Friday, June 14, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

জেমস: সময় আর প্রজন্মকে জয় করা এক রকতারকা

জেমসকে ভক্তরা ডাকেন ‘গুরু’ বলে। এই উপাখ্যান শুধুই একটি নাম নয়, গানের জগতে এক অমোচনীয় নিশান। তার গানে তরুণরা বার বার খুঁজে পেয়েছে উদ্দীপনা, প্রাণোচ্ছ্বলতা

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৩, ০৯:১৪ এএম

অক্টোবরের ২ তারিখ। দিনটি বাংলাদেশি সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য বিশেষ। কারণ এই দিনটিতে পৃথিবীতে এসেছেন হৃদয়ে ঝড় তোলা শিল্পী জেমস, ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস। চার দশক ধরে যে কিংবদন্তির সুরের মূর্ছনায় ডুবে আছি আমরা।

জেমসকে তার ভক্তরা ডাকেন “গুরু” বলে। এই উপাখ্যান শুধুই একটি নাম নয়, গানের জগতে এক অমোচনীয় নিশান। তার গানে বাংলার তরুণ সমাজ বার বার খুঁজে পেয়েছে উদ্দীপনা, প্রাণোচ্ছ্বলতা। আর জেমসের গান মানেই কথা ও সুরের এক অনন্য মিশেল।

নগর বাউল ব্যান্ডের লিড গিটারিস্ট ও ভোকালিস্ট জেমস। ব্যান্ডটি একসময় ফিলিংস নামে পরিচিত ছিল। এটি বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীত জগতের ইতিহাসে একটি বিমূর্ত প্রতীক।

সঙ্গীতের আঁকাবাঁকা পথে জেমসের পদচারণা ’৮০-র দশক থেকে। ফিলিংসের পূর্বতন সদস্যরা চলে গেলে ফান্টি, পাবলো এবং স্বপনকে নিয়ে ব্যান্ডটিকে নতুন জীবন দেন জেমস। এই কয়েকজন মিলে বাংলা ব্যান্ডের খোলনলচে বদলে দেন। পান তুমুল জনপ্রিয়তা।

শুরুর দিনগুলোতে জেমসকে তুলনা করা হতো কিংবদন্তি ব্রিটিশ সঙ্গীতজ্ঞ মার্ক নফলারের সঙ্গে। জেমসের গিটার রীতিমতো ঝড় তুলতে পেরেছিল শহর থেকে গ্রামের সঙ্গীতপ্রেমী তরুণ সমাজের হৃদয়ে।

প্রথম অ্যালবাম “স্টেশন রোড” মুক্তির জন্য ফিলিংস চলে আসে ঢাকায়। ব্যান্ডটি রাতারাতি বিখ্যাত হতে না পারলেও “আমায় যেতে দাও”, “আগের জনমে” এবং “রূপসাগর”-এর মতো গানগুলো দিয়ে ঠিকই তারা নিজেদের পদচিহ্ন এঁকে দেয়।

১৯৮৯ সালে মুক্তি পায় জেমস তথা ফিলিংসের অ্যালবাম “জেল থেকে বলছি”। এরপর আর তাদের পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এই সাড়া জাগানো অ্যালবামের হাত ধরেই জেমসের ব্যান্ড উঠে আসে সোলস, ফিডব্যাক এবং চাইমের মতো মূলধারার ব্যান্ডের কাতারে।

সাইকেডেলিক রক থেকে ব্লুজ- সঙ্গীতের নানা ঘরানায় জেমসের দৃপ্ত পদচারণা। তিনি কাজ করেছেন কবি শামসুর রাহমান, প্রিন্স মাহমুদ, মারজুক রাসেল, শিবলি, আনন্দ এবং দেহলভীর মতো বিখ্যাত সব গীতিকারের সঙ্গে। জেমসের গানের সুরকার হিসেবে বিভিন্ন সময় দেখা গেছে লাকী আখন্দ এবং মানাম আহমেদের মতো কিংবদন্তিকে।

এদেশের মানুষের কাছে তাই জেমস জিম মরিসন, মার্ক নফলার কিংবা এরিক ক্ল্যাপটনের চেয়ে কম কেউ নন।

বাংলা রক ব্যান্ডের ইতিহাসে জেমসের “স্টেশন রোড”, “জেল থেকে বলছি”, “নগর বাউল”, “লেইস ফিতা লেইস” এবং “কালেকশন অব ফিলিংস” করে নিয়ে নিজস্ব অবস্থান।

সময়ের পরিক্রমায় ব্যান্ড ছেড়ে সঙ্গীত ভুবনে একা চলতে শুরু করেন জেমস। ভক্তদের জন্য একের পর এক অ্যালবাম নিয়ে আসতে থাকেন তিনি। “অনন্যা”, “পালাবে কোথায়”, “দুঃখিনী দুঃখ করো না”, “ঠিক আছে বন্ধু”, “আমি তোমাদেরই লোক”, “জনতা এক্সপ্রেস”, “তুফান” এবং “কাল যমুনা”র মতো জেমসের একক অ্যালবামগুলো ব্যাপক শ্রোতাপ্রিয়তা অর্জন করে। একসময় ফিলিংস ব্যান্ডকে তিনি “নগর বাউল” নাম দেন। নগর বাউল থেকে ২০০১ সালে আসে বিখ্যাত অ্যালবাম “দুষ্টু ছেলের দল”।

