দেশে শিশুদের যৌন হয়রানির ঘটনা একেবারেই নতুন কিছু নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পাশবিকতার শিকার শিশু বুঝতেই পারে না, তার সঙ্গে কী ঘটছে। বড় হয়ে বিষয়গুলো বুঝে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মনোজগতে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুরা ‘‘কাছের মানুষ'' বা অতি পরিচিতজনদের মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। তাই খুব অল্প বয়সেই শিশুদের “গুড টাচ” এবং “ব্যাড টাচ” সম্পর্কে ধারণা দেওয়া প্রয়োজন।
বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে শরীর এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পর্কে শিশুকাল থেকেই ধারণা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে “প্রাইভেট পার্ট” সম্পর্কে সচেতন করে তোলার দায়িত্ব অভিভাবকদের। তাকে বোঝাতে হবে, শরীরের স্পর্শকাতর অংশ একান্তই তার। সেখানে অন্য কারও অযাচিত স্পর্শ অগ্রহণযোগ্য। পাঁচ বছর বয়স হলে শিশুকে বিষয়টি তার উপযোগী করে বুঝিয়ে বলার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
এ সম্পর্কে সচেতন করে তোলার আগে শিশুর আস্থা ও ভরসা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান যাতে যেকোনো ভালো বা মন্দ অনুভূতি প্রকাশে নিঃসঙ্কোচ হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা অভিভাবকের দায়িত্ব।
‘আন্টি আমি ব্যথা পাচ্ছি'
শিশুর সরল মন গম্ভীর আলোচনা বুঝতে পারে না। ব্যাড টাচ বা অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের মতো বিষয়ে গুরুগম্ভীর বাক্যালাপ তার মনে ভয়ের সঞ্চার করতে পারে। তাই এ নিয়ে আলাদা আলোচনায় না বসে নৈমিত্তিক কথাবার্তার মাঝেই তার কাছে সচেতনতার বার্তাটি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে স্পর্শের প্রভাব কেমন হতে পারে সে বিষয়ে ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. নাজলিমা নার্গিস বলেন, “শিশুর থেকেও অনুমতি নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা খুবই প্রয়োজন। এতে সে অনুমতির গুরুত্ব শিখবে। গোসল কিংবা পোশাক পরিবর্তনের সময় অভিভাবক সম্মতি আদান-প্রদানের অভ্যাস গড়ে তুললে শিশু বুঝবে, অনুমতি ছাড়া প্রাইভেট পার্টে হাত দেওয়া যায় না। নেতিবাচক বা খারাপ আচরণের সম্মুখীন হলে প্রতিবাদ করার বিষয়টি শেখাতে হবে।”
“কারও স্পর্শ ভালো না লাগলে শিশু যেন সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে। সেটি হতে পারে যে কারও স্পর্শ। যেকোনো পরিস্থিতিতে তাকে আত্মরক্ষার বুদ্ধি শেখাতে হবে।”
তবে এই শেখানোর প্রক্রিয়ায় তার মনে যাতে বাড়তি চাপ না পড়ে এবং ভুল ব্যাখ্যা না যায়, সে বিষয়টি খেয়াল রাখার পরামর্শ দেন ডা. নাজলিমা।
গাইনি বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, “নির্যাতন বা ধর্ষণের শিকার অনেক শিশু বোঝেই না তার সঙ্গে কী ঘটে গেছে। কিন্তু সে প্রচণ্ড ব্যথায় অসুস্থ হয়ে যায়। আবার অনেক নির্যাতিত শিশু মানসিক আঘাতের কারণে ভবিষ্যতে যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকে।”
নিপীড়কদের হাতে ছেলে-মেয়ে কেউই নিরাপদ নয়। তাই লিঙ্গ নির্বিশেষে শিশুকে বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে।
ডা. নাজলিমা বলেন, “ছেলে বাচ্চাদের সঙ্গেও এমন অশালীন আচরণ হয়। ধর্ষণের শিকার ৯ বছরের একটি ছেলেকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল একবার। তার সারা শরীরে শুধু আঁচড়ের দাগ ছিল। সে শুধু বলছিল, ‘আন্টি আমি ব্যথা পাচ্ছি'।”
সুইমসুট রুল
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ওয়াহিদা পারভীন বলেন, “শরীর সম্পর্কে খুব ছোটবেলা থেকেই বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। প্রাইভেট পার্ট কী তা বোঝাতে হবে। বাচ্চাকে ‘সুইমসুট রুল' শেখান, সুইমিং কস্টিউম শরীরের যে অংশ ঢেকে রাখবে, সেটি যে গোপনাঙ্গ সেটা বোঝান।”
“মা-বাবা এবং ডাক্তার ছাড়া আর কেউ সেই অঙ্গ ছুঁতে পারে না, এই ধারণা তৈরি করতে হবে।”
এই মনোবিদের পরামর্শ, “গল্পের ছলে বোঝার চেষ্টা করুন, শিশুর ওপর কোনো অত্যাচার হচ্ছে কি-না। কেউ বাচ্চাকে জোর করে আদর করতে, উপহারের কথা বলে আড়ালে গিয়ে সময় কাটানোর চেষ্টা করছে কি-না। ছোট বয়সে অনেক কিছু বলে বোঝাতে পারে না, কিন্তু এর প্রভাব সবসময়ই তার মধ্যে থেকে যায়।”
গুড টাচ, ব্যাড টাচের বিষয়টি পাঠ্যবইয়ে শেখানো উচিত বলে মনে করেন ডা. ওয়াহিদা পারভীন।
অভিভাবকদের সহায়তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
