Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

গাইবান্ধার চর থেকে ইইউ পার্লামেন্টের কনফারেন্সে দুই কিশোরীর স্বপ্নযাত্রা

পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে এই আয়োজনে অংশ নেন কিশোর-তরুণরা

আপডেট : ৩০ জুন ২০২৩, ১২:২২ পিএম

গাইবান্ধার নদীবেষ্টিত এলাকা বাটিকামারী ও পাগলার চরে বেড়ে ওঠা রূপালি এবং নুরুন্নাহারের। প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ প্রতিষ্ঠিত স্কুল থেকে এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় তারা। ১৭ বছর বয়সী এই দুই কিশোরী গত ৬ জুন ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত “ইউরোপিয়ান ইয়ুথ ইভেন্ট”-এ অংশ নেয়। ৯ ও ১০ জুন অনুষ্ঠিত এ কনফারেন্সের আয়োজন করে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন পার্লামেন্ট।

১৮ জুন দেশে ফেরে তারা। দেশের চরাঞ্চল থেকে এই আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে যোগ দেওয়া প্রথম শিক্ষার্থী তারা।

এমন একটি বৈশ্বিক মঞ্চে অংশগ্রহণের অনুভূতি নিয়ে কথা হয় রূপালি ও নুরুন্নাহারের সঙ্গে। ঢাকা ট্রিবিউনকে তারা জানায় সেই অভিজ্ঞতা, তাদের জীবনসংগ্রাম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা।

এই অনন্য অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য রূপালি খাতুন কৃতজ্ঞ ফ্রেন্ডশিপের কাছে। তার কথায়, “ফ্রেন্ডশিপ এই সুযোগ না করে দিলে হয়ত কখনোই দেশের বাইরে যেতে পারতাম না। বাইরের পৃথিবী দেখার আশৈশব স্বপ্নটাও পূরণ হতো না।”

“গাইবান্ধার বাটিকামারীতে ফ্রেন্ডশিপ স্কুলের ইনটারেক্টিভ কানেক্টিভিটি প্রোজেক্টের মাধ্যমে আমি এই সুযোগ পেয়েছি। ২০২১ সাল থেকে আমি এই প্রকল্পে জড়িত। প্রকল্পের বিভিন্ন ইভেন্টে আবহাওয়া ও জলবায়ু নিয়ে আমাদের মতো অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে আলোচনা করা হতো।”

এ বছর ইউরোপিয়ান ইয়ুথ ইভেন্টে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তরুণ-তরুণীরা অংশ নেন। তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন ফরাসি ক্লাইমেট অ্যাকটিভিস্টরা।

রূপালির অভিজ্ঞতায়, “ফরাসি অ্যাক্টিভিস্টরা এ বিষয়ে গল্প করতেন। সেখান থেকে আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিতেন তারা। আমরা আবহাওয়া এবং জলবায়ু সংক্রান্ত বিভিন্ন গ্রুপওয়ার্কও কাজ করেছি।”

প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে পা রাখার অভিজ্ঞতা যেকোনো মানুষের জন্যই অনন্য। ব্যতিক্রম হয়নি এই দুই কিশোরীর ক্ষেত্রেও। চরাঞ্চলের সংগ্রামী জীবন, খটখটে আবহাওয়া থেকে অর্ধেক নগরী, অর্ধেক কল্পনার প্যারিস। রূপালি আর নুরুন্নাহারের অভিজ্ঞতা হয়েছে ফ্রান্সের আরও কয়েকটি জায়গা ঘুরে দেখার।

নুরুন্নাহার খাতুনের গলায়ও সেই একই কৃতজ্ঞতার সুর, “প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আমার একার পক্ষে এমন অভিজ্ঞতা সঞ্চার কখনোই সম্ভব ছিল না। ফ্রেন্ডশিপের মাধ্যমে এ সুযোগ পেয়ে আমি খুশি। ফ্রেন্ডশিপের ‘আইসিপি ইন্টারস্কুল কানেক্টিভিটি'-তে ২০২১ সাল থেকে যুক্ত থাকার কারণে তারা আমাকে বাছাই করেন এবং আমি এত বড় একটি সুযোগ পাই। ফ্রান্সের অ্যাক্টিভিস্টদের বক্তব্য থেকে জলবায়ু সম্পর্কে অনেক স্বচ্ছ ধারণা পেয়েছি আমি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী অনেকে সেখানে উপস্থিত ছিলেন।”

