছেলে ও মেয়ে শিশুর সঙ্গে সমান আচরণ করতে হবে।

একেক যুগে একেকভাবে শাসন করে আসা হয়েছে শিশুদের। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আসলে সীমা নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়ে, শাসনও করতে হয় বেশ। তবে বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলে একটা সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, বিশ্বাসের জায়গা গড়ে নিতে হবে। তারপরই শাসন করে বোঝানো যাবে। আমাদের সমাজে মারধর করে শেখানোর ও ব্যাপক উদাহরণ আছে।

শাসন যেন শিশুর কাছে অত্যাচারের নামান্তর না হয় প্রতীকী ছবি

তবে শাসন যেন শারীরিক কিংবা মানসিক অত্যাচারের পর্যায়ে না পড়ে, লোকসম্মুখে বাচ্চাদের অপমান করা যাবে না। 

ব্রিটিশ কাউন্সিলের কথা বলা যাক, এই প্রতিষ্ঠানে শিশুদের গায়ে হাত তোলা অথবা গালমন্দ করা কিংবা সামান্যতম বাজে শব্দ বা ভাষা ব্যবহার করা নিষেধ। 

ক্লাসরুমগুলোও স্বচ্ছ কাঁচের গ্লাস দিয়ে ঘেরা যাতে ভেতরটা নজরদারিতে থাকে। কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীর সঙ্গে একা বসতে চাইলে, মেন্টরিং করতে চাইলে অবশ্যই অ্যাকাডেমিক ম্যানেজারকে জানাতে হয়। ব্রিটিশ কাউন্সিলে “সেফগার্ডিং দ্য চাইল্ড অ্যান্ড দ্য চাইল্ড প্রোটেকশন” নিয়ে শিক্ষক ও সব কর্মীদের জন্য বেশ গঠনমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। 

এমনকি পরিবারে ঘটে যাওয়া কোনো মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার বা সমস্যা নিয়েও বাচ্চারা চাইলে এখানে বলতে পারে, আলোচনা করতে পারে। 

প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকা উচিত যেখানে কাউন্সিলর থাকবেন আর তার কাছে যাওয়ার জন্য থাকবে উপযুক্ত ব্যবস্থা। পরিবারের পাশাপাশি শিশুদের সুন্দর-সাবলীল বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে ভূমিকা থাকবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও। 

ভঙ্গুর কিংবা আর্থিক দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারের শিশুর জীবনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেন্টর বা গুরু বা কাউন্সেলর ভালো ভূমিকা রাখতে পারেন। 

শিশুদের মানসিক পরিবর্তন ও ক্রমবিকাশ নিয়ে গবেষণা এবং পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। এভাবে তাদের অত্যাধিক জানা ও আবিষ্কারের আগ্রহকে সুপথে পরিচালনা করা সম্ভব। 

   

About

Popular Links

x