Tuesday, August 25, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

যে সিনেমা বদলে দিয়েছিলো স্টিভ জবসের ভাগ্য

‘টয় স্টোরি’র সাফল্য তার জীবনে এনে দেয় বড় পরিবর্তন 

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৫০ পিএম

স্টিভ জবসের নাম শুনলেই সাধারণত অ্যাপল, আইফোন, ম্যাক কিংবা আইপ্যাডের কথা মনে পড়ে আমাদের। কিন্তু আপনি কি জানেন তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় সাফল্য প্রযুক্তিপণ্য তৈরিতে নয়, সিনেমার জগতে। ‘টয় স্টোরি’ শুধু অ্যানিমেশন ইতিহাসের মাইলফলক নয়, স্টিভ জবসের জীবনেও ছিল গুরুত্বপূর্ণ এক মোড়।  

১৯৮৫ সালে অ্যাপল থেকে বিদায় নেওয়ার পরও থেমে থাকেননি জবস। পরের বছর তিনি জর্জ লুকাসের লুকাসফিল্মের কম্পিউটার গ্রাফিকস বিভাগ কিনে নেন। পরে সেটিকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলেন ‘পিক্সার’ নামে। তখন সেখানে কর্মী ছিলেন প্রায় ৪০ জন। কম্পিউটার গ্রাফিকসের সম্ভাবনায় বিশ্বাসী জবস মনে করেছিলেন, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে বড় ব্যবসার ভিত্তি হতে পারে।

তখন অবশ্য কেউ জানত না, ছোট এই প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান একদিন চলচ্চিত্রের ইতিহাস বদলে দেবে। কয়েক বছর পর পিক্সারই তৈরি করবে ‘টয় স্টোরি’, যে সিনেমার সাফল্য বদলে দেবে জবসের আর্থিক অবস্থান এবং অ্যাপল-পরবর্তী ক্যারিয়ারের গতিপথ।

পিক্সারডটকম, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, অস্কারডটঅর্গ ও দ্য নাম্বারডটকম অবলম্বনে এসব তথ্য জানা গেছে।

অ্যাপল থেকে বিদায় ও পিক্সারের সূচনা

১৯৮৫ সালে স্টিভ জবসের বয়স মাত্র ৩০ বছর। এর এক বছর আগে অ্যাপল ম্যাকিন্টোশ বাজারে এনে প্রযুক্তি দুনিয়ায় আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ভেতরে তখন ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে ওঠে। অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জন স্কালির সঙ্গে জবসের মতবিরোধ ক্রমেই বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত পরিচালনা পর্ষদ স্কালির পক্ষ নেয়। নিজের তৈরি প্রতিষ্ঠান অ্যাপল থেকেই সরে যেতে হয় জবসকে।

২০০৫ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন বক্তৃতায় সেই সময়ের কথা স্মরণ করে জবস জানান, অ্যাপল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর কয়েক মাস তিনি বুঝতে পারছিলেন না কী করবেন। এমনকি সিলিকন ভ্যালি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন।

তবে পরে তিনি বুঝতে পারেন, এই ধাক্কাই তার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। অ্যাপল থেকে বেরিয়ে যাওয়াকে তিনি জীবনের অন্যতম সেরা ঘটনা হিসেবে দেখেছিলেন। এবার নিজের মতো করে নতুন কিছু করার স্বাধীনতা পেয়েছিলেন। এরপর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন প্রযুক্তি কোম্পানি ‘নেক্সট’। একই সময় শুরু হয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় - পিক্সার।

১৯৮৬ সালে জর্জ লুকাসের লুকাসফিল্মের কম্পিউটার গ্রাফিকস বিভাগ কিনে নেন জবস। পরে সেটিকে আলাদা কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। নাম দেন পিক্সার।

শুরুতে পিক্সারের কাজ সিনেমা বানানো ছিল না। প্রতিষ্ঠানটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গ্রাফিকস কম্পিউটার ও সফটওয়্যার তৈরি করত। এর অন্যতম প্রধান পণ্য ছিল ‘পিক্সার ইমেজ কম্পিউটার’। চিকিৎসা, বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নত ভিজ্যুয়ালাইজেশনের জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল।

কিন্তু ব্যবসাটি প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোচ্ছিল না। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে কম্পিউটার অ্যানিমেশন নিয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছিল। এড ক্যাটমুল, অ্যালভি রে স্মিথ ও জন ল্যাসেটারের মতো প্রতিভাবানরা তখন কম্পিউটার গ্রাফিকস ও অ্যানিমেশন নিয়ে কাজ করছিলেন।

অ্যানিমেশনে নতুন সম্ভাবনা

পিক্সারের অ্যানিমেশন বিভাগের সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯৮৬ সালের ‘লাক্সো জুনিয়র’ অ্যানিমেশনে। ছোট একটি ডেস্ক ল্যাম্পকে কেন্দ্র করে তৈরি এই কাজ দেখিয়ে দেয়, কম্পিউটার দিয়ে শুধু দৃশ্য তৈরি নয়, চরিত্রের আবেগও ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।

