Saturday, September 12, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সেদিন ক্র্যাক প্লাটুনের ফাঁদে পড়ে নিজেদেরই মেরেছিল পাকিস্তানি সেনারা

  • ক্র্যাক প্লাটুনের চাতুর্যে নিজেদের মধ্যেই গোলাগুলি শুরু করে হানাদার বাহিনী
  • নিহত হয় কমপক্ষে ৩০ জন
  • মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ঢাকা ট্রিবিউনে গবেষক রা'আদ রহমানের লেখা সিরিজের নবম পর্ব এটি
আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৩, ০২:২৩ পিএম

একাত্তরের জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে ইসলামি সেক্রেটারিয়েটের সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক মালয়েশিয়ান প্রেসিডেন্ট টুংকু আবদুল রহমান ঢাকা সফরে আসেন। তার সম্মানে চারদিকে চলছিল নানা তোড়জোড়। পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে আন্তর্জাতিক মহলে পরিস্থিতি জানাবেন তিনি। তাই তার সামনে দেশের পরিস্থিতি বিশেষ করে ঢাকার অবস্থা ভালো দেখানো ছিল গুরুত্বপূর্ণ। 

তাই টুংকুর সফরে বিশেষ নিরাপত্তার মাধ্যমে নানা আয়োজন চলছিল।

টুংকু ঢাকায় এসে মাদ্রাসা পরিদর্শন, বিশাল নৌবিহার, নৈশভোজ করছিলেন বিভিন্নজনের আয়োজনে। বড় বড় কথা বলছিলেন দেশের অবস্থা নিয়ে, পাকিস্তানের একতাবদ্ধ থাকা, “দুষ্কৃতিকারীদের” নির্মূলের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বেশ জ্ঞান দিচ্ছিলেন সুযোগ পেলেই। এরই মধ্যে যুদ্ধে উদ্বাস্তুদের সহায়তা ও পুনর্বাসনের জন্য পাকিস্তান সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা দেখতে চুয়াডাঙ্গা ও ঝিকরগাছা অভ্যর্থনা কেন্দ্রে (একাত্তরে পাকিস্তানি সেনারা এই ধরনের কিছু কেন্দ্র খুলেছিল। যেখানে বাস্তুচ্যুত ও দেশ ছেড়ে পালানো মানুষদের আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে বলে প্রচার করা হতো) যাবেন বলে জানা গেল।

এছাড়া, ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় দুর্গত ও উদ্বাস্তু জনগণের পুনর্বাসন প্রকল্পের অগ্রগতি দেখতে ভোলা ও পটুয়াখালীতে যাওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন টুংকু। চারদিকের পরিবেশ-পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখতে পাচ্ছেন বলে জানিয়েছিলেন তিনি। মানে শিক্ষার্থীবিহীন জনশূন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিকেল না হতেই জনবিরল জিন্নাহ অ্যাভিনিউ ও সদরঘাট হয়ে নগর পরিভ্রমণ করে নাকি তার মনে হয়েছে সব ঠিকঠাকই আছে! 

দুষ্কৃতিকারীদের তৎপরতা বা হামলা সম্পর্কে যা শুনেছিলেন সেসব নিয়ে হয়ত মন খুঁত খুঁত করছিল তার।

টুংকুর সব সন্দেহ রীতিমতো বাষ্পীভূত হয়ে গেল সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ীতে গেরিলাদের চাতুর্যে পাকিস্তানি সেনাদের চরম রক্তক্ষয়ী সেইমসাইড ফায়ারিংয়ে। প্রায় ত্রিশজন সেনা হারিয়ে পাগলপ্রায় পাকিস্তানিরা রীতিমতো তাণ্ডব শুরু করে চারপাশের এলাকায়, সাধারণ নিরস্ত্র জনগণের ওপর। এক ভীতিকর পরিস্থিতিতে প্রথমে টুংকুর ভোলা ও পটুয়াখালী সফর বাতিল হলো, এরপরে চুয়াডাঙ্গা ও ঝিকরগাছা সফরেও যেতে অস্বীকৃতি জানালেন তিনি। 

যদিও দুটো সফর বাতিলের কারণ হিসেবেই দেখানো হলো দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার অজুহাত! এতোটাই সুদূরপ্রসারী সাড়া ফেলেছিল এই ঘটনা। এই সেইমসাইড ফায়ারিংয়ে সারারাত তুমুল গোলাগুলি হয়, প্রচুর হতাহতও হয় দুই পক্ষেই, কিন্তু এ পক্ষেও পাকিস্তানি সেনা, ওপক্ষেও তারাই! দুইপক্ষ মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা কমপক্ষে ৩০ জন! 

