ঘরের মেঝে দিয়ে একটি মাকড়সা ছুটে গেলে অনেকেরই অস্বস্তি হয়। কেউ কেউ আবার এতোটাই ভয় পান যে ঘরে মাকড়সা থাকার কথা জানলেই রাতে ঘুমাতে পারেন না। কিন্তু মাকড়সা বা সাপের মতো প্রাণীর প্রতি এই ভয় কেন তৈরি হয়? আর কখন সাধারণ ভয় ফোবিয়ায় পরিণত হয়?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ভয় মানুষের স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুভূতি। সম্ভাব্য বিপদ শনাক্ত করে তা থেকে দূরে থাকতে ভয় আমাদের সাহায্য করে। তবে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়কে ঘিরে ভয় যখন অতিরিক্ত তীব্র হয়ে ওঠে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করে, তখন সেটিকে ফোবিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ভয় কি জন্মগত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষ নির্দিষ্ট কোনো ফোবিয়া নিয়ে জন্মায় না। তবে কিছু বিষয়কে অন্য কিছুর তুলনায় দ্রুত বিপদ হিসেবে শনাক্ত করার প্রবণতা মানুষের মধ্যে থাকতে পারে।
অস্ট্রিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের সামনে ফুল ও মাছের ছবির তুলনায় সাপ ও মাকড়সার ছবি দেখালে তাদের চোখের মণিতে বেশি পরিবর্তন দেখা যায়। এটি সম্ভাব্য বিপদ শনাক্ত করার শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
গবেষকদের ধারণা, সাপ ও মাকড়সার অস্বাভাবিক আকৃতি ও চলাফেরা মানুষের মস্তিষ্কে দ্রুত সতর্কতার সংকেত তৈরি করতে পারে। বিবর্তনের ধারায় বিপজ্জনক প্রাণী শনাক্ত করার এই প্রবণতা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই বড় কারণ
তবে শুধু এই প্রবণতা থাকলেই কারও ফোবিয়া তৈরি হয় না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কোনো ব্যক্তি যদি মাকড়সার কামড় বা সাপের আকস্মিক উপস্থিতির মতো ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, তাহলে পরবর্তীতে ওই প্রাণী দেখলেই আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। একইভাবে, বাবা-মা বা পরিবারের অন্য কাউকে কোনো প্রাণী দেখে ভয় পেতে দেখলেও শিশুর মধ্যে সেই ভয় তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ, ভয় অনেক সময় সরাসরি অভিজ্ঞতার পাশাপাশি অন্যের আচরণ দেখেও শেখা যায়।
সিনেমা-বইয়ে ভয়ের উপস্থাপনাও দায়ী
মাকড়সা ও সাপের প্রতি মানুষের ভয় তৈরিতে জনপ্রিয় সংস্কৃতিরও ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সিনেমা, টেলিভিশন ও বইয়ে এসব প্রাণীকে প্রায়ই বিপজ্জনক, আক্রমণাত্মক কিংবা ভীতিকর হিসেবে দেখানো হয়। ফলে বাস্তবে প্রাণীটি যতটা বিপজ্জনক, মানুষের মনে তার চেয়ে অনেক বড় হুমকির ধারণা তৈরি হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রকৃতি থেকে মানুষের ক্রমবর্ধমান দূরত্ব। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রকৃতির মধ্যে বেশি সময় কাটান এবং বিভিন্ন প্রাণীর সঙ্গে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তাদের মধ্যে প্রাণী-সম্পর্কিত ভয় তুলনামূলক কম হতে পারে।
ফোবিয়া কাটানো সম্ভব
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফোবিয়া স্থায়ী কোনো বিষয় নয়। ধীরে ধীরে ভয় মোকাবিলা করার মাধ্যমে এটি কমানো সম্ভব।
প্রথমে মাকড়সার ছবি দেখা, এরপর ভিডিও দেখা এবং ধীরে ধীরে বাস্তব মাকড়সার উপস্থিতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মতো ধাপ অনুসরণ করা যেতে পারে। মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের পদ্ধতিকে এক্সপোজার থেরাপি বলা হয়।
তবে ভয় যদি এতটাই তীব্র হয় যে ঘুম, কাজ, চলাফেরা বা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে, তাহলে নিজে নিজে মোকাবিলা করার পরিবর্তে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট প্রাণীকে ভয় পাওয়ার অর্থ এই নয় যে সেই ভয় সারাজীবন থেকে যাবে। সঠিক পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে ভয় নিয়ন্ত্রণ করা এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।



