মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক মাইলফলক এই ২০২৩ সালের ২৩ আগস্ট। এ দিন বাংলাদেশ সময়, সন্ধ্যা ৬টা ৩৪ মিনিটে ভারতের চন্দ্রযান তিন এর বিক্রম ল্যান্ডার চাঁদে অবতরণ করে চল্লিশ দিন রাত্রির টান টান প্রতীক্ষার পর। ভারতের বাধা হারা উচ্ছ্বাস আছড়ে পড়ে দেশ জুড়ে প্লাবনের মতো। উচ্ছ্বাস ও উল্লাসে ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর চেয়ারম্যান শ্রীধর পানিকার সোমনাথ বলে ওঠেন, “চাঁদে ভারত।”
ঠিক তারপর থেকেই “ম্যান অব দ্য মোমেন্ট”- বাংলায় বললে “চোখের মণি” তিনি! অভিনন্দন জানাতে ও তার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে তার মতামত জানতে ওই মালয়ালী (কেরালা) বিজ্ঞানীকে একটা উষ্ণ হোয়াটসঅ্যাপ-বার্তা পাঠিয়ে দেন মর্ত লোকের এই সাংবাদিকও।
এর আগে, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে চাঁদের খুব কাছে পৌঁছালেও ভারতের চন্দ্র অভিযান ব্যর্থ হয়। চুরমার হয় রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষার। প্রধানমন্ত্রী মোদীর সামনে অঝোরে কান্নায় ভেঙে পড়েন ইসরোর তৎকালীন চেয়ারম্যান কে শিবন। তাকে বুকে ধরে আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। সব ব্যর্থতার দায় প্রচেষ্টার কাঁধেই চাপে। এবারে ইসরোর সফলতা সেই ব্যর্থতার স্রোত বেয়েই।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পর ভারত চতুর্থ দেশ যে চাঁদে নিয়ন্ত্রিত অবতরণ করলো। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো- ভারতই প্রথম দেশ যা চাঁদের দক্ষিণ গোলার্ধে প্রথম পা রাখল। এই অঞ্চলে অবতরণ কোনো দেশেরই কল্পনার বাইরে। কিছুদিন আগে রাশিয়ার লুনা-২৫ ভেঙে পড়ে। জাপান এই স্পেস রেসে সামিল হলেও শেষ অবধি কুলিয়ে উঠতে পারেনি। এমনকি বিফল হয়েছে প্রযুক্তির মেধা ইসরায়েলও। দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলন থেকে প্রধানমন্ত্রী মোদী দক্ষিণ বিশ্ব বা গ্লোবাল সাউথকে মহাকাশ অভিযানের জন্য অনুপ্রাণিত করেন। ভূ-বিশ্বে পশ্চিমা বহুত্ববাদের অবসান নিয়ে টালবাহানা চলাকালীন, মাধ্যাকর্ষণহীন মহাকাশের নীলে দেখা দিতে চলেছে নানা রঙের, নানা জাতীর পতাকার সমারোহ।
আরেক মহা বিস্ময়ের ব্যাপার হল, বড় সিনেমা তৈরি করার চেয়েও কম খরচে সম্পন্ন হয়েছে এই চন্দ্রযাত্রা। মাত্র ৬০০ কোটি রুপি বা ৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে ছিল এই চন্দ্রযান পাঠানোর খরচ, যেখানে রাশিয়ার ব্যর্থ প্রকল্পে ব্যয় হয় ১৬,০০০ কোটি রুপি। নভোনীলে নিজের মানচিত্র বানিয়ে নেওয়া ভারতের ইসরোর খ্যাতি, সম্মান ও আধিপত্য ক্রমাগত বাড়ছে। ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ব্রাজিলসহ ১৭৭টি বিদেশী উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে ইসরো। যা থেকে ভারতের আয় হয় প্রায় ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ভারতের এই চন্দ্রযাত্রা চাঁদের পৃষ্ঠে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের প্রাপ্যতা সম্পর্কে আমাদের জানাতে পারে। এই বৈজ্ঞানিক গবেষণা আমাদের জানাতে পারে যে চাঁদে প্রাণ ছিল কি-না। চাঁদে পৌঁছেই চন্দ্রযান-৩ এর প্রজ্ঞান রোভার চন্দ্র ভূখণ্ডে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে।
