বর্তমান এবং অদূর ভবিষ্যতে দেশকে যেসব প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে তার জন্য দরকার দেশের গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন। বিগত প্রায় দেড় দশক ধরে দেশের প্রযুক্তিগত উন্নতি বলতে কেবল তথ্যপ্রযুক্তিকেই বোঝানো হয়েছে, ডিজিটালাইজেশনের নামে দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা তছরূপ করা হয়েছে; দুর্নীতিও হয়েছে বেশুমার। তার আগে যদি ফিরে যাই, এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের পুরো ইতিহাস পর্যালোচনা করি, তবে দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিখাতকে কখনোই আমরা অগ্রাধিকার তালিকায় পাই না।
দেশের বিজ্ঞান গবেষণাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনার উদ্যোগ হয় নি স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও। বেশ কিছু বড় বড় জাতীয় প্রতিষ্ঠান সরকারি বাজেট খরচ করে কিছু গবেষণা পরিচালনা করছে, কিন্তু এদের কারো ভেতরেই প্রগতিশীল গবেষণা সংস্কৃতি তৈরি হয়নি, দেশের কোনো সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সত্যিকার আন্তর্জাতিক চরিত্র অর্জন করতে পারেনি।
আমাদের দেশ পিছিয়ে থাকার অন্যতম বড় কারণ বিজ্ঞান ও গবেষণায় আমাদের এই পশ্চাতপদতা। গত এক দশক একজন স্থপতি কেবল কবিতা শুনিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় চালিয়েছেন। দেশের বিজ্ঞান ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে নেয়ার জন্য কোন অর্থপূর্ণ উদ্যোগ তার কাছ থেকে আসেনি।
অথচ এই এক দশকে পৃথিবীর বিজ্ঞানজগত আমূল বদলে গেছে। এর মধ্যে জিন এডিটিং প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশ হয়েছে, ইলেকট্রিক পরিবহনের বিপ্লব ঘটেছে, মহাকাশযাত্রায় অভাবনীয় অগ্রগতি সাধিত হয়েছে এবং শেষের দিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন জয়রথ যাত্রা শুরু করেছে। এই সবকিছু দূর থেকে আমরা দেখেছি। অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত ধাবমান একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিজ্ঞানের এই নতুন অগ্রযাত্রায় অংশ নেওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেনি। এই অপারগতার মূল কারণ ছিলো নেতৃত্বের ব্যর্থতা এবং দেশে অগ্রসর বিজ্ঞাননীতির অনুপস্থিতি। এই যুগে এসে বিজ্ঞান ও গবেষণায় এই অচলাবস্থা মেনে নেওয়া যায় না।
২০২৪ সালের আগস্ট বিপ্লবের মধ্য দিয়ে নতুন যে বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করেছে তার উন্নতির স্বপ্ন বাস্তবায়নে কৃষি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রধানতম হাতিয়ার। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবেলা করে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক ও উন্নত রাখার জন্য উপর্যুক্ত দুটি ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতির বিকল্প নাই। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তির মূলভিত্তি এর কৃষি। দেশের কোটি কোটি কৃষক যাতে তাদের উৎপাদন অব্যহত রাখতে পারে সেজন্য তাদের সমস্যা অনুধাবন করে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। কৃষির সাথে অনেকগুলো জাতীয় প্রতিষ্ঠান জড়িত- বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-সহ বহু প্রতিষ্ঠান দেশের কৃষির অগ্রযাত্রার দিক ঠিক করে। এইসব প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন, যুগপোযোগী নীতি নির্ধারণ ছাড়া আগামীর বাংলাদেশের কৃষি ভবিষ্যত সুরক্ষিত নয়। সাম্প্রতিক বন্যা এবং সামনের যেসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ অপেক্ষা করছে, তা মোকাবেলা করে কৃষির উৎপদান ধরে রাখা একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। এত গুরুত্বপূর্ণ যে কৃষি মন্ত্রণালয়, তার দায়িত্বে আছেন দেশের “স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা”। দেশের ভঙ্গুর আইন শৃঙ্খলা ঠিক করাই যেখানে প্রধান দায় হয়ে দাড়িয়েছে পুরো সরকারের জন্য, সেখানে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা যে কৃষিতে মনোযোগ দিতে পারবেন না, তা বলা বাহুল্য। ফলে অবধারিতভাবেই এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠানগুলো হয় আগের মতেই চলবে কিংবা আমলাদের দিয়ে চালাতে হবে।