এক ছেলে ও এক মেয়ের জননী রূপা বড়ুয়া (৩৫) বলেন, “শিশুকে অবশ্যই ছোট থেকে শেখাতে হবে কার সঙ্গে তুমি কথা বলবে, কার সঙ্গে বলবে না। বাবা-মা বা পরিবারের বাইরে অন্য কেউ যেন গায়ে হাত না দেয়। ছোট থেকেই শিশুকে বিষয়গুলো বোঝালে তার ভবিষ্যতের জন্যই ভালো হবে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাবা বলেন, “যাতে বাচ্চারা কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে না পড়ে এবং এমন কিছুর শিকার হচ্ছে কি-না সেটা যেন বুঝতে পারে। অনেক বাচ্চা এসব বুঝতে না পারায় প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হয়। অনেক সময় নীপিড়রকরা বাচ্চাদের বলে, ‘তোমার সাথে খেলা করছি।' খেলার ছলে বাচ্চাদের সঙ্গে অশালীন কাজে লিপ্ত হতে চায়। এসব কারণে বাচ্চারা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যায়, অনিরাপত্তায় ভোগে। সহজেই কারো সাথে মিশতে পারে না। বাবা-মা যদি এসব বিষয়ে বন্ধুসুলভ আচরণ না করলে বাচ্চাদের ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অনেক সময় বাচ্চারা ভয়ে কাউকে বলতে না পেরে নিজের ক্ষতি করার চিন্তা করে। এতে করে বড় হওয়ার পরেও অনেকের মাঝে আত্মহত্যা প্রবণতা রয়ে যায়।”
দুই সন্তানের মা জান্নাতুল ফেরদাউস (৩২) বলেন, “আমি মনে করি ছেলে-মেয়ে উভয়কেই এই শিক্ষা দেওয়া জরুরি। কারণ এখন উভয় ধরনের শিশুকেই নির্যাতনের শিকার হতে দেখা যায়। শিশুর স্পর্শকতার অঙ্গে যাতে কেউ হাত দিতে না পারে সে বিষয়টি বোঝাতে হবে।”
আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার পরামর্শ
নিপীড়নের শিকার শিশুদের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে গড়ায় আইনি লড়াইয়ে। বিষয়টি তদন্ত এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনার দায়িত্বটি পুলিশের। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশের বেশকিছু উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অ্যাডিশনাল ডেপুটি কমিশনার (উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন) সানজিদা আফরিন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “কোনটা গুড এবং কোনটা ব্যাড টাচ- সে বিষয়ে শিশু তো বটেই অনেক পরিবারেরও জানা নেই। ফলে অহরহ বাচ্চারা নিপীড়ন, ধর্ষণের শিকার হয়। ১০ বছর বয়স পর্যন্ত বাচ্চারা বোঝেই না বিষয়গুলো। আমাদের এগারটি সংস্থা এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে।”
তিনি বলেন, “বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা ১২-১৮ বছরের ভুক্তভোগীদের পরিবার হয়ত মানসম্মানের ভয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যায়। আবার অনেকে হয়ত ঘটনার দুই-তিন দিন পর আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এই সময়ের মাঝে ভুক্তভোগীর শরীর থেকে সব আলামত অজান্তেই নষ্ট করে ফেলা হয়। তখন ডাক্তারি পরীক্ষায় আলামত না পাওয়ার কারণে আমরা আর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারি না।”
“দরিদ্র এবং পথশিশুদের সঙ্গে এসব ঘটনা অধিক হারে হয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের কাছে অনেক ছেলে শিশুর ঘটনাও আসে। কিছুদিন আগে ১৫ বছরের একটা ছেলে ধর্ষিত হয়। তার পাকস্থলী ফেটে অবস্থা খুব আশঙ্কাজনক ছিল। কিন্তু লোক জানাজানি হলে ছেলের ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে, এই ভেবে তার পরিবার কোনো পদক্ষেপ নিতে চায়নি। অসংখ্য ছেলে বাচ্চার ক্ষেত্রে দিনশেষে পরিবারের জন্য পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেদের ওপরও নির্যাতনের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে।”
পুলিশের এই কর্মকর্তা মনে করেন, অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক অসচেতনতার জন্য শিশুরা এমন নির্যাতনের কবলে পড়ে। কেবল পুলিশ কিংবা আইনের মাধ্যমে এসব ঘটনা সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্যই বাচ্চা কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে সে বিষয়ে নজর রাখতে হবে।
সানজিদা আফরিন বলেন, “শিশু যখন থেকে বুঝতে শেখে, তখন থেকেই তাকে ভালো-খারাপ সম্পর্কে বোঝাতে হবে। গুড টাচ, ব্যাড টাচ সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। সামান্য ভুলের জন্য একটি বাচ্চা মানসিক এবং শারিরীকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারে। বাচ্চাদের সাথে তাদের মতো করে মিশতে হবে।”
পুলিশ-এনজিওর যৌথ উদ্যোগ
বেশকিছু এনজিওর সহায়তায় পুলিশের ১১টি শাখা শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
অ্যাডিশনাল ডেপুটি কমিশনার সানজিদা আফরিন বলেন, “তারা ভুক্তভোগী পরিবার এবং কাউন্সিলরের মাধ্যমে বিষয়গুলো নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করে। আমরা নির্যাতিত শিশুদের পর্যবেক্ষণে রাখি। ১২ বছর বেশি বয়সী যেসব ভুক্তভোগী তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো বুঝতে এবং বলতে পারে তাদের আমরা মানসিক কাউন্সিলিং করে থাকি। এ বিষয়টিকে আমরা সাইকোলজিকাল কাউন্টার বলে থাকি।”



