Tuesday, May 28, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বিশ্বকাপের অন্যপিঠে

জুয়ায় বিনিয়োগ থেকে কোটি কোটি টাকা পাচার হয়ে চলে যাচ্ছে বিদেশে। জানা যায়, এতদিন বিদেশি আয়োজনে এসব জুয়ার সাইট চললেও এখন দেশীয় অনেক প্রতিষ্ঠান এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০৫:৪১ পিএম

“কাপ লন দ্যাড়শ!

কাপ লন দ্যাড়শ!!”

ভীষণ জোশে ডেকে ডেকে হকারি। কিন্তু কাপ কোথায়? ভ্যানে তো বিক্রি হচ্ছে জার্সি। ২ ডিসেম্বর শুক্রবার দিবাগত রাত ১টায় ছিল ব্রাজিলের খেলা। সে ম্যাচে হেরেছে সেলেসাওরা। তবে দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত ছিল বিপুল ফ্যানবেইজের দলটির। ম্যাচের আগে সন্ধ্যায় মিরপুর-২ এ দেখি এ দৃশ্য।

শুধু হলদে ব্রাজিল না। জার্সি বিক্রি হচ্ছিল আর্জেন্টিনা, ফ্রান্সেরও। আবার দেখি ‘‘কাস্টমাইজ'' জার্সিও। মানে ব্রাজিলের জার্সিই। কিন্তু পেছনে লেখা “Shakib 75”!

কী বিপণন প্রতিভাই না ফুটপাতে! বাদ থাকলেন না বঙ্গদেশের সেরা ব্র্যান্ড সাকিব আল হাসান। বিশ্বকাপ ফুটবল, ব্রাজিলের সঙ্গে জুড়ে একাকার তিনিও।

খেলা নিয়ে এমন উন্মাদনা এক ধরনের “পরজীবীতা” কি? কারণ আমরা তো দেশের  মোহামেডান-আবাহনীর খোঁজ রাখি না। সাফল্য দেখানো মেয়েদের ফুটবলে বেতন বৈষম্য নিয়ে সোচ্চার হই না। রাত জাগি ইউরোপীয় লিগ দেখার জন্য। ক্রিকেটের বেলায় ভারত-পাকিস্তান আমাদের জন্য হাইভোল্টেজ ম্যাচ। খেলা আর খেলা থাকে না এমন বাস্তবতায়। দিনযাপনের মুদ্রায় পর্যন্ত টান পড়ে এই খেলার জন্য। বিদেশে টাকা পাচার পর্যন্ত চলছে এমন দিশেহারা পরিস্থিতিতে।

৩ ডিসেম্বর (শনিবার) দৈনিক দেশ রূপান্তর – এর একটি বার্তা উদ্ধৃত করা প্রাসঙ্গিক। এটি ফেনী জনপদের খবর।

“বিশ্বকাপ ঘিরে জুয়ায় ধোঁকা নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ

সন্ধ্যার পর একটু নিরিবিলি স্থান খুঁজে নিয়ে কয়েক তরুণ গোল হয়ে বসে যান। তারপর নিজেদের মোবাইল ফোনে শুরু করেন অনলাইনে জুয়া খেলা। ফুটবল বিশ্বকাপের শুরু থেকে ফেনীতে এখন প্রতিদিনকার চিত্র এটি।

তাসসহ বিভিন্ন খেলার মাধ্যমে এবং অনেকে আবার অ্যাপসের মাধ্যমে খেলা নিয়ে ধরছেন বাজি। যদি তার দল জিতে যায়, তবে তিনি পাবেন তিনগুণ টাকা। মোবাইলে নিজের নিবন্ধনকৃত অ্যাপসে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা হলে তা বিকাশ বা নগদে উত্তোলন করা যায়। শুরুতে কিছু টাকা জিতিয়ে দিয়ে আসক্ত করা হয় তাদের। টাকার অঙ্ক বাড়লে অ্যাপস আর কাজ করে না। এভাবেই নিঃস্ব হচ্ছে ফেনীর স্কুল-কলেজ পড়ুয়া তরুণ-তরুণীরা।

