Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বাঁশখালীর শ্রমিকের রক্তে ভেজা দিন

মাত্র এক বছরেই আমরা হয়তো ভুলে গেছি। কিন্তু বেশ তোলপাড় হয়েছিল গত বছরের ১৭ এপ্রিল। তখনও পবিত্র রমজান মাস। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার গণ্ডামারা ইউনিয়নে এদিন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণ করে পুলিশ

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২২, ০৬:০৩ পিএম

“...ও রাঙা পথ, ও ভাঙা পথ দেশছাড়া

 মনে রাখিস, তোরা এসব মনে রাখিস

 পথে এখন নতুন বিষ। ছোট্ট থেকে বড় হওয়ার

 নতুন বিষ, পুরোনো বিষ

 মনে রাখিস।

...”

: কে জন্মায়, জয় গোস্বামী

অনেকেরই মনে পড়েনি। মাত্র এক বছরেই আমরা হয়তো ভুলে গেছি। কিন্তু বেশ তোলপাড় হয়েছিল গত বছরের ১৭ এপ্রিল। তখনও পবিত্র রমজান মাস। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার গণ্ডামারা ইউনিয়নে এদিন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। পাঁচজন ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। পরের দিন আহত ১৩ জন শ্রমিকের মধ্যে দু’জন শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেন। সব মিলিয়ে মাত্র দু’দিনেই মৃত শ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়ায় সাতে। যদিও বাঁশখালীতে চীনা বিনিয়োগে এস আলম গ্রুপের এই বহুল বিতর্কিত কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হত্যাযজ্ঞ নতুন নয়। এর আগেও ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল বাংলাদেশ-চীন যৌথ কনসোর্টিয়াম কর্তৃক এলাকার আবাদি, কৃষি জমি, বসতবাটি ও কবরের জমি অধিগ্রহণের সময় স্থানীয় মানুষের সাথে সংঘর্ষ হয়। তখনও প্রতিবাদী নিরস্ত্র জনতার ওপর পুলিশ গুলি চালায়। ৪ জন নিহত হয়েছিলেন সেবার।

(সূত্র : দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)

গত বছরের ১৮ এপ্রিল বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম-এ প্রকাশিত ‘‘এক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে ঝরল ১০ প্রাণ’’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা যায়,

“...জমি ঘিরে অসন্তোষের শুরু

সমুদ্র তীরের গণ্ডামারার জমিতে বছরের অধিকাংশ সময় লবণের চাষ হয়। বর্ষায় চিংড়ি এবং বছরে একবার শুধু হয় ধান চাষ। প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার এই বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য সাত হাজার তিনশ একর আয়তনের গণ্ডামারা ইউনিয়নের ছয়’শ একর জমিই কিনেছে এস আলম গ্রুপ, যা পুরো ইউনিয়নের ১২ ভাগের এক ভাগ।

২০১৬ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি তৈরির কাজ দেওয়া হয়েছিল এনএসএন কনসোর্টিয়াম নামের এক প্রতিষ্ঠানকে।”

২০১৬ সালের ১০ এপ্রিল দৈনিক প্রথম আলো’তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়,

“ . . .

পরিবেশ বিধিমালা ১৯৯৫ অনুযায়ী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো লাল তালিকাভুক্ত প্রকল্পে যেকোনো ভৌত অবকাঠামোগত কাজ শুরু করার আগে সাইট ক্লিয়ারেন্স এবং পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) করে তার অনুমোদন নেয়া বাধ্যতামূলক। আর বিদ্যুৎকেন্দ্রে যন্ত্র স্থাপনসহ অন্যান্য কাজ করার আগে পেতে হয় পরিবেশ ছাড়পত্র। বাঁশখালীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের জন্য ওই তিন অনুমোদনের কোনোটাই এখনো পায়নি এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ার লিমিটেড।”

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এস আলম গ্রুপ তাদের বিজ্ঞাপনে প্রচার করে,

“সারা বিশ্বে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৭০%-ই হলো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে। চীনে ৯০ আর ভারতে ৭০% বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় কয়লা থেকে। আমেরিকা, জার্মানি ও জাপানের মতো উন্নত দেশেও এই ধরনের প্রকল্প চালু রয়েছে।”

যদিও এ বিশেষজ্ঞদের মতে তা সত্য নয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘‘গার্ডিয়ান’’ এর এক প্রতিবেদনে জানা যায়, “বর্তমানে সারা বিশ্বের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৩৯%, চীনের ৬৩% এবং ভারতের ৬২.১% কয়লা থেকে উৎপাদিত হয়। কিন্তু এখন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূষণের ভয়াবহতা দিনে দিনে উন্মোচিত হওয়ার কারণে বর্তমানে ওইসব দেশের অনেকগুলোই কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরে আসছে। চীনে প্রতি বছর ২ থেকে ৪% হারে কয়লা বিদ্যুতের ব্যবহার কমছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ২০% হারে বাড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৫ সাল এই এক বছরে কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে ১৪.৩%। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ সাল নাগাদ ৪৬ হাজার মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিচ্ছে।”

২০২১ সালের ১৭ এপ্রিল ডয়চে ভেলেতে প্রকাশিত ‘‘পুলিশের গুলিতে শ্রমিক নিহত: কী ঘটেছে বাঁশখালীতে?’’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা যায়, “চীনের সাথে যৌথ উদ্যোগে দেশের বৃহৎ শিল্প গ্রুপ এস আলম-এর কয়লাভিত্তিক এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্থাপনের প্রাথমিক কাজ শুরু হয় প্রায় আট বছর আগে। ২০১৬ সালের এপ্রিলে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের রিরোধিতা করে স্থানীয়রা আন্দোলন করেন। তখন গুলিতে চারজন নিহত হন। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে স্থানীয়রা শুরু থেকেই পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করে এর বিরোধিতা করে আসছেন। এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। ২০২২ সাল নাগাদ কেন্দ্রটি উৎপাদনে যাওয়ার কথা। এই প্রকল্পে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানে ৩০ ভাগ বিনিয়োগ রয়েছে বলে জানা গেছে। বাঁশখালীর প্রত্যন্ত এলাকায় সমুদ্রের তীরে এর অবস্থান। ফলে সাংবাদিকরা বা প্রশাসন ওখানকার খোঁজ-খবর তেমন পান না। পুলিশ ফাঁড়ি ছাড়াও কেন্দ্রটিতে নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে। প্রায় তিন হাজার শ্রমিক সেখানে কাজ করেন। ব্যবস্থাপনায় চীনা নাগরিকরাও আছেন।...”

এ বছরের জুন থেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি উৎপাদনে যাওয়ার কথা। যে বিদ্যুতে হয়তো আলো জ্বলবে। কিন্তু বাতির নিচে অন্ধকার ঢাকার সাধ্য হবে না এর কোনো দিন। গোটা প্রকল্পে অস্বচ্ছতা, শ্রমিক খুনের বিচারহীনতা, ক্ষতিপূরণের নামে তামাশা আর বিষময় পরিবেশ দূষণ নিয়ে উদ্বেগ বাঁশখালীর এই উন্নয়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে বারবারই।

শ্রমিকের রক্তে ভেজা দিন ১৭ এপ্রিলে জয় গোস্বামী সূচিত এই লেখনী তার পঙতিতেই শেষ হোক।

“ . ..

অস্ত্র প্রয়োগের অধিকারী

তুমি আর তোমার ক্যাডার

আমরা শুধু খুন হতে পারি

মুখ বুজে খুন হতে পারি

এই একমাত্র অধিকার।”


লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

   

About

Popular Links

x