Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ইতিবাচক বৈষম্য: সরকারি চাকরির কোটাব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে একটি বিশ্লেষণ

অনেক দেশেই ইতিবাচক বৈষম্য নীতির কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৪, ০৮:৩২ পিএম

বাংলাদেশে সরকারি চাকরির জন্য বিদ্যমান কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে চলমান প্রতিবাদ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা বিষয় হয়ে উঠেছে। সমাজের বিভিন্ন স্তরে এর প্রয়োজনীয়তা এবং কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। এই প্রসঙ্গে, ইতিবাচক বৈষম্য বা “অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন” এর প্রয়োজনীয়তা এবং এর আইনী বৈধতা নিয়ে বিশদ আলোচনা প্রয়োজন। বর্তমান প্রতিবাদের প্রেক্ষাপটে, অন্যান্য দেশগুলির উদাহরণ এবং বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করাই এখন সময়ের দাবি।

ইতিবাচক বৈষম্য: একটি বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ

ইতিবাচক বৈষম্য হলো এমন একটি নীতি যা সমাজের সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীগুলোকে সমান সুযোগ প্রদান করে তাদের উন্নয়নের পথ সুগম করে। এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে সহায়ক। অনেক দেশেই ইতিবাচক বৈষম্য নীতির কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে।

ভারতের কোটাব্যবস্থা

ভারতে কোটাব্যবস্থা সুবিধাবঞ্চিত এবং অনগ্রসর শ্রেণীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দলিত, অনগ্রসর জাতি ও উপজাতির জন্য সংরক্ষিত কোটার মাধ্যমে তারা শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে। এটি তাদের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নে সহায়ক হচ্ছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন নীতির মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নারী, আফ্রিকান আমেরিকান, এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। এই নীতির মাধ্যমে বৈষম্য কমানো এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের যুদ্ধের বীরদের সম্মান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ব্রিটিশ সৈনিকদের জন্য বিশেষ সুযোগ ও সুবিধা প্রদান করা হয়। তাদের ত্যাগ ও বীরত্বের প্রতি সম্মান জানিয়ে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা ও সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। এই উদ্যোগগুলি জাতীয় সম্মান ও গর্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটা

বাংলাদেশে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটাব্যবস্থা সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত কোটা তাদের ত্যাগ ও অবদানের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি মাধ্যম। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের জীবন বিপন্ন করে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছেন, তাই তাদের এবং তাদের পরিবারের জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করা একটি ন্যায়সংগত পদক্ষেপ।

মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের জন্য কোটাব্যবস্থা শুধু তাদের সরকারি চাকরিতে সুযোগ দেয় না, বরং সমাজে তাদের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করে। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশপ্রেম এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীলতার শিক্ষা দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের প্রতি সম্মান জানিয়ে এবং সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীর জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করে আমরা একটি সুষম ও উন্নত সমাজ গঠন করতে পারি।

আইনী প্রেক্ষাপট: বিচার বিভাগে আস্থা

এছাড়াও, এটি গুরুত্বপূর্ণ যে যখন কোনো বিষয় বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন থাকে, তখন আমাদের উচিত বিচার ব্যবস্থার প্রতি সম্মান ও আস্থা রাখা। বিচার বিভাগের উপর আস্থা রেখে আইন মেনে চলা একটি দায়িত্বশীল নাগরিকের পরিচয় এবং এটি দেশের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বর্তমান কোটাব্যবস্থার বিরোধিতার প্রশ্নটি বর্তমানে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত বিচার বিভাগের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা এবং বিচার বিভাগের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রাখা। বিচার বিভাগের সিদ্ধান্তই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করবে।

শেষ কথা

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, সরকারি চাকরির জন্য কোটাব্যবস্থা একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। এটি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীগুলিকে সমান সুযোগ প্রদান করে এবং তাদের উন্নয়নের পথ সুগম করে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত কোটা তাদের ত্যাগ ও অবদানের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি মাধ্যম এবং এটি আমাদের জাতীয় গর্বের প্রতীক।

অন্যান্য দেশের উদাহরণে দেখা যায় যে, ইতিবাচক বৈষম্য নীতি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে এবং সমাজের সুষম উন্নয়নে সহায়ক। বিচার বিভাগের প্রতি সম্মান ও আস্থা রেখে, আমরা আমাদের সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারি এবং একটি সুষম ও উন্নত সমাজ গঠন করতে পারি।

এই প্রেক্ষাপটে, কোটাব্যবস্থার বিরোধিতা না করে, সমাজের সুষম উন্নয়নের জন্য এবং সুযোগের সমতা নিশ্চিত করার জন্য ইতিবাচক বৈষম্যের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা উচিত। এটি শুধুমাত্র সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় ঐক্য ও গর্বের প্রতীক হিসেবেও কাজ করে।

  1. ব্যারিস্টার আরাফাত হোসেন খান, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট;
  2. বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x