বর্তমানে জেলার তরুণ-তরুণীরা আকৃষ্ট হচ্ছে জুয়ার এসব সাইটে। পাঁচ-দশ হাজার টাকা বিনিয়োগে শুরু করে লোভে পড়ে একপর্যায়ে খোয়াচ্ছে লাখ লাখ টাকা। জুয়ার এসব সাইটের অধিকাংশ পরিচালনা করা হচ্ছে ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে। বিদেশ থেকে পরিচালিত এসব সাইট পরিচালনা করছে বাংলাদেশের এজেন্টরা। 

জুয়ায় বিনিয়োগ থেকে কোটি কোটি টাকা পাচার হয়ে চলে যাচ্ছে বিদেশে। জানা যায়, এতদিন বিদেশি আয়োজনে এসব জুয়ার সাইট চললেও এখন দেশীয় অনেক প্রতিষ্ঠান এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষও বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা এসব জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। খোয়াচ্ছে বিপুল পরিমাণ টাকা। অনেকে ধার-দেনায় জর্জরিত হয়ে পড়ছেন।

আবদুল্লাহ মামুন নামে একজন জানান, একটি অ্যাপ মোবাইলে ডাউনলোড করে রেজিস্ট্রেশন করার পর ৫ হাজার টাকা একটি বিকাশ নাম্বারে পাঠিয়ে ব্যালেন্স নিতে হয়। আর সে ব্যালেন্স দিয়ে বিভিন্ন খেলায় বাজি ধরা হয়। জিতলে বাজির টাকার তিনগুণ পাওয়া যায়। এভাবে এক মাস যাওয়ার পর হঠাৎ একদিন ওই অ্যাপস আর কাজ করে না। প্রথমে কিছু টাকা বিকাশে পাওয়া গেলেও পরে টাকার অঙ্ক বেশি হলে তা বন্ধ হয়ে যায়।

এ ব্যাপারে ফেনীর পুলিশ সুপার জাকির হাসান বলেন, “মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে খেলা বা জুয়াগুলোর বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। তবে এ ব্যাপারে আমরা কোনো অভিযোগ পাইনি।”

ব্লুমবার্গের হিসেবে, কোভিড মহামারির কারণে বিশ্বের অর্থনৈতিক সংকটে রাজস্ব বৃদ্ধির নানা তরিকা খুঁজেছে সরকারগুলো। এর অংশ হিসেবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল থেকে শুরু করে থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের সরকার জুয়ার নীতিমালা শিথিল করছে। লকডডাউন শুরুর পর অলস অর্থ লাফিয়ে বাড়ছে জুয়া খাতে।

এজন্যই ফুটবল বিশ্বকাপকে এক সুবর্ণ সুযোগ মনে করছে ড্রাফটকিংসের মতো বেটিং কোম্পানি। এবারের বিশ্বকাপের আসর এবং মার্কিন বাজারের নতুন বৈধতা মিলে ২০২৫ সাল নাগাদ ক্রীড়া-ভিত্তিক জুয়ার লেনদেন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলারের হতে পারে বলে আশঙ্কা আছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে যাচ্ছে মাঠের খেলায়। ক্রীড়ায় এই দুর্নীতি বিস্তার ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছবে। 

ডিজিটাল অর্থ লেনদেন, হ্যাকিং ঝুঁকি, গ্রাহকের তথ্যফাঁস এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এতে যে বাড়বে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

আমরা ফুটবল ভক্তরা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে ব্যস্ত। খেলা হয়তো চলছে মাঠের বাইরে পর্দার আড়ালে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বিপুল পরাশক্তির এ অনৈতিকতা উন্মোচন করবে কে? মাঠের খেলা কোন চোরাবালিতে হারাল কে জানে?


লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

About

Popular Links