যান্ত্রিক জীবনের আনন্দে থাকার ক্ষেত্রগুলো ক্রমশ কমে আসছে। পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে শহরের বাইরে বনভোজনে যাওয়ার সময় পাওয়া এখন বেশ দুষ্কর। ব্যস্ততম শহর ঢাকার নিরন্তর বাড়তে থাকা ভিড়ে বেড়ানোর জায়গাগুলো সবসময়ই থাকে কোলাহলপূর্ণ। সেখানে সবুজে ঘেরা ছায়া ঢাকা পরিবেশে বা নদীর ধারে বনভোজন অসম্ভব ব্যাপার।
তবে, নগরবাসীর এই চাহিদা পূরণ করতে পারে ঢাকার উপকণ্ঠে গড়ে ওঠা পিকনিক স্পটগুলো। এইসব স্থানে ভ্রমণের মাধ্যমে ইটপাথরের শহর থেকে নিজেকে একটু প্রকৃতির কাছে, নির্জনতার কাছে উজার করে দিতে পারেন। ঢাকার কাছেই ১০টি মনোরম জায়গা তুলে ধরা হলো-
জল ও জঙ্গলের কাব্য
বিগত কয়েক বছর ধরে ভ্রমণপিপাসুদের প্রিয় জায়গায় পরিণত হয়েছে গাজীপুরের পুবাইলের এই রিসোর্টটি। ৯০ বিঘা জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা রিসোর্টটি স্থানীয়দের কাছে পাইলট বাড়ি নামে পরিচিত। পুকুরে মাছ ধরা, শীতের পিঠাসহ অন্যান্য বাঙালি খাবার; সব মিলিয়ে জায়গাটির সর্বত্র ছড়িয়ে আছে এক গ্রামীণ আমেজ।
এখানকার ডে আউট প্যাকেজে বড়দের জন্য খাবারের খরচ ২০০০ টাকা। বাচ্চাদের জন্য অথবা সঙ্গে গাড়ি চালক থাকলে তাদের খরচ মাথাপিছু ১০০০ টাকা। রিসোর্টটিতে যাওয়ার জন্য গ্রুপে নূন্যতম ১০ জন থাকতে হয়। প্রতি সপ্তাহান্তেই জায়গাটি বেশ ব্যস্ত থাকে, তাই যাওয়ার আগে বুকিং দিয়ে নেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ। উত্তরা দিয়ে টঙ্গীর রাস্তায় পূবাইল কলেজ গেট হয়ে রিসোর্টে পৌঁছানো যায়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক
গাজীপুরের বাঘের বাজারে অবস্থিত অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি দর্শনীয় স্থান। সাফারি পার্কটিতে রয়েছে ৫টি সেকশন- কোর সাফারি, সাফারি কিংডম, জীববৈচিত্র্য পার্ক, বিস্তৃত এশিয়ান সাফারি পার্ক ও বঙ্গবন্ধু চত্বর।
বন্যপ্রাণীদের মধ্যে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার ও সাদা সিংহ তো আছেই। এছাড়া দেখা পাওয়া যাবে জেব্রা, হরিণ, বাইসন, ম্যাকাও, হর্নবিল, ময়ূর, হাতি, কুমির, চিত্রা হরিণ, বানর ও হনুমানের। আলাদাভাবে দৃষ্টি চলে যাবে জাতীয় ইতিহাস জাদুঘর, অ্যাকোয়ারিয়াম, হাঁসের পুকুর এবং ছোট প্রজাপতি ঘের।
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে বনভোজনের জন্য প্রবেশ মূল্য ৪০০ টাকা। এছাড়া জনপ্রতি ৫০ টাকা করে রাখা হয়। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত প্রতিদিনি খোলা থাকে সাফারি পার্কটি। ঢাকা-ময়মনসিংহ পথে বাঘের বাজার যেয়ে বাঁ দিকে কিছুদূর গেলেই পৌঁছানো যায় এই পার্কটিতে।
সোনারগাঁও পানাম নগর
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে নির্মিত হওয়া বাংলাদেশের হিন্দু বণিকদের সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত এই শহরটি এখন একটি জনপ্রিয় পর্যটন স্থান। সোনারগাঁও লোক-শিল্প ও কারুশিল্প জাদুঘর, গোয়ালদী মসজিদ এবং সোনারগাঁয়ের অন্যান্য আকর্ষণগুলো দেখতে দেখতে সারাটা দিন কেটে যাবে। বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ দ্বারা সংরক্ষিত অঞ্চলটি সপ্তাহের ৬ দিন উন্মুক্ত থাকে দর্শনার্থীদের জন্য। শুধুমাত্র রবিবার বন্ধ থাকে পানাম নগর। এছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। মাত্র ১৫ টাকা প্রবেশ মূল্যে এই ঐতিহাসিক স্থানটি ঘুরে বেড়াতে পারেন পর্যটকরা।
