পাকিস্তানের এই কঠিন দুর্দিনের জন্য শুধু অর্থনীতি দায়ী নয়। বরং এ সমস্যা মূলত রাজনৈতিক। পারমাণবিক অস্ত্রধর দেশটি কঠিন অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। বৈদেশিক রিজার্ভ দুঃখজনকভাবে কম এবং মুদ্রাস্ফীতি লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েই চলেছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। দেশজুড়ে মূল্যস্ফীতি সাধারণ পাকিস্তানিদের জীবন দুর্বিসহ করে তুলেছে। মার্চ মাসে দেশে মুদ্রাস্ফীতি রেকর্ড শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। অন্যদিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মুদ্রার দরপতন, আকাশছোঁয়া জ্বালানি খরচ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্রমাগত পতনের ফলে পাকিস্তানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া। অত্যাবশ্যকীয় পণ্যসামগ্রীও মানুষের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। খাবার সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে, পদপিষ্ট হয়েছে মৃত্যু হয়েছে অনেকের।
পাকিস্তান অর্থনৈতিক দুর্বলতার ঝুঁকিতে রয়েছে। ২২ কোটি জনসংখ্যার দেশে অর্থনৈতিক এই সংকট নতুন কিছু নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতো বহিরাগত ঋণদাতাদের সঙ্গে আলোচনাও দেশটিতে একটি রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইএমএফ কোনো দেশকে বেলআউট দিলে দেশটিকে কয়েকটি সাহসী পদক্ষেপ নিতে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্তরা এই সময়ে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয়ে থাকেন।
এদিকে, নির্বাচনের আগে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ক্ষমতাসীনদের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা এই মধ্যবিত্ত শ্রেণিই সব চেয়ে বড় ভোট ব্যাংক। তাদের চটালে সরকারের পতন অবশ্যাম্ভাবী। অতীতেও দেশটি এমন ঘটনার সাক্ষী হয়েছে।
পাকিস্তানের শাসকরা এর আগে অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। প্রকৃতপক্ষে, নেতাদের কেউ কেউ এমন পরিস্থিতি থেকে তাদের ভাগ্য গড়ে নিয়েছেন। ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পিটিআইও আইএমএফকে খুব একটা ভালোভাবে নেয়নি। কিন্তু ২০১৯ সালে তার শাসনামলে, পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের বেলআউট প্যাকেজ সই করেছিল। কিন্তু এর শুধুমাত্র একটি অংশ প্রদান করে আইএমএফ। কারণ পাকিস্তান আইএমএফের শর্ত পুরোপুরিভাবে মানেনি। আইএমএফ পাকিস্তানকে কম করের ভিত্তি সংস্কার, রপ্তানি শিল্পের জন্য কর অব্যাহতি শেষ করার পরামর্শ দিয়েছে।
বর্তমানের দেশটির অর্থমন্ত্রী ইসহাক দর আইএমএফের সঙ্গে চুক্তির ঘোর বিরোধী। তার পূর্বসূরি মিফতা ইসমাইল আইএমএফের সঙ্গে আলাপ চলাকালীন আকস্মিক পদত্যাগ করেন। দেশজুড়ে চলা রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা অর্থনীতির বেহাল দশার মূল কারণ।
যেকোনো সরকারের পক্ষেই পাকিস্তানের হাল ফেরানো বেশ ঝঞ্ঝাটের। দেশটির দেনার পরিমাণ বিপুল, অন্যদিকে রাজস্ব অনেক কম। পাকিস্তানের বিভিন্ন ধরনের ঋণ রয়েছে- যেমন বহুপাক্ষিক ঋণ, প্যারিস ক্লাব ঋণ, বাণিজ্যিক ঋণ এবং চীনা ঋণ। পাকিস্তানের মোট ১২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার চীনের কাছ থেকে নেওয়া। সময়ের ব্যবধানে পাকিস্তান বেশ কয়েকটি বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছে। দেশটি বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ থেকে প্রচুর পরিমাণে ঋণ নিয়েছে। এছাড়া ইসলামাবাদকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়েছে নানা সময়ে। নানা প্রয়োজনে ও নানা খাতে।
অতীতে সেন্টোতে থাকা পাকিস্তান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সাহায্যের বৃহত্তম প্রাপকদের একজন। কিন্তু সামরিক বাহিনী পরিচালিত এই দেশ তাদের জন্য সব ধরনের সাহায্যের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। একের পর এক উন্নত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম অর্জনের জন্য পাকিস্তানের অর্থ থাকলেও অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার জন্য কোনো সঠিক কৌশল নেই। অতীত থেকে কিছুই শিক্ষা নেয়নি দেশটি।
কোভিড মহামারির ঠিক পর পর, ২০২২ সালে দেশটিতে বিধ্বংসী প্লাবন আসে দুইবার। বন্যায় পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। এ কারণে বেড়ে যায় গম ও পেঁয়াজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম। এক প্রতিবেদনে ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, মাত্র এক বছরে গমের দাম ৭৪% বেড়েছে। বন্যা পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি দেশটি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। গ্রীষ্মকাল অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ নিতে চলেছে। ফ্যান এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালানোর জন্য এমন সময়ে আরও বেশি বিদ্যুৎ প্রয়োজন। অথচ দেশটি শীতকালেই তার বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পারেনি। বিদ্যুৎ এবং কাঁচামাল আমদানির অভাবে একের পর এক কলকারখানা বন্ধ।
পাকিস্তানের অর্থনীতি ঠিক করা এক দুর্বোধ্য পাটিগণিত সমাধানের প্রায়। ঋণ খেলাপি হলে, পাকিস্তানের সংকট স্পষ্টতই বিপর্যয়ে পরিণত হবে। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও, রাজনীতিবিদদের অনেকগুলো টেকসই সংস্কার আনতে হবে। আরেকটি নেতিবাচক বিষয় হলো- পাকিস্তানের ভাবমূর্তি সংকট। যা দেশটির কূটনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সৌদি থেকে ইসলামিক ভ্রাতৃত্ব- তারা একে একে পাকিস্তানের থেকে দূরে সরে গেছে।
শুধুমাত্র পারমাণবিক শক্তি সুখ্যাতি ধরে রাখে না, কিন্তু ঊর্ধ্বমুখী অর্থনীতি তা পারে।
অয়নাংশ মৈত্র, ভারতীয় সাংবাদিক ও কূটনীতি গবেষক
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।



