Tuesday, May 21, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

কৃত্রিম বৃষ্টি সম্পর্কে কতটা জানেন?

দুবাইয়ে আকস্মিক বন্যার পর কৃত্রিম বৃষ্টি নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৪, ০১:৫৬ পিএম

রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অভিজাত শহর দুবাই। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন, বিঘ্ন ঘটে বিশ্বের দ্বিতীয় ব্যস্ততম বিমানবন্দরে বিমান চলাচল।

২৪ ঘণ্টার অস্বাভাবিক বৃষ্টিতে এমন রেকর্ড বন্যার পর কৃত্রিমভাবে বৃষ্টি নামানো নিয়ে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। যদিও এ বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে এ ঘটনার পর অনেকের মধ্যেই কৃত্রিপ বৃষ্টি সম্পর্কে জানার আগ্রহ বেড়েছে।

চলুন, জেনে নেওয়া যাক কৃত্রিম বৃষ্টি বা “ক্লাইড সিডিং” সম্পর্কে-

ক্লাউড সিডিং হলো এমন একটি প্রযুক্তিগত পদ্ধতি, যা আকাশে বিদ্যমান মেঘগুলোকে আরও বৃষ্টি তৈরির জন্য প্রভাবিত করে। ক্লাইড সিডিংয়ের ক্ষেত্রে উড়োজাহাজ দিয়ে সিলভার আয়োডাইডের ছোট ছোট কণা মেঘের মাঝে ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপর খুব সহজেই জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিতে পরিণত হয়।

গত কয়েক দশক ধরেই বিশ্বব্যাপী এই কৌশলটি ব্যবহার করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংযুক্ত আরব আমিরাতও পানির সংকট মোকাবিলা করার জন্য ক্লাউড সিডিং পদ্ধতি ব্যবহার করেছে ।

গত সপ্তাহে ভারি বৃষ্টির পর দুবাইতে বন্যা শুরু হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা এই চরম আবহাওয়ার পেছনে দেশটিতে চালানো সাম্প্রতিক ক্লাউড সিডিং অপারেশনকে দায়ী করেন। যদিও এ বিষয়ে কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

সাধারণত বাতাসের আর্দ্রতা ও ধুলোবালি যদি বৃষ্টি ঝরাতে বাঁধা হয়, তখন ক্লাউড সিডিং পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়।

তবে গত সপ্তাহেই উপসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে একটি তীব্র বন্যার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল আবহাওয়ার পূর্বাভাসে।

এ বিষয়ে আবুধাবি’র খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও ভূ-পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডায়ানা ফ্রান্সিস যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন,“যখন এই ধরনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়, তখন ক্লাউড সিডিং-এর মতো একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া প্রয়োগ হয় না। কারণ, তখন এই ধরনের শক্তিশালী ব্যবস্থা প্রয়োগের কোনো প্রয়োজনই পড়ে না।"

বিবিসি ওয়েদার-এর আবহাওয়াবিদ ম্যাট টেইলর বলেন, “যে দুবাইয়ের চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার বিষয়ে আগে থেকেই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনার আগে কম্পিউটার মডেলগুলো খুব ভালোভাবেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে ২৪ ঘণ্টার মাঝে এক বছরের সমান বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।”

ম্যাট টেইলর আরও বলেন, “আমি যদি শুধুমাত্র ক্লাউড সিডিং থেকে বৃষ্টির কথা হিসেব করি, তাহলে দেখা যাচ্ছে যে বন্যার প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত ছিল। বাহরাইন থেকে ওমান, এই বিশাল এলাকায় মারাত্মক বন্যা দেখা দেয়।”

অর্থাৎ, ক্লাউই সিডিং সংযুক্ত আরব আমিরাতে করা হলেও (যদি) স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা শুধুমাত্র ওই দেশটিতে হয় নি। বরং, তা বাহরাইন থেকে ওমান পর্যন্ত প্লাবিত হয়েছে।

আমিরাতি অঞ্চলে ক্লাউড সিডিং প্রক্রিয়া মিশন ন্যাশনাল সেন্টার অব মেটিওরোলজি (এনসিএম) নামক একটি সরকারি টাস্ক ফোর্স দ্বারা পরিচালিত হয়।