একই কথা প্রযোজ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জন্য। এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ড. সালেহ উদ্দীন আহমেদকে। এই দায়িত্ব তিনি পেয়েছেন দ্বিতীয় দফায় যখন মন্ত্রণালয় বন্টন হয়, তখন। তার আগ থেকেই তিনি পালন করছিলেন অর্থ এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব। বাংলাদেশের অন্যতম বড় সংকট অর্থনৈতিক। দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ভেঙে পড়েছে, অনেকগুলো ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে। আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত প্রধান প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূলশক্তি গার্মেন্টস শিল্পও নানান সমস্যায় জর্জরিত। বলতেই হবে আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতির পরপরই অর্থনৈতিক দুরবস্থা দেশের বড় সংকট। এমন অবস্থায় ড. সালেহ উদ্দীনের পক্ষেও সম্ভব নয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে মনোযোগ দেওয়া। ফলাফল আবারও সেই আমলা নির্ভরতা।
দুটো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পূর্ণ মনোযোগ পেল না কারোরই। ফলে এদের অধীনস্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজ হয় থমকে আছে, অথবা চলছে আগের চেয়েও ঢিমেতালে। উভয় বাস্তবতাই নতুন বাংলাদেশের অগ্রগতির পথে বাধা।
একাধিক মন্ত্রণালয় দেখছেন যারা, তাদের পক্ষে প্রাথিমকভাবে তাদের দায়িত্বের বাইরে অন্য মন্ত্রণালয় পরিচালনা হচ্ছে মূলত আমলাদের মাধ্যমে। আমলাগণ কখনো পলিসি তৈরি করার মূল কর্তা হওয়ার সামর্থ্য রাখে না। এটা তাদের দায়িত্বও নয়। তাদের কাজ পলিসি বাস্তবায়ন করা। পলিসি নেয়ার কথা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের। অতীতে যেহেতু মন্ত্রীগণ অযোগ্য ছিলেন, ফলে আমলাতন্ত্র প্রচণ্ড ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে।
অতিশয় আমলা-নির্ভরতা হতাশাজনক একটা ব্যাপার। বাংলাদেশের বর্তমান দুরবস্থার জন্য স্বৈরাচারী সরকারের রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সাথে তাদের প্রতিষ্ঠিত আমলাতন্ত্রের ভূমিকাও কম নয়। সরকারের সাথে মিলে আমলাগণ দুর্নীতি এবং অবিচারের একটা দুর্ভেদ্য চক্র তৈরি করেছিল। সেই চক্রের সদস্যরাই এখনও অনেক জায়গায় অবস্থান করছে। তাদের চরিত্র বদলানোর জন্য, তাদেরকে চাপের মধ্যে রাখার জন্য উপদেষ্টাগণকে যথেষ্ট “হোমওয়ার্ক” করতে হবে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একাধিক মন্ত্রণালয় সামলাতে হলে তারা সেই সময় ও শক্তি কোনটাই পাবেন না। বাস্তবতাও তাই দেখা যাচ্ছে। বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের কাজে আমরা চরম অব্যবস্থাপনা দেখছি। অভিযোগ আছে এসবক্ষেত্রে আমলাতন্ত্রের অসহযোগিতারও।
এই প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য পৃথক উপদেষ্টা নিযুক্ত করা নতুন বাংলাদেশের অপরিহার্য চাহিদা।
অতীতের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নয়। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল দায়িত্ব ছিলো কেবল নির্বাচন আয়েজন করা। অন্যকোনো ক্ষেত্রে সংস্কারের কথা তাদের ভাবতে হয়নি। প্রায় প্রস্তুত একটি ব্যবস্থার ওপর ভর করে তারা কাজ করতে পেরেছেন। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে প্রায় সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে। সে কারণে এবার উপদেষ্টাদের সংখ্যাও বেশি।
এত উপদেষ্টাদের ভেতর একজনও নেই, যার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা ও সুনাম রয়েছে। নতুন বাংলাদেশ গড়ার এই যুগসন্ধিক্ষণে একজন বিজ্ঞানীকেও দেশ পরিচালনার নীতি নির্ধারণে যুক্ত করতে না পারাটা অত্যন্ত বেদনায়ক এবং দৃষ্টিকটুও বটে। একজন উন্নয়নকর্মী, অর্থনীতিবিদ কিংবা শিক্ষাবিদের দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি একজন বিজ্ঞানীর বিশ্লেষণী অভিমতও দেশ পরিচালনার নীতিসমূহ ঠিক করার ক্ষেত্রে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এবং গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারে।
দেশের জনগণ এই সরকারের কাছ থেকে এমন পরিবর্তন প্রত্যাশা করে, যা তারা কোনো রাজনৈতিক সরকারের কাছ থেকে এত বছরেও পায়নি। প্রধান উপদেষ্টাও বিভিন্ন উপলক্ষে বলেছেন, দেশ গড়ার এমন সুযোগ বাংলাদশের সামনে আর আসবে না। আমাদেরকে এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। আমাদের ব্যর্থ হওয়া চলবে না।
তার এই কথাকে বিস্তৃত করে বলা যায়, দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো দেশের কৃষি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে নতুন যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত করতে হবে। সেজন্য এই দুটো মন্ত্রণালয়ে আলাদা করে দু'জন উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। যদি তা এই মুহুর্তে সম্ভব না হয়, তবে দুটো মন্ত্রণালয়কেই নেতৃত্ব দিতে পারেন এমন একজন বিজ্ঞানীকে নিয়োগ দেওয়া হোক। দেশে কিংবা দেশের বাইরে কাজ করেছেন এমন প্রবাসী বিজ্ঞানী যার গ্রহণযোগ্যতা এবং নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা রয়েছে- এমন কাউকে উপদেষ্টা পরিষদে যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। কারণ, কৃষি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় কাতারে উপেক্ষিত রেখে দেশ এগোতে পারবে না।



