মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘদিনের চলাচলের অচলাবস্থার পর এবার লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগকারী বাব আল-মান্দাব প্রণালিও তীব্র হুমকির মুখোমুখি হয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল পৌঁছানোর পথ ক্রমেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) গালফ নিউজের একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের পূর্বে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে অতিক্রম করলেও সেপ্টেম্বরে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে গড়ে ১৯টিতে। মার্কিন নৌবাহিনীর পাহাড়ায় ওমানের কাছাকাছি সমুদ্রপথ ব্যবহার করে কিছু জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলেও জুলাই ও আগস্টে অন্তত ২৩টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে, এবং যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মারা গেছেন অন্তত ২২ জন নাবিক। এতে করে উপসাগরীয় দেশগুলোর অপরিশোধিত তেল রপ্তানি আগের তুলনায় প্রায় তিন-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।
হরমুজ প্রণালির এই ঝুঁকি এড়াতে সৌদি আরব এতদিন তাদের ‘পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন’ ব্যবহার করে লোহিত সাগরের বন্দর দিয়ে তেল সরবরাহের বিকল্প পথ বেছে নিয়েছিল। তবে ইয়েমেনের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা ও পেরিম দ্বীপ ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধাদের দখলে চলে যাওয়ায় বাব আল-মান্দাব প্রণালি ব্যবহারের ঝুঁকি চরম আকার ধারণ করেছে। কেপলার জানায়, গত এক সপ্তাহে লোহিত সাগর থেকে মাত্র দুটি সৌদি পণ্যবাহী জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করতে পেরেছে। অন্যদিকে, ধারাবাহিক হামলার কারণে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনটিও বর্তমানে বন্ধ রাখা হয়েছে।
বিকল্প হিসেবে সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগরের পথ খোলা থাকলেও এশীয় অঞ্চলের ক্রেতাদের জন্য সেই পথ অত্যন্ত দীর্ঘ ও বিপুল ব্যয়বহুল। পরিবহনপথের এই বহুমুখী সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে হঠাৎ করেই তেলের মূল্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। শুক্রবার অপরিশোধিত তেলের দাম বিশ্ববাজারে সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতির চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার ও ডিজেলের দাম ৬ ডলার পার করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ পথগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ না হলেও বিকল্প পথগুলো ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ, ব্যয়বহুল এবং সামরিক সুরক্ষানির্ভর হয়ে পড়ছে। বাব আল-মান্দাবের বর্তমান পরিস্থিতির আর কোনো অবনতি ঘটলে তা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাকে এক অভূতপূর্ব বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।



