“নদীর কূলেইদ্যা যায় লঞ্চ। আর মাঝ নদী বরাবর শন শন কইর্যা ছোডে রকেট।” স্টিমারকে বরিশালের মানুষ ডাকেন ‘‘রকেট’’। আকাশে উৎক্ষেপনের সঙ্গে তা সম্পর্কহীন। তবে নদীর মাখামাখি বড় প্রবল যার ছুটে চলায়।
এখন পদ্মা সেতু হয়েছে। শোনা যাচ্ছে লঞ্চ ব্যবসায় ভাটা। কিন্তু কোনো কিছুরই সাধ্য নেই বরিশালের পথে নৌযাত্রা বিস্মৃত করার। স্মৃতির সবচেয়ে জ্বলজ্বলে অংশে ভাস্বর এ পথে নৌ-ভ্রমণ।
এর জন্য আগে যাওয়া চাই সদরঘাট। তফাৎ পাবেন গুলিস্তান থেকেই। নতুন আর পুরনো শহরের ভেদ এড়ানোর নয়। ঘোড়ার গাড়ি থেকে শ্যাওলা ধরা দালান আর মানুষের ভিন্ন কথ্যরীতি বোঝাবে এসব। বাকল্যান্ড বাঁধে পৌঁছে দুর্গন্ধ চাড়া দেবে। বুঝতে পারবেন কাছেই আছে এক মৃত নদী। যার শব পঁচে গলে জানান দেয় সাবেক শহর জন্মদাত্রীর করুণ দশা।
যতক্ষণ বুড়িগঙ্গা ততক্ষণ লঞ্চের সামনের বাতাসও লাগবে অসহ্য। শীতলক্ষ্যায় একটু স্বস্তি। আর অনবদ্য প্রহর রাত গড়ালে। বিশেষ করে চাঁদপুরের মোহনা পাড়ি দেওয়ার সময়টায়। কুবের মাঝিদের দেখা পাবেন এ পর্যায়ে। বিশাল আধুনিক নৌ-যানের ঢেউয়ে ওদের নৌকা দোলা খায়। নিভু নিভু হারিকেন আর জাল নিয়ে ওরা আছে প্রাচীনতায়।
মেঘনার চ্যানেলে কোনো কূলের দেখা নেই। সমুদ্র মনে হয়। অনেক রকম হকার থাকেন লঞ্চ-স্টিমারে। রসনায় বৈচিত্র্য আনতে তাদের খাবার দারুণ। রাতের খাবারে বড় চিংড়ি, ইলিশ আর রূপচাঁদা টাকা খরচ করলে পাবেন।
সময় পেলে পুরো লঞ্চটি ঘুরে দেখা যায়। ভিভিআইপি কেবিনের নিচের তলায় এক চাদরে শোয়া বহু মানুষ আছেন। তারা অল্প ভাড়ার যাত্রী। লঞ্চের ডেকে চলে বাংলা চলচ্চিত্রের উন্মুক্ত প্রদর্শনী। শাকিবের অ্যাকশন হয়তো দেখছেন কোনো লাল চা বিক্রেতা। মাঝ নদীতে ঠাণ্ডা বেশ। এক মমতাময়ী মা তখন ভালো করে কাঁথায় পেঁচায় তার শিশুকে।
কেবিন ততক্ষণে উল্লাসে ভরপুর। গিটারসহ গান চলে। নবদম্পতি নিজেদের জগৎ আপন করে নেয়। চাঁদরাত হলে বরিশালে নৌ-ভ্রমণ অনবদ্য হবেই।
আমাদের সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদী ঘিরে। নদীই আমাদের মা। তাই যতই সড়ক যোগাযোগ থাকুক কোনো দিন বিলীন হবে না নদীর পথে চলা। বাঙালির প্রাণস্পন্দনেই আছে, “মাঝি বাইয়্যা যাওরে” মতো গভীর অর্থ ও সুরের সহজ গীত। নৌযাত্রা তাই জিইয়ে থাকবে অনন্ত প্রহর।