বৃষ্টির প্রবলতা

মরুর দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলীয় অঞ্চলে দুবাইয়ের অবস্থান। দুবাই সাধারণত সারাবছরই খুব শুষ্ক থাকে। বছরে এখানে গড়ে ১০০ মিলিমিটারের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়। তবে মাঝে মাঝে শহরটিতে ভারি বৃষ্টিপাত হতে দেখা যায়।

দুবাই থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরের শহর আল-আইন। গত মঙ্গলবার সেখানে ২৪ ঘণ্টায় ২৫৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।

রেডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিদ অধ্যাপক মার্টেন অ্যাম্বাউম দুবাইয়ের এই বৃষ্টিপাত সম্বন্ধে বিবিসিকে বলেন, “পৃথিবীর এই অংশটি দীর্ঘসময় ধরে বৃষ্টিহীন থাকে, এটির বৈশিষ্ট্যই এমন। তবে এখানে অনিয়মিত ও ভারি বৃষ্টিপাত হয়। তারপরও এটি একটি খুব বিরল বৃষ্টিপাতের ঘটনা ছিল।”

ভারি বৃষ্টিপাত মোকাবিলায় প্রস্তুতি

ভারি বৃষ্টিপাত যেন প্রাণঘাতী বন্যায় পরিণত না হয়, সেজন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার মতো শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন। তবে অবকাঠামোগতভাবে দুবাই উন্নত শহর হলেও সেখানকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা ততটা উন্নত নয়।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, দুবাই শহরে বাতসের আর্দ্রতা শুষে নেওয়ার জন্য সবুজ জায়গা খুব সামান্য এবং সেখানকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা এত প্রবল বৃষ্টিপাত সামাল দেওয়ার মতো শক্তিশালী বা উন্নত ছিল না।

এ বিষয়ে অধ্যাপক ডায়ানা ফ্রান্সিস বলেন, “এই নতুন বাস্তবতার (ঘন ঘন ও তীব্র বৃষ্টিপাতের) সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য যথাযথ কৌশল এবং অভিযোজন ব্যবস্থা থাকতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, সড়কের অবকাঠামো ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাকে বৃষ্টিপাতের উপযোগি করতে হবে, মৌসুমের বৃষ্টি থেকে পানি সঞ্চয় করার জন্য জলাধার তৈরি করতে হবে এবং বছরের অন্য সময়ে তা ব্যবহার করতে হবে।"

এর আগে, গত জানুয়ারিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সড়ক ও পরিবহন কর্তৃপক্ষ দুবাইতে বন্যা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য একটি নতুন ইউনিট গঠন করে।

আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তন

দুবাইতে এমন বৃষ্টিপাত হওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন কতটা ভূমিকা পালন করেছে, তা সঠিকভাবে পরিমাপ করা এখনও সম্ভব নয়। সুনির্দিষ্ট করে বলার জন্য প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণগুলোর একটি সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন, যা করতে কয়েক মাস সময় লেগে যাবে।

তবে আপাতদৃষ্টিতে বিশষজ্ঞরা বলছেন, যেভাবে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে, তার সঙ্গে এই বৃষ্টিপাত খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তারা বলছেন, সাধারণত উষ্ণ বাতাস বেশি আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে। প্রতি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা অতিরিক্ত প্রায় ৭% বেশি আর্দ্রতা ধরে রাখে, যা বৃষ্টির তীব্রতা বাড়িয়ে দিতে পারে।

এ বিষয়ে রেডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানের অধ্যাপক রিচার্ড অ্যালান বলেন, "বৃষ্টির তীব্রতা রেকর্ড ভেঙেছে। কিন্তু জলবায়ুর উষ্ণতার সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে। কারণ, এ ধরনের বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকে, যা ঝড় তৈরিতে ও ভারি বৃষ্টিপাতের মতো ঘটনা ঘটায় এবং এর ফলে সৃষ্ট বন্যা ক্রমশ আরও শক্তিশালী হয়।”

এদিকে, সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেশিরভাগ অঞ্চলে বৃষ্টি বর্তমানের চেয়ে ৩০% পর্যন্ত বাড়তে পারে।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু বিজ্ঞানের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ড. ফ্রেডেরিক ওটোর’র মতে, মানুষ যদি তেল, গ্যাস এবং কয়লা পোড়াতে থাকে, তাহলে জলবায়ু উষ্ণ হতে থাকবে, বৃষ্টিপাত বাড়তে থাকবে এবং বন্যায় মানুষ প্রাণ হারাতে থাকবে।

About

Popular Links