এখন শেষবেলার কার্তিক। সমাগত অগ্রহায়ন। কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বাংলার প্রকৃতির এ পর্ব উঠে এসেছে এভাবে-
“ধান কাটা হয়ে গেছে কবে যেন - ক্ষেত মাঠে পড়ে আছে খড়
পাতা কুটো ভাঙা ডিম - সাপের খোলস নীড় শীত।
এই সব উৎরায়ে ওইখানে মাঠের ভিতর
ঘুমাতেছে কয়েকটি পরিচিত লোক আজ- কেমন নিবিড়।
ওইখানে একজন শুয়ে আছে - দিনরাত দেখা হত কত কত দিন
হৃদয়ের খেলা নিয়ে তার কাছে করেছি যে কত অপরাধ;
শান্তি তবু: গভীর সবুজ ঘাস ঘাসের ফড়িং
আজ ঢেকে আছে তার চিন্তা আর জিজ্ঞাসার অন্ধকার স্বাদ।”
জীবনানন্দের জনপদ খ্যাত বরিশাল আজও ধারণ করে আছে এ বৈশিষ্ট্য। নানাবাড়ি বাকেরগঞ্জের বারোঘড়িয়া গ্রাম তার সাক্ষ্য।
গ্রামে গ্রামে এখন পুরুষ দেখি কম। তারা ঢাকা বা বিদেশে কর্মরত। ধান কাটার শ্রমিকের মজুরি তাই চড়া। তবু গৃহস্থ বাড়িকে হেমন্ত না ছুঁয়ে পারেনি। উঠেছে নতুন ধান। থেমে নেই পিঠা-পুলির আয়োজন। শহরের কৃত্রিমতার বাইরে এখনো বড় আদিম লোকজ বাংলার উৎসব।
বাড়িতে বাড়িতে চলছে শীত তাড়ানোর প্রস্তুতি। ঘরের উঠোনে লোপ তোষকওয়ালাদের তোড়জোড়। সারা বছরের কাঁথারা উঠে যাবে আলমিরায়। বিছানায় নেমে আসবে নতুন তুলার গন্ধ মাখা ধবল লেপ। শীতের ওম পুরোটা পেতে দরজা দরজায় আগুন তাঁতানোর প্রস্তুতি।
অদেখা রইল বরিশাল খ্যাত প্রশস্ত অনেক শাখা নদী। ওরা এখন খালের চেহারায়। গ্রামের কিশোররা জল সেচে মেতে আছে মাছ ধরার আনন্দে। দুঃখের বাংলায় উল্লাসের উপলক্ষ্য খুঁজে নিতে কারও দেরি হয় না।
গ্রামীণ বাংলায় একদিকে চলছে ব্যাপক মাত্রায় ওয়াজ মাহফিল। তেমনই হারায়নি যাত্রা আর জারি গান। চলে যাওয়া লক্ষ্মী পূজার রেশ আছে হিন্দু বাড়িগুলোয়। সমাজের উপরের স্তর রক্তাক্ত হয় সাম্প্রদায়িকতায়। কিন্তু তা এখনো গ্রাস করেনি নিম্নবর্গের জীবনকে। নিয়মিত গ্রাম ভ্রমণে বাংলার সাধারণ মানুষের আচরণ দেখে এ বোধ দৃঢ় হয়।
তথ্য-প্রযুক্তি এখন গ্রাম পর্যায়ে। ফেসবুক টিকটকে মাতায়ারা ভীষণ এখনের গ্রাম। টিভি হয়ে পড়েছে ব্রাত্য। স্মার্টফোনে গ্রামীণ বধূরা লুডুও খেলছেন। এমন পরিবর্তন আগে দেখা ছিল না। অনেক বাড়ির ছাদে দেখা গেল সোলার প্যানেল। পল্লী বিদ্যুতের খামখেয়ালিতে কেন আর জিম্মি থাকবে সাধারণ? নিজেদের ব্যবস্থা নিজেরাই করে নিতে পরিবেশবান্ধব এমন ব্যবহার্য তাই।
পদ্মা সেতু হয়ে যাওয়ায় ঢাকা-বরিশাল লঞ্চ ব্যবসায় পড়েছে ভাটা। যে বিনিয়োগ এ খাতে আছে তাতে তা একদম বন্ধ হবে তা বলা যায় না। তবে আন্দাজ করা যায় টিকে থাকবে শুধু বড় আকারের লঞ্চ কোম্পানিগুলো। বাকিদের বেছে নিতে হবে সময় উপযোগী কোনো ব্যবস্থা।
সব মিলিয়ে হেমন্তে বাংলার গ্রাম বেড়িয়ে আসার অভিজ্ঞতা অনবদ্য। দূষিত শহুরে জীবনের বাইরে কিছুটা দম নেওয়ার বিরতি। সেই সঙ্গে যোগাযোগ নাড়ির মাটির সঙ্গে। বহু প্রতিকূলতায়ও যে টান নিবিড়।



