Wednesday, June 24, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

এবার ইরানে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে বিক্ষোভকারীদের ‘তড়িঘড়ি মৃত্যুদণ্ড’ ঘিরে

সোমবার আরও তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।  এ নিয়ে এখন পর্যন্ত বিক্ষোভে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় ১৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৩, ১২:১৬ পিএম

ঠিকমতো হিজাব না পরার অভিযোগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইরানে নীতি পুলিশের হেফাজতে মৃত্যু হয় কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনির। এর পরেই পুরো দেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিক্ষোভ দমনে গ্রেপ্তার, গুলি ও হেনস্তার পথ বেছে নেয় ইরান সরকার। ফল স্বরূপ বিক্ষোভের আগুন আরও দাউদাউ করে ওঠে। তবে তা এখন অনেকটা স্তিমিত।

ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় এখন পর্যন্ত চারজনকে ফাঁসি দিয়েছে ইরান। তারা হলেন মোহাম্মদ মেহদি কারামি (২২), সায়িদ মোহাম্মদ হোসেইনি (৩৯), মোহসেন শেকারি ও মাজিদ রেজা রাহনাভার্দ।

সোমবার (৯ জানুয়ারি) আরও তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তাদের আপিলের সুযোগ আছে। তারা হলেন সালেহ মিরহাশেমি, মাজিদ কাজেমি ও সাঈদ ইয়াঘুবি। “খোদার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা”র অভিযোগে তাদের সাজা দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত বিক্ষোভে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় ১৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এর আগে গত ২ জানুয়ারি ইরানের ভিন্নমতাবলম্বী লেখক ও চিত্রকর মেহেদি বাহমানকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তেহরানের একটি ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।

বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রস্তুতি নেওয়ার খবরে দেশটির একটি কারাগারের সামনে রাতভর প্রতিবাদ জানিয়েছেন একদল সাধারণ মানুষ।

বিক্ষোভকারীদের দিকে নির্বিচারে গুলি চালানোর পাশপাশি অনেক বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তারও করা হয়। যাদের বিরুদ্ধে আদালতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হত্যা বা গুরুতর জখম এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করার মত অভিযোগ আনা হচ্ছে। তাদের অনেকেই বিচারে মৃত্যুদণ্ডের সাজা পেয়েছেন।

এভাবে তাড়াহুড়ো করে সাজা দেওয়াকে “বিচারের নামে প্রহসন” বলেছে আন্তর্জাতিক নানা মানবাধিকার সংগঠন। ইরান কর্তৃপক্ষকে এসব বন্ধ করারও আহ্বান জানিয়েছে অনেকে।

কিন্তু তাতে কর্ণপাত না করে ইরান কৃর্তপক্ষ গত ডিসেম্বর মাস থেকে সাজা কার্যকর করা শুরু করে। এরইমধ্যে চার বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

এর আগে যে চারজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় তাদের মধ্যে ডিসেম্বর মাসের শুরুর দিকে মাত্র চার দিনের ব্যবধানে মোহসেন শেকারি ও মাজিদ রেজা রেহনাভার্দ নামে দুই বিক্ষোভকারীকে জনসম্মুখে ফাঁসি দেওয়া হয়। তাদের উভয়ের বয়সই ছিল ২৩ বছর।

মোহসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি গত সেপ্টেম্বরে তেহরানের একটি প্রধান সড়ক অবরোধ করে বড় ছোরা দিয়ে আধাসামরিক বাহিনীর এক সদস্যকে আঘাত করেছিলেন। আর নিরাপত্তা বাহিনীর দুই সদস্যকে হত্যার অভিযোগে মাজিদ রেজাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ৫১৬ বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি-এইচআরএএনএ।

নিহতদের মধ্যে ৭০ জন শিশু। আরো ১৯ হাজার ২৬২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি সংস্থাটির। বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর ৬৮ সদস্য নিহত হয়েছেন বলেও জানায় এইচআরএএনএ।

মৃত্যু ঝুঁকিতে যারা

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইরানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

২৬ বছর বয়সী সাহান্দ নুরমোহাম্মদ (বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়ন)

বিক্ষোভে অংশগ্রহণের পর গত ২৩ সেপ্টেম্বর তেহরান থেকে সাহান্দ নুরমোহাম্মদ-জাদেহ গ্রেপ্তার হন। তার বিরুদ্ধে একটি ময়লার বাক্স ও টায়ার পুড়িয়ে দেওয়ার এবং হাইওয়ে রেল ধ্বংস করে দেওয়ার অভিযোগ করা হয়। তার আইনজীবী বলেছেন, নুরমোহাম্মদের বিরুদ্ধে আদালতে প্রমাণ হিসেবে ঝাপসা ভিডিও ফুটেজ উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটির ভিত্তিতে তাকে অপরাধী হিসেবে শনাক্ত করা যায় না।

পরিবারের সঙ্গে ফোনালাপে নুরমোহাম্মদ বলেছিলেন, গ্রেপ্তারের দিনেই বলে দেওয়া হয়েছে, তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে। বিবিসির পারসি ভাষার সংস্করণে ফোন রেকর্ডটি প্রকাশ করা হয়েছিল।

মাহান সাদরাত মারানি (২২)

অক্টোবরের শেষের দিকে তেহরান থেকে মাহান সাদরাত মারানিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে আধা সামরিক স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী বাসিজের এক সদস্যের ওপর ছুরি নিয়ে আক্রমণ, মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ এবং একটি ফোন ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ আনা হয়।

