Saturday, May 18, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

কেন বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের গুরুত্ব দেয় না আইপিএল?

আমাদের খেলোয়াড়দের দায়িত্ব কথায় নয় খেলা দেখিয়ে অবস্থান তৈরি করে নেওয়া

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২২, ১০:৪৪ এএম

ক্রিকেটকে দক্ষিণ এশিয়ায় পরিচিত করার পাশাপাশি জনপ্রিয় করে তোলার জন্য ব্রিটিশরা ধন্যবাদ পেতেই পারেন। ক্রিকেট নিয়ে এ অঞ্চলে সমর্থক এবং মিডিয়ার মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব সর্বক্ষণ লেগেই থাকে। দক্ষিণ এশিয়ার দলগুলো পরস্পরের মুখোমুখি গলেই ভক্ত, মিডিয়া এবং ক্রিকেটারদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়।

নব্বইয়ের দশকে বা ২০০০ এর দশকের শুরুর দিকে পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। ২০০৭ সালে আইসিসি বিশ্বকাপ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট থেকে বাংলাদেশের কাছে হেরে ভারতের বিদায়ের পর প্রেক্ষাপট আমূল বদলে যায়। টাইগাররা টেস্ট খেলুড়ে বড় দলগুলোর সঙ্গে ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক সিরিজে ঘরের মাঠে সীমিত ওভারের ম্যাচে বেশ কিছু সাফল্য পায়। ফলে প্রতিযোগিতায় এক ধরনের ভারসাম্য আসে।

ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং ব্যয়বহুল আসর ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) যখন আসে তখন বাংলাদেশি ভক্ত এবং মিডিয়ার দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হয়। কেন বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের কোনো আইপিএল দল নিচ্ছে না, এই প্রশ্নটি শুরু থেকেই রয়ে গেছে। আমি বরং এই প্রশ্নটিকে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে করতে চাই, সেটি হলো- মুখের কথায় নয় বরং পারফরমেন্স দিয়ে অবস্থান তৈরি করে নেওয়া কি আমাদের খেলোয়াড়দের দায়িত্ব নয়?

 আইপিলে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের চেয়ে আইসিসি’র সহযোগী দেশ নেপাল, নেদারল্যান্ডস, এবং টেস্ট আঙিনার নবীন সদস্য আফগানিস্তানের বেশিসংখ্যক ক্রিকেটার খেলে থাকে। ২০২২ সালের আইপিএলের নিলাম শুরুর আগেই আফগানিস্তানের লেগস্পিনার রশিদ খানকে ১৫ কোটি রুপিতে দলে ভিড়িয়েছে ফ্রাঞ্চাইজি। তিনি তার ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে আসরের সবকটি ম্যাচেই মাঠে নামেন।

সাকিব তার পারফরম্যান্সের জন্য একটি নিলামে একটি যুক্তিসঙ্গত ভিত্তিমূল্য পেয়েছিলেন। যদিও আমাদের দেশের সমর্থক, মিডিয়া এবং সাবেক ক্রিকেটাররা আইপিএলে সাকিবের পজিশন নিয়ে এখনও তর্কে জড়ান। কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর) হয়ে খেলার জন্য জায়গা পেতে তাকে বেশিরভাগ সময়েই সুনীল নারিনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়। অতীতে এমনও হয়েছে যে, আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিরা আমাদের খেলোয়াড়দের কেনার পর তাদেরকে ১১ নম্বরে মাঠে নামিয়েছে।

তবে আমাদের খেলোয়াড়রাও আস্থার প্রতিদান দিতে পারেনি। ২০০৯ সালে কেকেআর ৫০ হাজার ডলারের ভিত্তিমূল্য থেকে ৬ লাখ ডলারে মাশরাফিকে কিনেছিল। তিনি ম্যাচ খেলারও সুযোগ পেয়েছিলেন। ম্যাচের শেষ ওভারে ডেকান চার্জার্সের যখন ২১ রান প্রয়োজন তখন মাশরাফির হাতে বল তুলে দেন অধিনায়ক ব্রেন্ডন ম্যাককালাম।

কিন্তু ২১ বছর বয়সী রোহিত শর্মা বাংলাদেশি গতি তারকার বলে সে রান তুলে নেন। এরপর কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি মাশরাফিকে দলে নেয়নি। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স কিনে নেওয়ার পর মোহাম্মদ আশরাফুলেরও একই পরিণতি হয়েছে। আমি আইপিএলে অনেক ম্যাচ দেখেছি যেখানে আমাদের খেলোয়াড়রা শেষ পর্যন্ত হতাশ করেছে।

