Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

পাকিস্তানের ওপর কেন ক্ষেপেছে আফগান তালেবান?

ইসলামাবাদের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ তালেবান শাসকদের ক্ষুব্ধ করেছে

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:৫৮ পিএম

আফগানিস্তানে যখন মার্কিন মদদপুষ্ট সরকারের পতন ঘটে, তখন মোটামুটি প্রকাশ্যে উচ্ছ্বসিত ছিল পাকিস্তান। ধারণা করা হচ্ছিল, চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে থাকা আফগান তালেবানের পায়ের তলায় নিজেদের পিঠ এগিয়ে দিয়েছে প্রতিবেশী পাক সরকার। কিন্তু ক্রমেই পায়ের তলার মাটি শক্ত হতে হতে আফগান সরকারের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে পাকিস্তানের। অবস্থা ক্রমে ক্রমে এমন হয় যে, কোথাও কোথাও মুখোমুখি দাঁড়াতে থাকে প্রতিবেশী দুই দেশ। এখন তো সরাসরি বলাই চলে, আফগান তালেবান রীতিমত পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে।

ইসলামাবাদের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ তালেবান শাসকদের ক্ষুব্ধ করেছে। ২০২৩ সালে পাকিস্তান প্রতিবেশী দেশের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পাঁচ লাখ অনিবন্ধিত আফগান অভিবাসীকে বহিষ্কার করে ও সীমান্ত ক্রসিংয়ে কঠোর ভিসা নীতি প্রয়োগ করে।

এ বছরের মার্চে পাকিস্তানি জঙ্গি গোষ্ঠীর সন্দেহভাজন আস্তানা লক্ষ্য করে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে বিরল বিমান হামলা শুরু করে পাকিস্তান। এতে আটজনকে হত্যা করা হয়। জবাবে আফগান বাহিনীও সীমান্তে গুলি করে।

ওয়াশিংটনের পলিট্যাক্ট থিঙ্ক ট্যাঙ্কের দক্ষিণ এশিয়া ফেলো নাদ-ই-আলি সুলেহরিয়া ডব্লিউকে বলেন, তালেবানরা ক্ষমতায় আসার পর তাদের সহযোগিতার ইতিহাসকে পুঁজি করার আশা করেছিল পাকিস্তান।

ইসলামাবাদ আশা করেছিল, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং অন্যান্য পাকিস্তানি জঙ্গি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে আফগানরা তাদের সহায়তা করবে।

তবে কাবুলে তালেবান শাসনের প্রথম ১২ মাসের মধ্যে সেই আশাগুলো ভেস্তে যায়। পরিবর্তে, তালেবানরা ক্ষমতায় ফিরে আসায় পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের ঊর্ধ্বগতি অনুভব করে। এই সময়ে টিটিপি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

ইসলামাবাদ-ভিত্তিক সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের একটি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে জঙ্গি হামলায় প্রাণহানির সংখ্যা বিস্ময়করভাবে ৫৬% বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে ৫০০ নিরাপত্তা কর্মীসহ ১,৫০০ জনেরও বেশি মৃত্যু হয়েছে।

এই সপ্তাহে, খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের দুটি জেলায় দুটি পৃথক হামলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন। 

পাকিস্তান কেন তালেবানদের মদদ দিয়েছে?

তালেবানের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক দীর্ঘকালের। এই সময়ে কখনও জটিলতা, পরস্পরবিরোধীসহ নানা রুপ নিয়েছে এই সম্পর্ক।

দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। তবে ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশদের দ্বারা টানা ২,৬৪০ কিলোমিটার সীমানা ডুরান্ড লাইনকে কেন্দ্র করে তাদের বিরোধ রয়েছে।

রেখাটি পশতুন উপজাতীয় ভূমিকে বিভক্ত করেছে। যা ‘‘পশতুনিস্তান’’ ধারণাকে উস্কে দেয়। এই ধারণা অনুযায়ী, সীমান্তের উভয় পাশে পশতুন এলাকাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি করা হয়। যদিও রাষ্ট্রের ধারণা কখনই বড় আকারে আলোচনায় আসেনি, সেই বিরোধ আজও জ্বলছে।