এই সাফল্য জবসকে পিক্সারের অ্যানিমেশন সম্ভাবনা নিয়ে আরও আশাবাদী করে। এরপর প্রতিষ্ঠানটি বিজ্ঞাপন, স্বল্পদৈর্ঘ্য অ্যানিমেশন ও কম্পিউটার গ্রাফিকসের কাজ করতে থাকে।

১৯৮৮ সালে ‘টিন টয়’ একাডেমি অ্যাওয়ার্ড জিতে নেয়। এটি ছিল কম্পিউটার অ্যানিমেশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি স্বীকৃতি। তবে পুরস্কার এলেও পিক্সারের ব্যবসায়িক সংকট কাটেনি।

পিক্সারের তৎকালীন প্রধান অর্থ কর্মকর্তা লরেন্স লেভির বর্ণনা অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে জবস প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে কোম্পানির নগদ অর্থের ঘাটতিও সামলাতে হয়েছে তাকে।

অর্থাৎ পিক্সারে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করলেও তখনো বড় কোনো আর্থিক সাফল্য আসেনি। তারপরও প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেননি জবস। কারণ, ল্যাসেটার ও তাঁর দলের সামনে তখন আরও বড় লক্ষ্য - কম্পিউটারে তৈরি একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।

‘টয় স্টোরি’র ঝুঁকি

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ নিতে শুরু করে। তখন কম্পিউটার অ্যানিমেশনের প্রযুক্তি ছিল সীমিত, ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। একটি সিনেমার চরিত্র, সেট, আলোছায়া থেকে ক্যামেরার গতিবিধি - সবকিছুই কম্পিউটারের মাধ্যমে তৈরি করতে হতো।

পিক্সারের জন্য এটি ছিল বড় ঝুঁকি। সিনেমাটি সফল হলে অ্যানিমেশনের নতুন যুগের সূচনা হতে পারত। আর ব্যর্থ হলে জবসকে হারাতে হতো তাঁর দীর্ঘদিনের বিশাল বিনিয়োগ।

ছবিটির পরিচালক ও প্রধান সৃজনশীল শক্তি ছিলেন জন ল্যাসেটার। প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এড ক্যাটমুলের। আর জবসের ভূমিকা ছিল তাদের প্রয়োজনীয় অর্থ, সময় ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তবে পিক্সারের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল - পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা তৈরি করলেও সেটি দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল বড় কোনো স্টুডিও। সেই জায়গায় আসে ডিজনি।

১৯৯১ সালের মে মাসে পিক্সার ও ডিজনির মধ্যে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরির চুক্তি হয়। সর্বোচ্চ তিনটি অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র তৈরির পরিকল্পনা ছিল সেই চুক্তিতে। প্রথম সিনেমাটিই ছিল ‘টয় স্টোরি’।

‘টয় স্টোরি’র সাফল্য

চুক্তি হওয়ার পরও ‘টয় স্টোরি’র পথ সহজ ছিল না। ছবিটির প্রাথমিক দৃশ্য ডিজনির প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। গল্প ও চরিত্র নিয়েও সমস্যা দেখা দেয়। একপর্যায়ে ডিজনি পিক্সারকে কাজ থামিয়ে গল্প ও চরিত্রগুলো নতুন করে সাজানোর নির্দেশ দেয়।

পুনর্লিখন ও পুনর্গঠনের পর উডি ও বাজ লাইটইয়ারের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়। উডির নিজের জায়গা হারানোর ভয় এবং বাজের নিজেকে সত্যিকারের মহাকাশযোদ্ধা মনে করার ভুল ধারণা থেকেই গল্পের মূল দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। পরে সেই দ্বন্দ্বই বন্ধুত্বে রূপ নেয়।

১৯৯৫ সালের ২২ নভেম্বর মুক্তি পায় ‘টয় স্টোরি’। টম হ্যাঙ্কসের কণ্ঠে উডি এবং টিম অ্যালেনের কণ্ঠে বাজ লাইটইয়ারকে নিয়ে সিনেমাটি দর্শকদের সামনে সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা হাজির করে।

‘টয় স্টোরি’ ছিল বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ কম্পিউটার অ্যানিমেটেড পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। সিনেমাটি তিনটি অস্কার মনোনয়ন পায় এবং জন ল্যাসেটার পান বিশেষ সম্মাননা। প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার বাজেটে নির্মিত সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী ৩৬৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে। ১৯৯৫ সালের সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমাতেও পরিণত হয় এটি। পিক্সারের যে প্রতিষ্ঠানকে জবস বছরের পর বছর নিজের অর্থ দিয়ে টিকিয়ে রেখেছিলেন, সেই কোম্পানির প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমাই হয়ে ওঠে বড় বাণিজ্যিক সাফল্য।