টি-টোয়েন্টি লিগ ব্যবসা-ভিত্তিক। ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের অধিকার রয়েছে তাদের সুবিধামতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার। পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা না থাকায় ২০২১ সালের আইপিএলের মাঝপথে অধিনায়কত্ব হারানোর পাশাপাশি একাদশ থেকে বাদ পড়েছিলেন ডেভিড ওয়ার্নার। যাই হোক, ওয়ার্নার গত বছর আইসিসি ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টিতে অবিশ্বাস্যভাবে ফিরেছেন। তাই, আসন্ন নিলামে তিনি সর্বোচ্চ দর পেলে অবাক হবো না।

ম্যাথু ওয়েডের ক্ষেত্রেও তাই। এই অজি উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যানের সঙ্গে মুশফিকুর রহিমের তুলনা করা যাক। এমনকি উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান হিসেবে মুশফিক কতটা নির্ভরযোগ্য? তিনি একজন দুর্দান্ত ব্যাটসম্যান, তবে তিনি প্রায়ই তার কিপিং বড় ম্যাচে আমাদের হতাশ করে। আইপিএল সাধারণত সম্পূর্ণ প্যাকেজ খোঁজে। প্রকৃতপক্ষে, অজি, কিউই বা প্রোটিয়া খেলোয়াড়রা কথায় নয় পারফরম্যান্সে নিজেদের প্রমাণ করেন। আমাদের খেলোয়াড়দের দায়িত্ব হলো পারফরম্যান্স দিয়ে নিজেদের প্রমাণ করা। গণমাধ্যম কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আবেগপ্রবণ, অপরিপক্ক এবং অপেশাদার কথা বলে এবং মাঠে খারাপ পারফরম্যান্স খেলোয়াড়সুলভ আচরণের মধ্যে পড়ে না।

জাতীয় দলে কিংবা ঘরোয়া টুর্নামেন্টে বাংলাদেশি খেলোয়াড়রা নিয়মতি খেলার সুযোগ পায়। কিন্তু আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, আমরা আর আফগানিস্তান বা আয়ারল্যান্ডের মতো উদীয়মান ক্রিকেট খেলুড়ে দেশ নই। ইতোমধ্যে ২২ বছর হয়ে গেছে আমাদের টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তির। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বৃদ্ধি এবং পরিপক্কতায় আমরা এখনও পিছিয়ে।

আমাদের খেলোয়াড়দের অপরিপক্কতা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা উদ্বেগজনকভাবে রয়ে গেছে। এতদিন ধরে খেলার পরও আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মাঠে তাদের প্রবল ইচ্ছাশক্তি, পেশাদারিত্ব এবং নিজেকে উৎসর্গ করে দেওয়ার মানসিকতা দেখতে পাই না। তাদের কার্যকলাপ এবং মাঠের পারফরম্যান্স বাস্তবে তাদের পক্ষে কথা বলে না। আমি এটা ভেবেও আশ্চর্য হই যে, কেন আমাদের খেলোয়াড়রাও অস্ট্রেলিয়ান বিগ ব্যাশে খেলার সুযোগ পান না!

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) কোনো ধারাবাহিকতা নেই। এটি দৃশ্যত একটি সুপরিকল্পিত এবং সংগঠিত টুর্নামেন্ট নয়। এতে রয়েছে ব্যাপক আর্থিক ত্রুটি, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং অপেশাদারিত্ব। এগুলো প্রতিকারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও কমই দেখা যায়।

যদিও বাংলাদেশিদের কাছেও এটি তেমন জনপ্রিয় কোনো বিষয় নয় বলে মনে হয়। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সবসময়ই দাবি করে যে আইপিএলের পর বিপিএল দ্বিতীয় জনপ্রিয় এবং সফল টি-টোয়েন্টি লিগ, যদিও বাস্তবতা তাদের কথার সঙ্গে মেলে না। তাই, আমাদের খেলোয়াড়দের উচিত হবে মিডিয়াতে কথার ফুলঝুড়ির পরিবর্তে মাঠের পারফরম্যান্সে বেশি মনোযোগ দেওয়া।


মো. তালেবুর ইসলাম রূপম একজন কমিউনিকেশন প্রফেশনাল এবং গবেষক। তিনি ইন্দোনেশিয়ার গাদজাহ মাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ফেলো। ই-মেইল [email protected]


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।


About

Popular Links