Saturday, September 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

প্রয়াণ দিবসে শিল্পাচার্য জয়নুলকে নিয়ে ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের অলংকরণ করেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন

আপডেট : ২৮ মে ২০২২, ০৯:২৫ এএম

১৯৭৬ সালের ২৮ মে ঢাকায় প্রয়াত হন জয়নুল আবেদিন। প্রয়াণ দিবসে অনন্ত শ্রদ্ধা তার প্রতি!

আমাদের জনপদ কিশোরগঞ্জে এই শিল্পাচার্যের আর্বিভাব ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর। বহু কারণে আজকের সময়েও জয়নুল বড় জরুরি। তিনি না এলে আমরা হয়তো পড়ে থাকতাম বেহুদা বিবাদে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান মেতে থাকতো ছবি আঁকা হারাম, না হালাল তা নিয়ে। কম কথা বলে সৃষ্টিকর্ম দিয়ে জয়নুল আবেদিন এর জবার দিয়েছেন। এ অঞ্চলের শিল্পচর্চায় তিনি যেন এক রেনেসাঁর ঢেউ তোলা ব্যক্তিত্ব। এজন্য তাকে চিত্রকলার কাজী নজরুল ইসলাম ডাকা খুব বাড়িয়ে বলা হয়না।

 মূলত শিল্পের জন্য অনুকূল পরিবেশ বলে কিছু নেই। প্রতিকূলতায় প্রতিরোধই শিল্পের ধর্ম। আমৃত্য জীবন সংগ্রামী জয়নুলের কর্ম এর বাইরে নয়। শৈশব থেকেই ছবি আঁকতেন তিনি। স্বপ্ন ছিল আর্ট কলেজে পড়ার। মায়ের গলার গহনা বিক্রি করে এ ছেলে কলকাতার আর্ট কলেজে পড়তে যায়। থাকার জায়গার অভাবে সে শহরে মসজিদের বারান্দায় ঘুমাতেন যিনি। অনেক রাত তার কেটেছে পার্কে ঘুমিয়েও।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর ঢাকায় চলে আসেন জয়নুল আবেদিন। তার প্রাণান্ত চেষ্টায় ঢাকায় আর্ট কলেজ (এখনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) প্রতিষ্ঠিত হয়। যে অনন্য নকশার ভবনের স্থপতি মায়েস্ত্রো মাজহারুল ইসলাম।

জয়নুল আবেদিন তো পারতেন সমাদৃত এক শিল্পী হয়ে এক জীবন কাটিয়ে দিতে। কিন্তু তিনি মন দিয়েছেন প্রতিষ্ঠান গড়ায়। তার অনুপস্থিতিতেও যেখানে চলবে শিল্পচর্চা - এই ছিল তার স্বপ্ন। তবে প্রয়াণ দিবস ক্ষণে প্রশ্ন তুলতেই পারি কতটা বাস্তব হয়েছে শিল্পাচার্যের আমৃত্যু লালিত স্বপ্ন?  

বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের অলংকরণ করেন জয়নুল আবেদিন। এ সংবিধান সামরিক ও "গণতান্ত্রিক" নানা আমলে বেহাত হয়ে এখন যে দশায় পৌঁছেছে তাতে হয়তো অনন্তলোকে থাকা জয়নুল বিষন্নই হবেন। আগেই বলেছি, ঢাকা চারুকলার প্রতিষ্ঠাতা তিনি। এর বকুলতলা ভাড়া দেয়া হয় নানা অনুষ্ঠান থেকে প্যাকেজ নাটকসহ অপ্রাসঙ্গিক আয়োজনে। জয়নুলের চিন্তা বিযুক্ত হয়ে এ প্রতিষ্ঠান রীতিমাফিক "জয়নুল উৎসব" করে থাকে প্রতি বছর। কিন্তু কতটুকু প্রচার হচ্ছে শিল্পাচার্যের জীবন দর্শন ও শিল্প ভাবনা? রাজধানীকেন্দ্রিক না রেখে জনপদের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পচর্চা বিকাশের কথা ভাবতেন জয়নুল আবেদিন। এজন্যই সোনারগাঁয়ে তিনি গড়ে তোলেন লোক ও কারু শিল্প ফাউন্ডেশন। এখানেও চলছে উন্নয়নের নামে জয়নুলের মৌলিক চিন্তার হরণ।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন বলতেন,"এখন তো চারিদিকে রুচির দুর্ভিক্ষ! একটা স্বাধীন দেশে সুচিন্তা আর রুচির দুর্ভিক্ষ! এই দুর্ভিক্ষের কোনো ছবি হয় না। "