অ্যামনেস্টি বলছে, নিম্নমানের ভিডিও ফুটেজের ওপর নির্ভর করে আদালতে প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। ওই ফুটেজে কোনো ছুরি দেখা যাচ্ছে না। যে বাসিজ সদস্য মারানির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন, পরে তাকে ফাঁসি থেকে বাঁচানোর চেষ্টায় অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। ফাঁসিতে ঝোলানোর কয়েক ঘণ্টা আগে সাদরাত মারানির সাজা স্থগিত করা হয়। তবে তার পরিণতি এখনো অনিশ্চিত।

মোহাম্মদ বোরোঘানি (১৯)

তেহরানের কাছে পাকদাশত এলাকা থেকে মোহাম্মদ বোরোঘানি গ্রেপ্তার হন। চাপাতি বহন, গভর্নরের ভবনে আগুন দেওয়া ও দায়িত্বরত এক কর্মকর্তাকে ছুরিকাঘাতে আহত করার অভিযোগ করা হয়েছে। ইনস্টাগ্রাম বার্তাকে উদ্ধৃত করে আদালত তাকে পাকদাশতে দাঙ্গার নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

বয়স ১৮ হওয়ার পর থেকে নিজের জীবন নিয়ে র‌্যাপ গাওয়া শুরু করেন তিনি। ইরানি সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গেছে, বোরোঘানির বাবা বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগৃহীত লোহার বর্জ্য বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ২ জানুয়ারি ইরানের সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করেছেন বোরোঘানির বিরুদ্ধে আগের রায় বহাল থাকবে।

২২ বছর বয়সী নাপিত মোহাম্মদ ঘোবাদলু

২২ সেপ্টেম্বর তেহরান থেকে মোহাম্মদ ঘোবাদলু গ্রেপ্তার হন। তার বিরুদ্ধে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে গাড়িচাপা দেওয়া, এক ব্যক্তিকে হত্যা এবং আরও পাঁচজনকে আহত করার অভিযোগ দায়ের হয়। একটি স্বীকারোক্তিকে প্রমাণ হিসেবে আমলে নিয়েছেন আদালত। তবে অ্যামনেস্টি বলছে, নির্যাতনের মধ্য দিয়ে জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে। ২৪ ডিসেম্বর ইরানের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন, ঘোবাদলুর বিরুদ্ধে রায় বহাল থাকছে।

র‌্যাপার ও গ্রাফিকশিল্পী সামান সিদি

২৪ বছরের সামান সিদি পেশাগতভাবে ইয়াসিন নামে পরিচিত। গত ২ অক্টোবর তেহরান থেকে তিনি গ্রেপ্তার হন। তার বিরুদ্ধে পিস্তল বহন এবং বিক্ষোভ চলার সময় তিনবার ফাঁকা গুলি ছোড়ার অভিযোগ করা হয়েছে। একটি স্বীকারোক্তিকে প্রমাণ হিসেবে আমলে নিয়েছেন আদালত। তবে অ্যামনেস্টি বলছে, নির্যাতনের মধ্য দিয়ে জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে।

৫৩ বছরের হামিদ ঘারে হাসানলু

হামিদ ঘারে হাসানলু গত ৪ নভেম্বর তেহরানের খুব কাছের এলাকা কারাজ থেকে গ্রেপ্তার হন। বিক্ষোভ চলার সময় এক বাসিজ সদস্যকে হত্যা করার অভিযোগে তার মৃত্যুদণ্ড হয়। তার স্ত্রী ফারজানেহকেও (৪৬) ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কারাভোগের সময় তার সঙ্গে কারও দেখা করাও নিষেধ।

অ্যামনেস্টি বলছে, নির্যাতন করে ফারজানেহর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে। সে স্বীকারোক্তিকেই প্রমাণ হিসেবে আমালে নিয়েছেন আদালত। যদিও ফারজানেহ পরে সে স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করে নেন।

মঞ্চ অভিনেতা হোসেন মোহাম্মদি

হোসেন মোহাম্মদি গত ৫ নভেম্বর কারাজে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন। কারাজে বিক্ষোভ চলার সময় এক বাসিজ সদস্যকে হত্যার দায়ে তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অ্যামনেস্টি বলছে, তার কাছ থেকে জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় করে তা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়েছে। সে স্বীকারোক্তির ভিত্তিতেই তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন আদালত।

পুরস্কার বিজয়ী মঞ্চ অভিনেতা মোহাম্মদি কবিতা লিখতেন, গান গাইতেন। বেশ কয়েকটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র ও নাটকে তিনি অভিনয় করেছেন। স্থানীয় শিল্প উৎসবে তিনি সেরা অভিনেতার পুরস্কারও জিতেছেন।

৪৫ বছর বয়সী মানুচেহের মেহমান নাভাজ

গত ২৫ সেপ্টেম্বর মানুচেহের মেহমান নাভাজ তেহরান প্রদেশ থেকে গ্রেপ্তার হন। তার বিরুদ্ধে একটি সরকারি ভবন ও কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেওয়া এবং নিরাপত্তা ফাঁড়িতে আক্রমণের অভিযোগ করা হয়েছে। বন্ধুকে নাভাজের পাঠানো একটি খুদে বার্তা এবং ঝাপসা ফুটেজকে প্রমাণ হিসেবে আমলে নিয়ে আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। আদালতে কৌঁসুলিরা অনুরোধ করেছেন, নাভাজ যেখানে অগ্নিসংযোগ করেছেন, সেখানেই যেন তাকে প্রকাশ্য ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।

   

About

Popular Links

x