Saturday, June 15, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

আত্মহত্যা এবং আমাদের সামাজিক বয়ান

জাতীয় এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে কোথাও গুরুত্বের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যকে বিবেচনা করা হয়নি। বরং বজায় থেকেছে আমাদের চিরাচরিত ভিক্টিম ব্লেমিংয়ের অপচর্চা

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২৩, ১২:০৯ এএম

খুব ছোটবেলায় গ্রামে কেউ আত্মহত্যা করলে পরিচিত বা স্বজনদের মধ্যে আঞ্চলিক ভাষায় আলোচনা শুনতাম, “বিষতেল খায়েছে, এন্ডিন খায়েছে, গলায় দড়ি দেছে।” তারপরের বক্তব্য হলো, “কি লাভ হলো? কারে শিক্ষা দিলি? নিজির জীবন নিজি হাতে নিলি।” আত্মহননকারী ব্যক্তি সন্তান রেখে গেলে আলোচনার পরিধি আরও বিস্তৃত হতো- “সন্তানডার মুখির দিকি একটু তাগালি নে? কার কাছে সোনার চানডা রাখে গেলি?”

খুব কম ক্ষেত্রেই আত্মহত্যাকারী ব্যক্তিকে  প্রতিবেশীদের, স্বজনদের, সমাজের সহানুভূতি পেতে দেখেছি। মানে আলোচনায় সেটার প্রতিফলন ছোটবেলাতে খুব একটা দেখিনি। আমার বেড়ে ওঠা সেই অজপাড়াগাঁ থেকে আমাদের রাজধানী শহরেও পরিচিতজনদের মধ্যে কিন্তু খুব বেশি ফারাক দেখি না। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তো এ বিষয়ে রীতিমত বাণী বর্ষিত হতে থাকে। 

গ্রাম কিংবা রাজধানীতে আমার পরিচিত মানুষ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা এমন আলোচনার ঝড় তোলেন, তারা হয়ত এক অর্থে নেতিবাচক। কিন্তু তাদের এই চিন্তাধারার দায় সম্পূর্ণরূপে তাদের দেওয়া যায় না। কারণ, পরিবার, সমাজ এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাদের মননকে এভাবেই গড়ে উঠতে সহায়তা করেছে। ঠিক এভাবেই ভাব প্রকাশ করতে শিখিয়েছে।

আসলে আমাদের জীবনযাত্রা এবং জীবন আচরণে সংবেদনশীল মানুষের সংখ্যা কম। এদেশের মানুষের কথিত ধর্মীয় অনুভূতি ছাড়া সব অনুভূতিই ভোঁতা হয়ে গেছে। চারপাশে এত অনিয়ম, অনাচার, নির্যাতন, দমন, পীড়ন নিয়ে আমাদের বক্তব্য নেই। হয়ত আছে, কিন্তু প্রকাশের সাহস নেই। আমরা জোরালো কোনো প্রতিবাদ জানাতে পারি না। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া মানুষ সম্পর্কে বলতে গিয়ে  রীতিমতো বিচারকের আসনে বসে যাই। রায় ঘোষণা করি, “তার ইহকাল তো গেলই, পরকালেও শান্তি নাই।”

আমি এমন মানুষকে চিনি, যিনি জীবদ্দশায় একাধিক মানুষকে আত্মহত্যার পথ থেকে বিরত থাকতে কাউন্সিলিং করেছেন। পরিবার, পরিজন ছেড়ে সংসার বিবাগী হতে চাওয়া মানুষকে নিজের বাড়িতে রেখে সাধ্যমতো বুঝিয়ে পরিবারের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন। পারিবারিক কলহের জেরে ভাঙতে যাওয়া সংসার জোড়া লাগিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সেই মানুষটিই নিজে আত্মহত্যা করেছিলেন।

আত্মহননকারী ব্যক্তির বাড়িতে উৎসুক জনতার ভিড়/ঢাকা ট্রিবিউন

যার কথা বলছি, তাকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমার মেলাতে কষ্ট হয়, হাইস্কুলের গণ্ডি না পেরোনো একজন কৃষক, নিজের কাজের ক্ষতি করে আত্মহত্যা করতে যাওয়া মানুষদের পরম মমতায় বুঝিয়ে নিরস্ত করেছেন, সংসার ধর্মকে বড় জ্ঞান করে অন্যের সংসার জোড়া লাগিয়েছেন সেই মানুষটিই শেষ পর্যন্ত সংসারের মায়া ত্যাগ করে নিজে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন। 