ঘটনাটা মূলত ঘটেছিল ঢাকার সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী এলাকায়। একাত্তরের জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে ক্র্যাক প্লাটুনের চারজন গেরিলা পুলু, হানিফ, মোজাম্মেল ও বারেক মিলে পাকিস্তানি সেনাদের জন্য একটা অ্যাম্বুশের ফাঁদ পেতেছিল। জর্দার কৌটার মতো দেখতে তিনটা মিনি মাইন এবং একটা থ্রি নট থ্রি রাইফেল ও একটা স্টেনগান নিয়ে এই অপারেশনে গিয়েছিল তারা। 

ঘটনার শুরু এক নির্দোষ কৌতূহল থেকে। ধলপুরে তখন পুলুদের ঘাঁটি। স্টেনগান, লাইট মেশিনগান, রাইফেল, রিভলবার, এসএলআর, হ্যান্ড গ্রেনেড ইত্যাদি বিভিন্ন অস্ত্র এতদিন ব্যবহার করেছে তারা, কিন্তু জর্দার ডিব্বার মতো দেখতে মিনি মাইন বিস্ফোরকটা আর ব্যবহার করা হয়নি। তাদের ট্রেনিংয়ের সময় বলা হয়েছিল এই জিনিসটা নাকি খুবই কড়া।

‘‘সোফার কুশনের নিচে কোনভাবে যদি ওই ডিব্বার মতো বিস্ফোরকটা লুকিয়ে রাখতে পারো, আর বড় সাহেব যদি এসে সেই সোফায় বসেন তখন দেখবে বসতে না বসতেই তিনি এক লাফে তিনতলায় উঠে গেছেন।’’

যেহেতু এই মিনি মাইনগুলো মূলত গাড়ি ওল্টাতে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু গেরিলাদের সামনে সুযোগও আসছিল না সেভাবে। মূলত কৌতূহল থেকেই হানিফ আর পুলু বললো, ‘‘নাহ, এগুলো এইভাবে এমনি ফেলে রাখার কোনো মানে হয় না। জিনিসটার তেজ আসলে কত সেটা পরীক্ষা করা দরকার!’’ জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহের এক রাতে তারা সায়েদাবাদ পুলের ওপাশে যাত্রাবাড়ী অভিমুখী রাস্তায় সেই মিনি মাইন তিনটা রেখে দিল। রাত তখন ১২টা।

মাইন পেতে রেখেই বিচ্ছুর দল এক ছুটে পাশের এক বাড়িতে গিয়ে বসে রইল তেলেসমাতি সচক্ষে দেখার জন্য। যাত্রাবাড়ির সেই রাস্তায় মাইন বসানোর আরও কিছু উদ্দেশ্য ছিল। রাস্তাটি দিয়ে হরদম মিলিটারি কনভয় যাতায়াত করত। আর রাত ১০টার পর মিলিটারি কনভয় ছাড়া ওই রাস্তা একেবারেই জনশূন্য হয়ে পড়ত। এছাড়াও সায়েদাবাদ পুল ও যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তার মধ্যবর্তী এক জায়গায় ছিল হানাদার সেনাদের একটা ক্যাম্প ও চেকপোস্ট। গেরিলাদের লক্ষ্য ছিল জর্দার ডিব্বার বাজনা ওই দূরবর্তী পাকিস্তানি হানাদারদেরও শোনানো।  

কিন্তু গেরিলারা খুব সম্ভবত নিজেরাও কল্পনা করতে পারেনি এরপরে আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে!

পৌনে ১টা বেজে গেল। কিন্তু কোনো গাড়িরই পাত্তা নেই। সোয়া ১টা, দেড়টা, পৌনে ২টা, ২টা...রাত ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহী কোনো যানবাহনের পাত্তাই নেই। একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে গেরিলারা যখনই সেদিনের মতো উঠে যাবে ভাবছে, তখনই আচমকা দেখা গেল যাত্রাবাড়ীর দিক থেকে আসছে দুই জোড়া হেডলাইট। সামনের গাড়ি থেকে পেছনের গাড়ির দূরত্ব সব মিলিয়ে ৫০-৬০ গজের বেশি। প্রচণ্ড উত্তেজিত গেরিলাদলের সামনে খানিক পরেই বিকট বিস্ফোরণের শব্দ!