অন্যদিকে, ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আক্রমণের সময় থেকেই সীমান্তের ওপারে মুসলিম চরমপন্থীদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে ইসলামাবাদ।

ইসলামাবাদে অবস্থানরত আফগান ইতিহাস গবেষক উবায়দুল্লাহ খিলজি বলেছেন, “সোভিয়েত প্রভাবের ভয়ে, সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বিদ্রোহী গোষ্ঠী আফগান মুজাহিদিনদের জন্য পশ্চিমা সহায়তার একটি প্রধান মধ্যস্ততাকারী হয়ে ওঠে পাকিস্তান।’’

সোভিয়েত প্রত্যাহারের পর, আফগানিস্তান একটি গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকেই নতুন ইসলামপন্থী দল তালেবান গড়ে ওঠে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ১৯৯৬ সালে তালেবান শাসনকে স্বীকৃতি দেয় পাকিস্তান। তারা আফগান সরকারকে সামরিক সহায়তাও দেয়।

৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আফগানিস্তান দখল করার পরে ২০০১ সালের শেষের দিকে তালেবানের প্রথম সরকারের পতন ঘটে।

ওই সময় গোষ্ঠীর কিছু সদস্য পাকিস্তানের অভ্যন্তরে, বিশেষ করে সীমান্ত অঞ্চলে আশ্রয় পেয়েছিল। সে সময় ধারণা করা হচ্ছিল, ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে কাজ করলেও পাকিস্তানের ডিপ স্টেট তালেবানদের গোপন সমর্থন দিয়েছিল।

কাবুলের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন তালেবান কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আফগানিস্তানে বিদ্রোহের জন্য পাকিস্তানকে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসাবে ব্যবহার করেছিল তালেবান। তখন পাকিস্তান আমাদেরকে আফগানিস্তানে ভারতীয় প্রভাব মোকাবেলার একটি উপায় হিসাবে দেখেছিল।’’

তার মতে, “এটি পারস্পরিক সুবিধার সম্পর্ক ছিল।’’

কাবুলে নতুন যুগ

তালেবানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনর পর নাটকীয়ভাবে তাদের গতিশীলতাকে পরিবর্তন করেছে। পাকিস্তানের ওপর তারা আর নির্ভরশীল নয়,।

মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট কুইন্সির মধ্যপ্রাচ্য প্রোগ্রামের ডেপুটি ডিরেক্টর অ্যাডাম ওয়েইনস্টেইন বলেন, “তারা এখন তাদের স্বাধীনতা দাবি করছে ও নিজেদেরকে পাকিস্তানের অধীনস্থ বা তার দাবি মেনে চলতে অস্বীকার করছে।’’

পাকিস্তানের অতীত সহায়তার কথা স্মরণ করালেও তালেবান নেতারা দাবি করেছেন, হয়রানি, আটক ও তালেবান নেতাদের যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করে ইসলামাবাদের দ্বৈত আচরণ করছে।

নতুন মিত্র চায় তালেবান

পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক শীতল হওয়ায় তালেবান প্রশাসন নতুন অংশীদারিত্ব তৈরি করছে।

পশ্চিমা শক্তিগুলো দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও, চীন, রাশিয়া, ইরান, ভারত ও মধ্য এশিয়ার কিছু রাষ্ট্র সতর্কতার সঙ্গে তালেবান শাসনের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুলেহরিয়া বলেন, “তালেবান প্রশাসন বিদেশী বিনিয়োগ থেকে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব তৈরি করছে, বিশেষ করে চীন তার প্রচুর খনিজ সম্পদ আহরণে ভূমিকা রাখছে।’’

তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য ইরানের দিকে ঝুঁকছে তারা। যা অংশীদারিত্বের বৈচিত্র্যের ইঙ্গিত দেয়।’’

   

About

Popular Links

x