অনেক পরে এসে জেনেছি, ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল নয়। বরং বিশ্বব্যাপী সমাদৃত সৃজনশীল মানুষদের জীবনেও এরকম ঘটনা ঘটেছে। বিশ্বের আলোচিত পাঁচটি আত্মহত্যার একটি হলো বিশ্বসাহিত্যের তারকাতুল্য নাম আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, যার “দ্যা ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি” গ্রন্থের নাম শোনেননি, এমন শিক্ষিত মানুষের  দেখা মেলা ভার। এই লেখার মধ্যে তিনি লাখ লাখ পাঠককে জীবনের দিশা দেখিয়েছেন, দেখিয়েছেন ঝড়-ঝঞ্জাময় জীবনে কীভাবে আশার আলো বাঁচিয়ে রাখতে হয়, দেখিয়েছেন শেষ পর্যন্ত কীভাবে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে হয়। সবেচেয়ে বড় কথা হলো, কীভাবে জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে হয়। সেই হেমিংওয়ে জীবনযুদ্ধে পরাজয়কে মানতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিলেন। ভাবা যায়?

“দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি” উপন্যাসের একটি বিশেষ উক্তি হলো “আ ম্যান ইজন'ট মেড ফর ডিফিট…আ ম্যান ক্যান বি ডেস্ট্রয়েড বাট নট ডিফিটেড।”

তিনি হয়ত তার এই আত্মদর্শনকে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন আত্মহননের মধ্য দিয়ে। তিনি জীবনে বেঁচে থাকতে চেয়েছেন; বেচে নয়। এই বেঁচে থাকা এবং বেচে থাকার পার্থক্য আমরা বুঝি না। আসলে আমরা তো বেঁচে নেই, বেচে আছি। লোভের কাছে, মোহের কাছে, ক্ষমতার কাছে, ক্ষুদ্রতার কাছে, দৈন্যের কাছে বেচে আছি। 

তাই নিজেদের মহত্ব জানান দিতে বিষয় নয়, ঘটনা নয়, কারণ নয়, ব্যক্তিকে নিয়ে আলোচনা করি, তার পাপ-পুণ্যের বিচার করি এমনকি পৃথিবী  ছেড়ে যাওয়া ব্যক্তিও আমাদের সেই বিচার থেকে রেহাই পান না।

প্রতীকী ছবি/পেক্সেলস

কোথাও পড়েছিলাম, আত্মহত্যা হলো সাহায্যের জন্য প্রবল  চিৎকার। এখন আক্ষরিক অর্থে এই কথার বিচার করলে কিন্তু জবাব হবে আমার অজপাড়াগাঁর সেই সমালোচনাকারীদের মতো, “গিছিস তো চোলে, চিৎকার কখন পাড়লি বুঝদিই তো পারলাম না!” আসলে এই কথার অর্থ আমি যেভাবে বুঝি তা হলো, “সমাজকে বলে যাওয়া আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম, তোমরা আমাকে বাঁচতে দিলে না। তোমরা পাশে থাকলে আমাকে আজ এই পরিণতি বরণ করতে হতো না।”

কিন্তু গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেই চলেছে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এই গুরুতর বিষয়টিকে কতখানি আমলে নিয়েছে, তা বোঝা যায় আমাদের জেলা পর্যায়ের সদর হাসপাতালগুলোর দিকে তাকালে। এখন পর্যন্ত এসব হাসপাতালে কাউন্সিলিংয়ের জন্য কোনো পেশাদার কাউন্সেলর নেই, এমনকি পদও নেই। আমাদের যে শিক্ষকরা শিশু থেকে বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের পড়ান, তাদের কাউন্সেলিংয়ের ওপর এতদিন ন্যূনতম কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না। কোভিড এবং পরবর্তী সময়ে সরকারিভাবে অনলাইনে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জানি কিন্তু দেশের সিংহভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেই উদ্যোগ থেকে ফলপ্রসু কিছু অর্জন করতে পেরেছে কি-না, তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়ে গেছে। 

শিক্ষকদের একটা বড় অংশ তো এই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের  সুযোগই পাননি। এমনকি এসডিজি'র ১৬টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে তিন নম্বরে সুস্বাস্থ্য এবং কল্যাণের কথা বলা হয়েছে। এতে বিশ্বব্যাপী সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে যেসব রোগের প্রতিকার এবং প্রতিরোধের কথা বলা হলেও সেখানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ঠাঁই পায়নি। 