তার বলে যাওয়া হাহাকার ভরা এ কথার মর্মার্থ কতটা আমরা টের পেয়েছি? আমাদের চিত্রকলা কি হেঁটেছে জয়নুলের দেখানো পথে? তিনি দেখেছেন অনাহার, উপদ্রুত উপকূলের সাইক্লোন, জনযুদ্ধের গেরিলা, শ্রমজীবী নারী, উজাড় হতে থাকা নৃগোষ্ঠি। আর আমাদের শিল্পকলা বছরের পর বছর আছে যেন শুধু "বায়ার ধরা"র ধান্দায়। শুধু শহরের অভিজাত এলাকায়ই কেন শুধু দেখি আর্ট গ্যালারি?  

যে জয়নুল বলতেন, " নদীর ছবি আঁকার আগে পানির দোলনই আগে বুঝতে হবে।" তার হাতে গড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদসহ দেশের সামগ্রিক শিল্পচর্চার খুব সামান্য অংশই জলের মতোন এ সত্য বুঝেছে। জয়নুল প্রতিষ্ঠিত বিদ্যাপীঠের দেয়ালে সমসময়ের বিপন্ন জন্মভূমির অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক কোনো সংকটই উপস্থাপিত নয়। কোনো ”সুবোধ” সিরিজ এখানে হাজির নেই। জয়নুলের মায়ের গলার গহনা যেন হারালো পানিহীন চারুকলার পুকুরের কোনো গহ্বরে।

আমরা কি বিশ্বাসঘাতকতা করিনি "পাইন্যার মা"র সাথে? শস্যের শিল্পীর "গুণটানা" নজরে আসেনি আমাদের। নানা আক্রমণে "সাঁওতাল" আজ বিপন্ন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের রাস্তার অন্য পাড়ে স্বাধীন শিল্পচর্চার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত "ছবির হাট" উচ্ছেদে বড় কোনো বাঁধায় পড়েনি কর্তৃপক্ষ। বহু বছরের পুরনো গাছ কেটে সেখানে ভবন নির্মাণ থেমে নেই আজও। আর এসবই চলেছে "মুক্তিযুদ্ধের চেতনা"র মোড়কে।

আশির দশকে সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধি শাসন কাঠামোর বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের স্মারক হিসেবে শুরু হয় পহেলা বৈশাখের "মঙ্গলশোভা"। আমাদের জন্য গর্বের যে, এটি ইউনেস্কো হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু শোভাযাত্রা শুরুর প্রথম দিকের চিন্তক বরেণ্য শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য ও তরুণ ঘোষের সাথে কথা বলে এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে যে ধারণা পেয়েছি, তা এখন অনুপস্থিত। অনাকাঙ্খিত বিতর্কে পড়েছে “মঙ্গল শোভাযাত্রা”। একটি পরিচিত এলাকায় পুলিশ কর্ডনে এর ঘোরাফেরা। ভাস্কর্য ও মূর্তিকে একাকার করা অপশক্তির সাথে ভোটের রাজনীতিতে ব্যালটের স্বার্থে বেহায়া আঁতাত করেছেন ক্ষমতার লোকেরা। তাদের ইচ্ছে মাফিক ভাস্কর্য ভাঙা পড়ে, সরানো হয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান থেকে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে এখন চলছে জনবিচ্ছিন্ন শিল্পচর্চা।

 জয়নুল আবেদিনের ভাষ্য ছিল, "যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি ছবি আঁকা শিখলাম কী করে? বা কার কাছ থেকে? তবে উত্তর দিতে পারবো না। বলবো আমার দেশের প্রকৃতি আর পরিবেশ আমাকে ছবি আঁকার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। এদেশের আকাশ, বাতাস, নদী, মাঠ, বন, এখানকার মানুষের চলাফেরা, ওঠা-বসা, হাসি কান্না আমাকে ছবি আঁকতে বলে।"

আমাদের এখনের বিরাজমান শিল্পচর্চার ধারা কি তা শুনেছে? নাকি তা বোবা ও কালা হয়ে ক্ষমতার তোষামদের কাছে বিবেক হারিয়েছে? আজ কাজী নজরুল ইসলামের পাশে সমাহিত জয়নুলের কবরে ফুল দেবার আগে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি মনে করি।

   

About

Popular Links

x