শিল্পীরা দেশ-কাল-সীমানার ঊর্ধ্বে। জেমসের মতো শিল্পীরা তা প্রমাণ করেছেন বার বার। প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গীতাঙ্গনেও রয়েছে গুরুর দৃপ্ত পদচারণা।

সহস্র শিল্পীকে পাশে ঠেলে বলিউড সঙ্গীত পরিচালকরা একাধিকবার আস্থা রেখেছেন জেমসের গলায়। ২০০৫ সালে “গ্যাংস্টার” সিনেমায় বলিউডে প্লেব্যাক করেন জেমস। জেমসের কণ্ঠে শোনা গেছে “ভিগি ভিগি”, “চল চলে”, “রিশতে” এবং “আলবিদা (রিপ্রাইস)”-এর মতো বিখ্যাত হিন্দি গান।

২০১৩ সালে “ওয়ার্নিং” ছবির জন্য জেমসের একক হিন্দি গান “বেবাসি”র রেকর্ড হয়। আরও অনেক গানের মতো এটিও তার ভক্তদের হৃদয়ে দোলা দিয়ে যাবে যুগ যুগ ধরে।

বিশ্বজোড়া খ্যাতি সত্ত্বেও জেমসের পা বরাবরই থেকেছে মাটিতে। সাদামাটা চালচলন, সৃষ্টির প্রতি নৈবেদ্য এবং ফটোগ্রাফির প্রতি ভালোবাসা বার বার রক তারকার খ্যাতির আড়ালে তার আপামর মানুষের শিল্পী পরিচয়কেই সামনে এনেছে।

১২ বছর বিরতির পর সম্প্রতি জেমস তার ভক্তদের উপহার দেন “আই লাভ ইউ” এবং “সবই ভুল” নামে দুটি গান।

“আই লাভ ইউ” গানটিকে জেমস উৎসর্গ করেছেন সেসব ভক্তদের, যারা দশকের পর দশক অকুণ্ঠ ভালোবাসা দিয়ে এসেছেন তাকে।

“কেন এই দীর্ঘ বিরতি?” বহুল চর্চিত এই প্রশ্নের উত্তরে জেমস থেকেছেন নিরুত্তর। তবে তাকে বলতে শোনা গেছে, “হয়ে গেল”।
 
জেমসকে বলা হয় “ব্যান্ড মিউজিকের পথিকৃৎ”। তিনি কেবলই একজন শিল্পী নন, ক্রম বিকাশমান বাংলা গানের জগতে জেমস একটি যুগের নাম।

তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন সেই সোনালি অতীতের কথা যখন অ্যালবাম ছিল অতি মূল্যবান সম্পদ। সে সময় ক্যাসেটে মুক্তি পেত গান। সেসব ক্যাসেট মোড়ানো থাকত কভার আর পোস্টারে। এই ডিজিটাল যুগের সঙ্গে সেই সময়টার ছিল বিস্তর ফারাক। সেই “সুন্দর পুরোনো দিনের” কথা স্মরণ করে জেমস বলেন, “আমরা একটা সুন্দর সময় দেখেছি, দুঃখের বিষয় হলো বর্তমানে সবকিছুই ডিজিটাল।”

তাই নিজের পরবর্তী গান ডিজিটাল নয় বরং প্রথাগত উপায়ে মুক্তির ইঙ্গিত দিয়েছেন জেমস। সঙ্গীতের পাশাপাশি জেমসের তোলা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। জেমসের এই শখ একদিন বড় পরিসর পাবে, তার তোলা ছবি নিয়ে হবে প্রদর্শনী- এমনটাই আশা ভক্তদের।

কাজের ব্যাপ্তির মতো জেমসের ভক্ত ছড়িয়ে আছে দেশের বাইরে। পুরো উপমহাদেশে তার “ভিগি ভিগি” এবং “আলবিদা” গান দুটির জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী।
 
জেমস তার সাদাসিধে জীবন, বিনয় এবং কালজয়ী গানের মধ্য দিয়ে শিল্পী থেকে হয়ে উঠেছেন একজন কিংবদন্তি।

তাই প্রতিবার কনসার্ট শেষে ভক্তদের উদ্দেশে তাকে বলতে শোনা যায়, “লাভ ইউ অল”। এ যেন প্রিয় শিল্পী গুরুর প্রতি কোটি ভক্তের ভালোবাসার প্রতিধ্বনি।

৫৯তম জন্মদিনে আমরা জেমসকে শ্রদ্ধা জানাই। তিনি এমন একজন শিল্পী যিনি শুধু গান শুনিয়েই আমাদের উদ্বেলিত করেননি, জায়গা করে নিয়েছেন হৃদয়েও। তার সুরের মূর্ছনায় বুঁদ হয়ে থাকবে অনাগত প্রজন্মও।

শুভ জন্মদিন, গুরু! আপনার সুর আগামী দিনেও ঝড় তুলুক আমাদের হৃদয়ে।

About

Popular Links