সম্প্রতি শেষ হয়েছে জাপানের হিরোশিমায় বিশ্বের সাত বৃহৎ অর্থনৈতিক দেশের জোট জি-৭ এর সম্মেলন। গত ১৯ থেকে ২১মে পর্যন্ত চলা এই সম্মেলনের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল ইউক্রেন সংকট, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার এবং পারমাণবিক আগ্রাসন বন্ধ করা।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও জাপানের জোটটি সম্মেলনে সবথেকে বড় চমক ছিল ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির নাটকীয় যোগদান। জেলেনস্কির যোগদান নিয়ে জল্পনা ছিল চরমে। সৌদি আরবে খানিক বিরতির পর ফরাসি সরকারি সংস্থার একটি বিমানে করে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি হিরোশিমায় আসেন। রাশিয়ার প্রতি এক কড়া বার্তা দিয়েছে জোটটি। রাশিয়ার ওপর চাপানো হয়েছে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা।
মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ক্ষমতায় থাকাকালে জি-৭ এ অস্ট্রেলিয়া, ভারত, রাশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে জি-৭ জোটের সম্প্রসারণের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখা যায়নি জোট সংশ্লিষ্টদের। গত বছর এপ্রিলের শেষে জার্মান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ড. টবিয়াস লিন্ডারের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের মুখোমুখি আলাপচারিতা হয়। সেই আলাপচারিতায় তিনি জানান, জি-৭ সম্প্রসারণের কোনো রকম সম্ভবনা তিনি দেখেন না।
জি-৭ জোটে ভারতকে কূটনৈতিক স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। যার পরোক্ষ প্রমাণও পাওয়া গেছে। ২০১৯ সালের জি-৭ সম্মেলনে ফ্রান্সের আমন্ত্রণে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নেয় ভারত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে জি-৭ সম্মেলন স্থগিত রাখা হয়। ২০২১ সালেও যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয় ভারত। গত বছর ২০২২ সালে জার্মানিতেও জোটের সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে ভারত।
এবারের সম্মেলনে নাটকীয়ভাবে যোগ দেয় ইউক্রেন। সেই সম্মেলনে ভারতের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতা চায় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। ভারত তার বন্ধুরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে না গেলেও যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জেলেনস্কি শান্তি প্রক্রিয়ায় ভারতের সহায়তা চাইলে কড়া ভাষায় যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানায় ভারত।
বৈশ্বিক রাজনীতিতে দক্ষিণ বিশ্ব ক্রমে শক্তিধর হয়ে উঠছে। দক্ষিণ বিশ্বের অর্থনীতি, মানবসম্পদসহ নানাবিধ কারণে এই শক্তি প্রকাশ পাচ্ছে। দক্ষিণ বিশ্বের দেশগুলো জি-৭ জোটে দমকা হাওয়া দিয়েছে বলেই আপাত মনে করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি ক্যামারুন থেকে কূক আইল্যান্ডও এবারের সম্মেলনে আমন্ত্রণ পেয়েছিল। তবে আমন্ত্রণ পেলেও দক্ষিণ বিশ্বের কাছে তাৎপর্যগত দিক থেকে জি-৭ জোট এক প্রকার অধরাই রয়ে গেছে।
জাপানের হিরোশিমাকে এবার জি-৭ সম্মেলনের স্থান হিসেবে নির্ধারণের পেছনেও রয়েছে আরেক তাৎপর্য। যখন দুনিয়াব্যাপী যুদ্ধ যুদ্ধ রব উঠেছে। যখন পারমাণবিক অস্ত্রের ঝংকারের ধ্বনি ওঠার সুর শোনা যাচ্ছে তখন হিরোশিমা জায়গা হিসেবে বিশ্ববাসীকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে। দ্বিতীয় বিশ।বযুদ্ধের সময় প্রথম পারমাণবিক বোম এই শহরেই নিক্ষেপ করা হয়েছিল। অন্যদিকে এই হিরোশিমাতে জন্মেছেন জাপানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার। পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণে হিরোশিমাই যে উপযুক্ত স্থান তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
তবে জি-৭ জোটে সবচেয়ে বড় হুমকি হলো চীন। হিরোশিমায় অনুষ্ঠিত জি-৭ এর সম্মেলনে বিশ্ব নেতারা চীনের অর্থনৈতিক জবরদস্তি নিয়েও সোচ্চার হওয়ার আলোচনা করেছেন। খনিজ পদার্থ , সেমিকন্ডাক্টর ইত্যাদির ব্যাপারে সাপ্লাই চেইন প্রস্তুতির জন্য চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছে জি-৭ ভুক্ত দেশগুলো। প্রায় আট দশক পর হিরোশিমা জি-৭ সম্মেলনের মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতার কথা যেন প্রত্যক্ষভাবে তুলে ধরলো। নানাকারণে মনে হচ্ছে জি-৭ সম্মেলনে দক্ষিণ বিশ্ব তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে।
অয়নাংশ মৈত্র, ভারতীয় সাংবাদিক, গবেষক
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।