সামনের গাড়িটি ছিল পাকিস্তানি সেনাভর্তি মিলিটারি লরি। বিস্ফোরণে সেটি ছিটকে গিয়ে উল্টে পড়ল পাশের নিচু জলাভূমিতে। গতির ভারসাম্য হারিয়ে পেছনের গাড়িটিও সোজা একই পথের যাত্রী হলো। এটিও ছিল পাকিস্তানি সেনাভর্তি। 

রীতিমতো যেন নরক নেমে এলো দুই লরির সেনাদের ওপর। ডোবার নোংরা পানিতে ভিজে জবজবে হয়ে যখন পাকিস্তানি সেনারা রাস্তায় ওঠার কসরত করছে, এমন সময়ই তাদের ওপর নেমে এলো আরেক আজাব! 

যাত্রাবাড়ী মিলিটারি চেকপোস্ট থেকে ঝাঁক বেঁধে ছুটে এলো এলএমজির টানা বুলেট বৃষ্টি! চেকপোস্টের পাকিস্তানি সেনারা ভেবেছে হামলাকারী ‘‘মুকুতলোগ’’রা তাদের লক্ষ্য করেই হামলা করেছে, সুতরাং তারাও বীরের মতো ছুটিয়ে দিল তাদের রাইফেলের ঘোড়া! এদিকে লরি উল্টে গড়াগড়ি খাওয়া পাকিস্তানি সেনারা ততক্ষণে প্রাণ বাঁচাতেই পজিশন নিয়েছে রাস্তার এদিকে, তারাও ধারণা করল মুক্তিবাহিনীর বিচ্ছুরা মাইন ফাটিয়ে তাদের এলোমেলো করে এখন গুলি ছুড়ছে শেষ করে দেওয়ার জন্য। সুতরাং তারাও গুলি করতে শুরু করল যাত্রাবাড়ী চেকপোস্টের যেদিক থেকে গুলি আসছে সেটা লক্ষ্য করে! ফলে দুপক্ষের মধ্যে শুরু হলো সেইমসাইড ফায়ারিং! 

দুইপক্ষের এই সেইমসাইড চললো বেশ অনেকক্ষণ ধরে। একপর্যায়ে যখন থামল, তখন গেরিলারা শুরু করল তাদের কাজ। এই সুযোগে যতগুলো জেনোসাইডার পিশাচকে নরকে পাঠানো যায় আর কী! গেরিলারা তাদের স্টেনগান নিয়ে এক ছুটে চলে এলো সেই বাড়ির ছাদে, আকাশের দিকে লক্ষ্য করে ছুড়লো একরাশ গুলি। ব্যস! সেই শব্দ পাওয়া মাত্র আবার শুরু হলো খানসেনাদের নিজেরাই নিজেদের শেষ করার সেইমসাইড! এবার আরও বড় আকারে! অর্থাৎ যাত্রাবাড়ি পুলের পাকিস্তানি সেনারা মনে করতে লাগলো সায়েদাবাদ থেকে মুক্তিযোদ্ধারা গুলি করছে, সায়েদাবাদ পুলের পাকিস্তানি সেনারা ভাবলো মুক্তিযোদ্ধারা গুলি করছে যাত্রাবাড়ি থেকে।

ফলে দুইপক্ষের মধ্যে এই সেইমসাইড গোলাগুলি চলতে লাগলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এই সার্কাস উপভোগ শেষে রাত ৪টার দিকে গেরিলারা চলে এলো সেই স্থান থেকে। ভোর পর্যন্ত গুলি চললো দুইপক্ষের মধ্যেই। ভোরের দিকে হাটখোলার দিক থেকে এবং ডেমরার দিক থেকে এলো ভারি ভারি যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের আর্টিলারি বাহিনী। পরে বোঝা গেল সারারাত এরা একে অন্যের দিকে গুলি ছুঁড়েছে, খুবই হাস্যকর কিন্তু রক্তক্ষয়ী এক সেইমসাইড!

রাগে-ক্ষোভে-দুঃখে ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত হাটখোলা মোড় থেকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা পর্যন্ত কারফিউ দিয়ে তাণ্ডব চালালো পাকিস্তানি সেনারা। রাস্তার পাশের বাড়ি থেকে বাড়ি তল্লাশি চলল, ঘরবাড়ি তছনছ হলো, যে যা পারল লুটপাট চালাল। মুক্তি খুঁজতে লাগলো তারা, অথচ সত্যিকারের মুক্তিরা ততক্ষণে এই এলাকার ত্রিসীমানা থেকে গায়েব!

তথ্যসূত্র:
- স্বাধীনতার সংগ্রাম ঢাকায় গেরিলা অপারেশন/ হেদায়েত হোসেন মোরশেদ
- ব্রেভ অফ হার্ট/ হাবিবুল আলম বীর প্রতীক

   

About

Popular Links

x