‘টয় স্টোরি’ বদলে দিলো জবসের ভাগ্য 

‘টয় স্টোরি’ মুক্তির কয়েক দিনের মধ্যেই পিক্সার শেয়ারবাজারে প্রবেশ করে। ১৯৯৫ সালের ২৯ নভেম্বর পিক্সারের প্রাথমিক শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২২ ডলার। লেনদেন শুরুর পর শেয়ারের দাম একপর্যায়ে ৪৯.৫০ ডলারে ওঠে এবং দিন শেষে ৩৯ ডলারে বন্ধ হয়। কোম্পানিটির বাজারমূল্য প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়।

শেয়ারবাজারে এই সাফল্যের ফলে জবসের ব্যক্তিগত সম্পদও দ্রুত বাড়তে থাকে। তিনি বিলিয়নিয়ার হয়ে ওঠেন। অ্যাপল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর পিক্সারের সাফল্যের মাধ্যমে আবারও বড় ব্যবসায়িক শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেন জবস। ‘টয় স্টোরি’ শুধু পিক্সারকে সফল করেনি, বদলে দিয়েছিল জবসের আর্থিক ও ব্যবসায়িক অবস্থানও।

পিক্সারের সাফল্য, জবসের প্রত্যাবর্তন

‘টয় স্টোরি’ ছিল কেবল শুরু। এরপর ‘আ বাগস লাইফ’, ‘টয় স্টোরি ২’, ‘মনস্টারস ইনক’ ও ‘ফাইন্ডিং নিমো’র মতো একের পর এক সাফল্য পেতে থাকে পিক্সার। অ্যানিমেশন জগতের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় কোম্পানিটি।

এদিকে জবসের অন্য প্রতিষ্ঠান নেক্সটও তার অ্যাপলে ফিরে আসার পথ তৈরি করছিল। ১৯৯৬ সালে অ্যাপল নেক্সটকে অধিগ্রহণ করে। এর মাধ্যমে অ্যাপলে জবসের প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি হয়।

অর্থাৎ অ্যাপল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর তৈরি করা দুই প্রতিষ্ঠান - নেক্সট ও পিক্সার - দুই ভিন্ন পথে তার ক্যারিয়ারকে আবারও শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার ভিত্তি তৈরি করেছিল। পিক্সারের সাফল্যের সঙ্গে ডিজনির সম্পর্কও আরও ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। একপর্যায়ে অংশীদারত্বের সম্পর্ক ছাড়িয়ে পিক্সারকে অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় ডিজনি।

২০০৬ সালে প্রায় ৭.৪ বিলিয়ন ডলারে পিক্সারকে অধিগ্রহণ করে ডিজনি। চুক্তির ফলে স্টিভ জবস ডিজনির প্রায় ৬.৩% শেয়ারের মালিক হন এবং প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় একক ব্যক্তিগত শেয়ারহোল্ডারে পরিণত হন। একই সঙ্গে তিনি ডিজনির পরিচালনা পর্ষদে যোগ দেন।

৩০ বছর বয়সে নিজের তৈরি অ্যাপল থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন স্টিভ জবস। কয়েক বছর পর তিনি এমন একটি প্রতিষ্ঠানে বড় ঝুঁকি নিলেন, যার ভবিষ্যৎ তখনো নিশ্চিত ছিল না। সেই পিক্সারই তৈরি করলো ‘টয় স্টোরি’।

সিনেমাটির সাফল্য পিক্সারকে অ্যানিমেশন জগতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি জবসের আর্থিক ও ব্যবসায়িক অবস্থানও বদলে দেয়। পরে অ্যাপলে ফিরে এসে তিনি প্রযুক্তি দুনিয়ায় নতুন অধ্যায় তৈরি করেন।

তাই ‘টয় স্টোরি’ শুধু অ্যানিমেশন ইতিহাসের একটি মাইলফলক নয়; এটি স্টিভ জবসের অ্যাপল-পরবর্তী জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যগুলোর একটি এবং তার ফিরে আসার গল্পেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পিক্সারকে কিনে নিলে জবস ডিজনির ৬.৩% শেয়ারের মালিক হয়ে সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত শেয়ারহোল্ডারে পরিণত হন।

একইসঙ্গে, জবসের অন্য প্রতিষ্ঠান ‘নেক্সট’-কে ১৯৯৬ সালে অ্যাপল কিনে নিলে তৈরি হয় জবসের অ্যাপলে ফেরার পথ। পিক্সারের বাণিজ্যিক ভিত্তি এবং আর্থিক সাফল্য স্টিভ জবসকে এমন এক অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছিল, যার ওপর নির্ভর করেই তিনি পরবর্তীতে প্রযুক্তি দুনিয়ার নতুন অধ্যায় রচনা করেছিলেন। 

   

About

Popular Links

x