গুলিস্তান থেকে নারায়ণগঞ্জের পথে মোগরাপাড়া হয়ে হাতের বাঁ দিকে কিছু দূর এগোলেই পৌঁছানো যায় পানাম নগরে।
মৈনট ঘাট
প্রমত্তা নদী পদ্মার সাগরসম রূপের জন্য স্থানীয়দের কাছে এই মৈনট ঘাট মিনি সমুদ্র সৈকত নামে পরিচিত। এখানে আসার পথে নবাবগঞ্জের পথে দেখে নেওয়া যেতে পারে নবাবগঞ্জের জজবাড়ি, আনসার ক্যাম্প, কোকিলপ্যারি দালান, উকিলবাড়ি, খেলারাম দাতার বাড়ি বা আন্ধার কোঠার মতো ঐতিহাসিক কিছু দর্শনীয় স্থান। লক্ষ্য যখন পদ্মার পাড়, তখন দর্শনার্থীদের সবারই মধ্যে হিড়িক পড়ে যায় ইলিশ ভাজা খাওয়ার। এছাড়া কার্তিকপুর বাজারের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ও বান্দুরা বাজারের চারা বিস্কুট কিনে নিতে তারা ভোলেন না।
গুলিস্তান থেকে বাবু বাজার সেতু পার হয়ে দোহারের পথে এগোলে রাস্তা গিয়ে শেষ হয় মৈনট ঘাটে। এছাড়া মোহাম্মদপুরের বসিলা সেতু দিয়েও ওঠা যায় দোহারের রাস্তায়।
জিন্দা পার্ক
নৌকা বাইচ, লাইব্রেরি, কৃত্রিমভাবে তৈরি খিলান-সুড়ঙ্গ এবং পদ্ম পুকুর; কোনো কিছুরই ঘাটতি নেই ঢাকাবাসীদের প্রিয় জিন্দা পার্কে। পরিবারকে নিয়ে পিকনিক করার জন্য একটি আদর্শ জায়গা এই পার্কটি। ১৯৮০ সালে জিন্দা গ্রামের অগ্রপথিক পল্লী সমিতির পাঁচ হাজার অধিবাসী দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে গড়েছেন এই অপূর্ব পার্কটি। পার্কে গাছের ওপর দেখা যাবে টং ঘর, মাটির ঘর, সুন্দর স্থাপত্যশৈলীর লাইব্রেরি ও ছোট্ট একটি চিড়িয়াখানা। পার্কের লেকে নৌবিহারের জন্য সাজানো আছে ৮টি নৌকা।
কুড়িল হাইওয়ে ধরে কাঞ্চন ব্রিজ পর্যন্ত যেয়ে বাঁয়ে বেশ খানিকটা ভেতরে গেলেই পাওয়া যাবে জিন্দা পার্ক। এখানে প্রবেশ টিকেট জনপ্রতি ১০০ টাকা। লাইব্রেরির প্রবেশ মূল্য ২০ টাকা।
আহসান মঞ্জিল
ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে সবচেয়ে প্রভাবশালী জমিদার পরিবারের সাক্ষী হয়ে আছে বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেষা এই গোলাপী প্রাসাদটি। প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই পর্যটকরা যেন নিজেদের আবিষ্কার করেন প্রাচীন কোনো নগরীতে। একসময়ের ঢাকার সবচেয়ে উচু ভিত্তির ওপর স্থাপিত এই দালানটি ১৯৯২ সাল থেকে জাদুঘর হিসেবে উন্মুক্ত করা হয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত জাদুঘরটি ঘুরে বেড়াতে ২০ টাকা প্রবেশ মূল্য দিতে হয়। শুধু শুক্রবার দুপুর আড়াইটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এছাড়া বৃহস্পতিবারসহ বিভিন্ন সরকারি ছুটির দিনগুলোতে বন্ধ থাকে এই দর্শনীয় জায়গাটি।
লালবাগ কেল্লা