অর্থাৎ জাতীয় এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে কোথাও গুরুত্বের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যকে বিবেচনা করা হয়নি। বরং বজায় থেকেছে আমাদের চিরাচরিত ভিক্টিম ব্লেমিংয়ের অপচর্চা।  এক্ষেত্রে আমরা একধাপ এগিয়ে তার পরকালও নিয়েও রায় দিয়ে দিচ্ছি। একবারও কি আমরা ভেবে দেখেছি, আমাদের এই ঘোষণা আত্মহত্যাকারী ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের মনে কী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে? এখানেই সংবেদনশীলতার প্রশ্ন। 

আমার বিশ্বাস ও আচরণের প্রতিক্রিয়া অন্যদের ওপর কেমন হবে তা মাথায় রেখে আচরণ করাই একজন সংবেদনশীল মানুষের কাজ।

প্রতীকী ছবি

আমাদের সময়েও বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সিলিংয়ের জন্য কোনো বিশেষজ্ঞ কেউ ছিলেন না। এখন যতদূর জানি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই আছে। কিন্ত সেখানে ক'জন যান বা যেতে পারেন, সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এদেশে এখনও কথিত শিক্ষিত মানুষেরও ধারণা, কাউন্সেলিংয়ের জন্য যাওয়া মানে মানুষটির মাথায় গণ্ডগোল আছে। আমরা এখনো পাবনার মানুষকে নিয়ে হাসাহাসি করি। আমাদের মহান সাংসদেরা, মন্ত্রীরা একে অন্যকে পাবনায় পাঠাতে চান। 

শরীরের মতো মনেরও সুস্থতা, অসুস্থতা আছে, যার চিকিৎসা প্রয়োজন, সেই কথাটায় এই সমাজ এখনো গ্রহণ করতে শেখেনি। কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এগুলো নিয়ে কোনো আলাপই নেই! 

আমাদের ধর্মগুলোতে নাকি বলা আছে, “আত্মহত্যা মহাপাপ।” সমাজ কেবল এই বাণীটুকু ঘোষণা করেই ক্ষান্ত। কিন্তু কেন একটা মানুষ আত্মহত্যা করবে, আমরা কীভাবে তাকে বিরত রাখতে পারি, সমাজের ভূমিকা, প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে সবাই নিরব। 

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ করে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে কয়েক বছর পরপর নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। পাঠ্যক্রমেও পরিবর্তন আসে কিন্তু শিক্ষার্থী-বান্ধব শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষক সমাজ, শিক্ষাকর্মী গড়ে তোলার আলোচনা সেখানে বরাবরই অনুপস্থিত। 

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একটা বাংলা অনলাইন পোর্টালের সম্পাদকের সাথে কথা হচ্ছিল, সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে। তিনি নিজেও দেশটিতে ২২ বছর শিক্ষকতা করেছেন। তার ভাষ্যমতে, সেখানে শিক্ষাখাতে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয় যারা ০ থেকে ১৮ বছরের ছেলেমেয়দের পড়ান, সেই শিক্ষকদের। কারণ তাদের তো শুধু অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার জ্ঞান থাকলে হবে না। শারীরীক, মানসিক গঠন, সংবেদনশীলতা, দেশপ্রেম সবই শেখানোর দায়িত্ব এই পর্যায়ের শিক্ষকদের। অথচ আমাদের দেশে সবচেয়ে অবহেলিত জায়গা হলো এই পর্যায়ের শিক্ষাববস্থা। 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথা আমি একাধিকবার টেনে এনেছি, কারণ সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থী বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। এ নিয়ে আলোচনার চেয়ে আমাদের সামাজিক বয়ান অর্থাৎ সমালোচনাও বেড়েছে। আত্মহত্যার সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করে আমরা কোনোভাবেই সমালোচনা করার অধিকার রাখি না। 

সবার আগে প্রতিটি মানুষের বেঁচে থাকার মতো পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সংবেদনশীল সমাজ, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সম্পন্ন সহানুভূতিশীল মানুষ সেই পরিবেশের জন্য সবেচেয়ে জরুরি। সেই কাজ খুব সহজ নয়। কিন্তু শুরু করতে হবে এখনই।


মানবাধিকার কর্মী অপূর্ব দাসের জন্ম ও বেড়ে ওঠা যশোরে। লেখাপড়া করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। মানবাধিকার, নারী অধিকার, জেন্ডার এবং নারীর ভূমি অধিকার নিয়ে তিনি কাজ করেছেন একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনে। এছাড়াও যুক্ত আছেন লেখালেখি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।



About

Popular Links