অক্টোবরের শেষ থেকে নভেম্বর। বছরের এই সময়টিতে নতুন এক আকর্ষণ ছড়াচ্ছে বাংলাদেশের উত্তরের সীমান্ত। কুয়াশাবিহীন মেঘমুক্ত নীলাকাশে নিয়মিত দেখা মিলছে পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা। পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা। চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য ও মায়াবী রূপলাবণ্য মেলে ধরে প্রকৃতিপ্রেমী ভ্রমণপিপাসুদের দুহাত বাড়িয়ে ডাকছে এই শৃঙ্গ। চোখ জুড়াতে হাজারো ভ্রমণপিপাসু প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটক আসছেন পঞ্চগড়ে।
সম্প্রতি এই পর্বতশৃঙ্গ দেখার পুরনো স্মৃতি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছেন ভ্রমণপ্রেমী ও আলোকচিত্রী ইফতেখার খান প্রতীক।
নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি জানান, ‘‘২০২০ সালের অক্টোবরের দিকে ভ্রমণ গ্রুপে ছবি দেখে জানতে পারেন পঞ্চগড় থেকে হিমালয় দর্শনের কথা। শীতকালের আগ মুহুর্তে নভেম্বর মাসজুড়ে কুয়াশাবিহীন-মেঘমুক্ত পরিষ্কার আবহাওয়া ও সুর্য দক্ষিণ দিকে থাকায় উত্তরবঙ্গের লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাও, পঞ্চগড় জেলা থেকে সকাল বেলায় আর পড়ন্ত বিকালে খালি চোখে হিমালয় পর্বতমালার মাউন্ট কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। তবে সবচেয়ে সুন্দর আর স্পষ্টভাবে দেখা যায় পঞ্চগড় জেলার তেতুলিয়া উপজেলা থেকে, বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের উপজেলা।”
‘‘সেই সূত্র ধরেই ফেসবুক গ্রুপে ‘মিশন কাঞ্চনজঙ্ঘা, কেউ যেতে চাইলে জানায়েন' এমন ঘোষণা নজরে আসে। পরিকল্পনা হয় নভেম্বরের ২য় সপ্তাহে ট্রেনযোগে সেখানে যাওয়ার। দিন ঠিক হয় ৮ নভেম্বর। ৯ তারিখ রাতে থাকার জন্য তেতুলিয়ায় একটি স্থানীয় হোটেলে রুম বুকিং করা হয়। তবে নভেম্বর মাসের ৪, ৫, ৬ তারিখ জানা যায়, ঘন কুয়াশার কারণে তিনদিন ধরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে না। তবুও সব ঠিকঠাক থাকায় ৭ তারিখ রওনা হওয়া। সেদিনও কুয়াশার কারণে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়নি।”
‘‘৮ তারিখ সকালে কাঞ্চনজঙ্ঘার খোঁজ নিয়ে জানতে পারি সেদিন আবছা কুয়াশায় আংশিক দেখা গিয়েছিল। সেই মতো রওনা ট্রেনে যাত্রা শুরু করি। ঠাকুরগাঁও রোড স্টেশন পার হওয়ার সময়েই কাঞ্চনজঙ্ঘা আবছা আবছা দেখা যাচ্ছিল। ট্রেনের জানালা থেকে ঐ মুহুর্তে কিছু ফটো ক্লিক করলাম। কিন্তু ডিসপ্লেতে ভাসে নাই। পরে ফেসবুকে ট্রাভেলিং গ্রুপ চেক করে দেখি, সেদিন ভোর থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছিল।”
‘‘৯ তারিখ সোমবার পঞ্চগড় পৌঁছাই। সেখানেই ঢাকা ফেরার জন্য ট্রেনের টিকেট কিনে রাখি। ওই স্টেশন থেকে আরও স্পষ্টভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছিল। সকালের নাশতা শেষে তেতুলিয়া যাওয়ার বাসে উঠলাম।”