ঢাকার লালবাগ এলাকায় অবস্থিত বিধায় প্রাচীন ঢাকার এই দুর্গটির নামকরণ করা হয়েছে লালবাগ কেল্লা হিসেবে। মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্দান্ত এই শৈল্পিক স্বাক্ষরটি আওরঙ্গাবাদ দুর্গ নামেও পরিচিত। তিনটি দালানে পরিবেষ্টিত দুর্গের কেন্দ্রীয় এলাকাটি। পূর্বে দিওয়ান-ই-আম ও হাম্মাম, পশ্চিমে মসজিদ। আর এই দুয়ের মাঝখানে পরী বিবির সমাধি। সুন্দর ফোয়ারার একটি জলধারা তিনটি ভবনকে সংযুক্ত করেছে। পুরো স্থাপনাটি অবস্থিত বুড়িগঙ্গা নদী তীরের সমৃদ্ধ লাল মাটিতে। কেল্লা রবিবার বাদে প্রতিদিনি সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। মাঝে দুপুর ১টা থেকে দেড়টা আধঘন্টা বন্ধ থাকে। এছাড়া যেকোনো সরকারি ছুটির দিনগুলোতে বন্ধ থাকে লালবাগ কেল্লা।
গোলাপ গ্রাম
সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের সাদুল্লাপুরে তুরাগ নদীর তীরে অবস্থিত গোলাপ ফুলের এক বিস্ময়কর রাজ্যের নাম গোলাপ গ্রাম। এখানকার লাল, হলুদ ও সাদাসহ রঙ-বেরঙের গোলাপগুলো যেকোনো পর্যটকের চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। রাজধানীতে গোলাপ ফুল যোগানের একটি বিরাট অংশ পুরণ করে এই গ্রামটি। গোলাপের ক্ষেত্রে মাঝ দিয়ে আঁকাবাঁকা সরু পথ নিমেষেই ভুলিয়ে দেবে শহরের কোলাহল।
এখানকার শ্যামপুর গ্রামে প্রতি সন্ধ্যায় বসে গোলাপের জমজমাট হাট। সেখানকার আবুল কাশেম বাজার ছাড়াও মোস্তাপাড়ার সাবু বাজারের সন্ধ্যাগুলো প্রতিদিনি মুখরিত থাকে ফুল ব্যবসায়ীদের আনাগোনায়। ঢাকা থেকে বিরুলিয়ায় সরাসরি বাস সার্ভিস আছে। তবে মিরপুর ১-এর দিয়াবাড়ি বটতলা ঘাট থেকে নৌকা ভ্রমনটি সবচেয়ে রোমাঞ্চকর যাত্রা।
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান
ঢাকা নগরবাসীর বনভোজনের জন্য সেরা জায়গা হলো গাজীপুর। আর সেই গাজীপুরের প্রধান আকর্ষণ হলো এই ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান। এখানে আছে চিড়িয়াখানা, ভাওয়ালের প্রাচীন গাছ শালের বন এবং একাধিক পিকনিক স্পট। চিড়িয়াখানায় দেখা মিলবে বাঘ, চিতাবাঘ, মেছোবাঘ, হাতি, ময়ূর ও হরিণের। থাকার জন্য আছে ১৩টি কটেজ এবং ৬টি বিশ্রামাগার। যাওয়ার জন্য আগে ভাগেই বুকিং দিয়ে নিতে হবে।
উদ্যানটিতে জনপ্রতি ৫০ টাকা প্রবেশ মূল্যে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা অব্দি ঘুরে বেড়ানো যাবে।
ঢাকা থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা পেরিয়ে ময়মনসিংহ রুটে একদম ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের গেটের সামনে নামা যায়।
নক্ষত্রবাড়ি রিসোর্ট
বনভোজনের জন্য রিসোর্ট খুঁজতে গেলে ভ্রমণপিপাসুদের পছন্দের তালিকায় প্রথমেই থাকে গাজীপুর জেলার রাজেন্দ্রপুরের এই রিসোর্টটি। নাট্য দম্পতি তৌকির আহমেদ ও বিপাশা হায়াত ২০১১ সালে প্রায় ২৫ বিঘা জমির ওপর নির্মাণ করেন এই রিসোর্ট।
সবুজে ঘেরা জায়গাটিতে গড়ে তোলা হয়েছে দীঘি, ঝর্ণা, সুইমিংপুল ও কনফারেন্স হল। তাই পরিবার-পরিজন কিংবা অফিসের কলিগদের নিয়ে পিকনিকে যাওয়ার ক্ষেত্রে নক্ষত্রবাড়ি রিসোর্ট সেরা জায়গা।
এই রিসোর্টে যেতে হলে প্রথমে ঢাকা থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তার পর ময়মনসিংহ রোড ধরে পৌঁছাতে হবে রাজেন্দ্রপুরের রাজাবাড়িতে। তারপর রাজাবাড়ি বাজার থেকে ডান দিকে চিনাশুখানিয়া গ্রাম পর্যন্ত গেলেই পাওয়া যাবে নক্ষত্রবাড়ি রিসোর্ট। রিসোর্ট ঘুরে দেখতে ৫০০ টাকা প্রবেশ মূল্য দিতে হবে।