নুরুন্নাহারের সংগ্রামের গল্পটা পরিচিত। অসুস্থ বাবা কর্মক্ষম নন, মা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। রূঢ় বাস্তবতাকে সে দেখেছে কাছ থেকে।

“আমাদের চরাঞ্চলে তেমন কোনো স্কুল ছিল না। স্থানীয় প্রাথমিক স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত। কাছাকাছি মাধ্যমিক না থাকায় বেশি দূর পড়ার সুযোগ হতো না। কিন্তু ফ্রেন্ডশিপ স্কুল চালু হওয়ার পর থেকে আমরা পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছি। আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি, দেশের বাইরে যাওয়ারও সুযোগ পেয়েছি।”

রূপালির বেড়ে ওঠা দরিদ্র কৃষক পরিবারে। এমন পরিবারের নিত্যদিনের গল্পও সবাই জানেন। পরিবার প্রধান এখানে একজন দিশেহারা চাষি। ঘাম ঝরে, ফসল ফলে, কিন্তু সন্তানের মুখে অন্ন জোটে না। পড়াশোনা যেন বিলাসিতা।

“পাঁচ ভাই-বোন আমরা। বাবা কৃষিকাজ করতেন। আমার বেড়ে ওঠা ছিল অনেক কষ্টের। বাবার পক্ষে একা সবার ভরণপোষণ সম্ভব ছিল না। বড় বোনের বিয়ের হয়ে যায় অল্প বয়সে। অন্য ভাই-বোনরা অনেক কষ্টে পড়াশোনা করেছে। সাত বছর বয়সে আমি ফ্রেন্ডশিপ স্কুলে ভর্তি হই। স্কুলে বিনামূল্যে পড়ানো হতো এবং শিক্ষার যাবতীয় খরচ স্কুল থেকে দেওয়া হতো। বাড়ি থেকে আমাকেও বিয়ের চাপ দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু স্কুলের শিক্ষকরা পরিবারকে বোঝানোর কারণে আমি আজ এখানে আসতে পেরেছি। আমার বড় বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে পেরেছে কেবল ফ্রেন্ডশিপ স্কুলের জন্য।”

এই দুই কিশোরীর কথায়, “ফ্রেন্ডশিপ স্কুলে আমরা মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরে ক্লাস করি। ঢাকার বড় বড় শিক্ষকদের লেকচার ভিডিও করে আমাদের দেখানো হয়।”

শিক্ষার আলো প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের শিশুদেরও স্বপ্ন দেখাতে শিখিয়েছে। নুরুন্নাহারের ইচ্ছা বড় হয়ে মায়ের মতো শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া।

‌“যেসব শিক্ষা আমি সময়মতো পাইনি, সেগুলো বাচ্চাদের শেখাতে চাই। বিদেশ থেকে জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে পাওয়া ধারণা সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই।”

নুরুন্নাহারের কথায়, ‍“আমাদের স্কুল থেকে অনেকেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেলে সুযোগ পাচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো বাল্যবিয়ের হার অনেক কমে গেছে।”

রূপালির ইচ্ছা আইন পেশায় নিযুক্ত হওয়া।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মত-দ্বিমতের শেষ নেই। ফ্রান্সে গিয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ হয় এই দুই কিশোরীর।

তাদের মতে, “আমাদের দেশের সঙ্গে বাইরের শিক্ষাব্যবস্থার অবশ্যই পার্থক্য আছে।”

সে কারণে বিদেশ থেকে সঞ্চিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ রক্ষায় কাজে লাগাতে চায় তারা।

রূপালীর মতে, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, খরা, নদীভাঙনের মতো দুর্যোগ হানা দেয়। প্রতি বছর বন্যায় নদীভাঙন দেখা দেয়। এ পর্যন্ত ছয়বার আমাদের বাড়ি ভাঙনের মুখে পড়তে দেখেছি। বড়রা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত মোট ১৩ বার ভাঙনের শিকার হয়েছি আমরা। দুইবার নদী গ্রাস করেছে আমাদের স্কুল। ভাঙনের পর অন্য জায়গায় বাড়ি করা অনেক ব্যয়বহুল এবং কষ্টসাধ্য। খাবারের অভাবে পড়তে হয়।”

এই দুই কিশোরীর পরামর্শ, আমাদের মতো চরাঞ্চলের শিশুরা যেন শত কষ্টেও তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যায়। তাদের যেন একটা ভবিষ্যত পরিকল্পনা থাকে।

বাবা মায়ের উদ্দেশে বলতে চাই, “তারা যেন মেয়েদের কম বয়সে বিয়ে না দেন।”

   

About

Popular Links

x