‘‘পঞ্চগড় থেকে শুরু করে তেতুলিয়া পর্যন্ত বাসের জানালা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছিল। রাস্তার দুই পাড়ে চা বাগান। ভুলেই গেছিলাম, আমরা তেতুলিয়া যাচ্ছি। মনে হচ্ছিল, আমরা শ্রীমঙ্গলে। কখনও রাস্তার ডানদিকে বাংলাদেশ-ভারত বর্ডার, আবার কখনও রাস্তার বামদিকে বাংলাদেশ-ভারত বর্ডার। চা বাগানের মধ্য দিয়ে বর্ডার।”
‘‘সেখানে হোটেলে উঠি। হাত মুখ ধুয়ে তেতুলিয়া ঘুরতে বের হলাম। মহানন্দা নদীর পাড়ে ডাক বাংলোর পার্কে গেলাম। সেখানে দেখি, প্রচুর পর্যটক। সবার দৃষ্টি কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে।”
‘‘নিজ দেশের ভূখন্ড থেকে নিজ চোখে হিমালয় পর্বতের মাউন্ট কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসু লোক তেতুলিয়াতে ভীড় জমিয়েছে, এমনকি আমরাও। সীমান্ত ঘেষা মহানন্দা নদী ছিল, নদীর ঐ পাড় ভারতের শিলিগুড়ি। মহানন্দা নদীতে পাথর উত্তোলনের দৃশ্যগুলা উপভোগ করেছিলাম।”
‘‘ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছিল। আর স্পষ্ট হতে শুরু করছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা। সূর্য ডোবার আগ পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সূর্য ডোবার পর আস্তে আস্তে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছিল।”
‘‘পরেরদিন ১০ নভেম্বর। ভোর ৪টায় উঠে যাই। তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চলে যাই তেতুলিয়ার ডাক বাংলোর পার্কে। সেখানে গিয়ে অবাক হই। এই শীতের ভোরের অন্ধকারে পার্কে প্রচুর লোক, এরা সবাই ভোরের আলোতে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অপেক্ষায়, এমনকি আমরাও।”
‘‘সকাল ৬ টায় সূর্যোদয়ের আগ মুহুর্তে উত্তর আকাশে লাল রঙ্গের কিছু একটা দেখা যাচ্ছিল। সমতল থেকে হাজার হাজার ফুট উপরে কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় সূর্যের আলো পড়েছিল, সেই সূর্যের আলোতে সাদা কাঞ্চনজঙ্ঘা লাল হয়ে আমাদের চোখে দেখা যাচ্ছিল। সমতলের সূর্যোদয়ের আগে সেই চূড়াতে সূর্যোদয় হয়েছিল। ০৬.১০ তেতুলিয়া সূর্যোদয় হয়েছিল। আস্তে আস্তে লাল কাঞ্চনজঙ্ঘা সাদাতে রূপান্তর হচ্ছিল। আকাশে কোন মেঘ নেই, কোন কুয়াশা নেই। গতদিনের চেয়ে আরও স্পষ্টভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছিল।”
‘‘মনে মনে বলি, তেতুলিয়া আসাটা স্বার্থক। নিজ দেশের মাটিতে নিজ চোখে ১৩৫ কিমি দূরের হিমালয় দেখা, এটাই তো অনেক। ততক্ষনে ডাকবাংলো পার্কে প্রচুর ভীড় হয়েছে। ভোরের আলোতে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা উপভোগ করলাম আমরা দুইজন।”
‘‘ভোরবেলা থেকে ঘুরাঘুরি করে, সকাল ১১ টায় হোটেলে ফিরলাম। দুপুর ১২ টার কিছু আগে হোটেল ত্যাগ করি। হোটেল থেকে বের হয়ে তেতুলিয়ার রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাওয়া দাওয়া করি। খাওয়া দাওয়া শেষ করে দুপুর ১ টায় পঞ্চগড় যাওয়ার বাসে উঠি। পঞ্চগড় যাওয়ার পথেও বাসে থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছিল। দুপুরে যখন পঞ্চগড় স্টেশনে যাই সেখান থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছিল। এরপর দীর্ঘ যাত্রা শেষে ফের নীড়ে ফেরা।”