ইসরো জানিয়েছে, এই রোভারের মাধ্যমে সংগৃহীত ডেটা ল্যান্ডারে রিলে করা হবে ও পরবর্তীতে পৃথিবীতে ফেরত পাঠানো হবে। চন্দ্রযান-৩ ল্যান্ডার মডিউলটি ইলসা বা ইন্সত্রুমেন্ট ফর লুনার সেস্মিক অ্যাক্টিভিটি নামে পরিচিত। এর প্রাথমিক কাজ হল চন্দ্র কম্পন, ভূমিকম্পের কম্পন সনাক্ত করা ও বিশ্লেষণ করা। চন্দ্র পৃষ্ঠের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ, সেইসঙ্গে মাটি ও শিলাগুলোর বিশদ পরীক্ষা এই প্রজ্ঞানের দায়িত্ব।
গোটা মানব জাতির বিস্ময় বোধ যখন লোপ পাচ্ছে, ভারতের ইসরোর চন্দ্রযাত্রা ও দক্ষিণ গোলার্ধের অবতরণ গোটা দুনিয়ার কাছে এক দৃষ্টান্ত। দেখিয়ে দিয়েছে অসীম আলোকের অবচারণ অস্মিতার। সুদূর প্রসারী চিন্তা ও দর্শনের বাস্তবিক প্রয়োগ। সর্বোপরি ভারতের দূরন্ত বিজ্ঞানের দূরদর্শিতার। এই বিজ্ঞানের ভারত বড় প্রত্যয়ী। কাজাকস্তান, মঙ্গোলিয়া, উজবেকিস্তান, মরিশাস, রুয়ান্ডা, সুদান সবার আছে মহাকাশের অসীমকে মেপে নেওয়ার প্রত্যাশা। জী-২০ এর সভাপতিত্ব করার সময় ভারতের সাফল্য দক্ষিণ বিশ্বের দেশগুলোর কাছে প্রেরণার।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঠাণ্ডা যুদ্ধ চলার সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত রাষ্ট্রের মধ্যে যে স্পেস রেস চলতে থাকে তা আর দুই দেশের মধ্যে নেই। বঙ্গবন্ধু উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে বাংলাদেশও শামিল হয়েছে উপগ্রহ উৎক্ষেপণ লীলায়। প্রাথমিকভাবে, মহাকাশ মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত রাষ্ট্র এই দুই দেশের হাতেই কুক্ষিগত ছিল। অন্যান্য দেশের বিচরণ সেখানে ছিল কল্পনার অতীত।
মহাকাশ আর দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আটকে নেই। ভারতের মঙ্গল থেকে চন্দ্রযান অভিযান দেখিয়ে দিল মহাকাশ অভিযানের স্পর্ধা উন্নয়নশীল দেশগুলোও দেখাতে পারে। বিত্তের ও রাজনৈতিক বাহুবল মহাকাশে দাপট দেখাতে পারে না। মহাকাশ বহুত্ববাদের, প্রভুত্ববাদ সেখানে খাটে না, কালের অমোঘ ব্যাকরণ মেনেই। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর উপগ্রহ একের পর এক উৎক্ষেপণ করে ভারত দক্ষিণ বিশ্বের দেশগুলোকে দেখিয়েছে মহাকাশের দিশা। ভারতের চন্দ্রযান অসীম জিজ্ঞাসার নীলে স্বস্তির এক শাশ্বত উত্তর নয় কি?
এই লেখা লেখকের ব্যক্তিগত মন্তব্য। এর জন্য কোনোভাবে ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না
অয়নাংশ মৈত্র : ভারতীয় সাংবাদিক ও কূটনীতি গবেষক



