Thursday, May 30, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

গবেষণা: জিরো ক্যালোরি সুইটনারে হতে পারে হার্ট অ্যাটাক-স্ট্রোক

ইরিথ্রিটল হলো সরবিটল ও জাইলিটলের মতো এক ধরনের কার্বোহাইড্রেট, যা সুগার অ্যালকোহল হিসেবে পরিচিত

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৩, ০৭:২০ পিএম

চিনির বিকল্প হিসেবে আমরা অনেকেই জিরো ক্যালোরির সুইটনার ব্যবহার করে থাকি। এমনই এক সুইটনার হলো ইরিথ্রিটল, যা স্টিভিয়া, মঙ্কফ্রুট এবং কম কিটোসমৃদ্ধ চিনিজাতীয় পণ্যগুলোকে মিষ্টি করতে ব্যবহৃত হয়।

কিন্তু ইরিথ্রিটল নামের এ সুইটনার রক্ত জমাট বাঁধা, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। এক প্রতিবেদনে এ কথা জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।

ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক লার্নার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সেন্টার ফর কার্ডিওভাসকুলার ডায়াগনস্টিকস অ্যান্ড প্রিভেনশনের পরিচালক ও গবেষণার প্রধান লেখক ডা. স্ট্যানলি হ্যাজেন বলেন, ইরিথ্রিটল ব্যবহারে ঝুঁকির মাত্রা একেবারেই কম না। গত সপ্তাহে ন্যাচার মেডিসিন জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, হৃদরোগের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে যারা ডায়াবেটিসেও ভুগছেন, তাদের রক্তে ইরিথ্রিটল মাত্রা সর্বোচ্চ থাকলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি দ্বিগুণ।

ডা. স্ট্যানলি হ্যাজেন বলেন, রক্তে ইরিথ্রিটলের মাত্রা নিচের ২৫%-এর তুলনায় ওপরের ২৫% থাকলে আপনার হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ। ইরিথ্রিটল ডায়াবেটিসের মতো শক্তিশালী কার্ডিয়াক ঝুঁকির কারণগুলোর সমতুল্য।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়,  রক্তের প্লাটিলেটগুলোকে সহজে জমাট বাঁধতে সহায়তা করে ইরিথ্রিটল। জমাট বাঁধা সেই রক্ত ফের ভেঙে হৃদপিণ্ডে গেলে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। এমনকি মস্তিষ্কে গেলে স্ট্রোকেরও সম্ভাবনা রয়েছে।

গবেষণায় সংশ্লিষ্ট না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের ডেনভারের ন্যাশনাল জিউইশ হেলথ হাসপাতালের কার্ডিওভাসকুলার প্রিভেনশন অ্যান্ড ওয়েলনেস বিভাগের পরিচালক ডা. অ্যান্ড্রু ফ্রিম্যান বলেন, এটি অবশ্যই শঙ্কাজনক বিষয়।

তিনি আরও বলেন, ইরিথ্রিটল ব্যবহারে রক্তে জমাট বাঁধার ঝুঁকি আছে বলে মনে হচ্ছে। অবশ্যই এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে অধিকতর সতর্কতার স্বার্থে আপাতত খাদ্যতালিকায় ইরিথ্রিটলের ব্যবহার কমিয়ে আনাই শ্রেয়।

গবেষণার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালোরি কন্ট্রোল কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক রবার্ট র‌্যাঙ্কিন বলেন, এই গবেষণা গত কয়েক দশকের বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিপরীতে ফলাফল দেখিয়েছে। কেননা, ইরিথ্রিটলের মতো কম ক্যালরির সুইটনারকে নিরাপদ মনে করে বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ খাদ্য ও পানীয় প্রস্তুতে এর ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এই গবেষণার ফলাফল সাধারণ মানুষের সামনে উন্মোচন করা ঠিক হবে না। কারণ এতে অংশগ্রহণকারীরা হৃদযন্ত্রের অসুখে আক্রান্ত। গবেষণাটি এখনও পর্যালোচনা করা হয়নি বলে দ্য ইউরোপিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব পলিওল প্রডিউসারস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

ইরিথ্রিটল কী

ইরিথ্রিটল হলো সরবিটল ও জাইলিটলের মতো এক ধরনের কার্বোহাইড্রেট, যা সুগার অ্যালকোহল হিসেবে পরিচিত। প্রাকৃতিকভাবে বিভিন্ন ফল ও সবজিতে এটি পাওয়া যায়। এতে চিনির প্রায় ৭০% মিষ্টতা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা একে জিরো ক্যালরি হিসেবে বিবেচনা করেন।

কৃত্রিমভাবে প্রচুর পরিমাণে প্রস্তুত ইরিথ্রিটলের কোনো দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নেই। এগুলো রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায় না। পাশাপাশি অন্যান্য সুগার অ্যালকোহলের চেয়ে কম রেচক প্রভাব ফেলে।

ডা. স্ট্যানলি হ্যাজেন বলেন, ইরিথ্রিটল দেখতে চিনির মতো। এটির স্বাদও চিনির মতো এবং আপনি এটি দিয়ে বেকিং করতে পারবেন। চিনির বিকল্প হিসেবে খাদ্যপণ্যে এটি দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।


তিনি আরও বলেন, ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের খাদ্যপণ্যে চিনির বিকল্প হিসেবে ইরিথ্রিটলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ডায়াবেটিস রোগীদের খাবার বলে আখ্যা দেওয়া কিছু খাবারে তো আমরা ওজন অনুসারে অন্যান্য উপাদানের চেয়ে ইরিথ্রিটলের পরিমাণই বেশি দেখতে পেয়েছি।

হ্যাজেন বলেন, প্রাকৃতিক স্টিভিয়া ও মংকফ্রুটের মধ্যেও ওজন অনুসারে অন্যান্য উপাদানের তুলনায় ইরিথ্রিটল সবচেয়ে বড় উপাদান। কারণ মংকফ্রুট এবং স্টিভিয়া চিনির চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ গুণ বেশি মিষ্টি। তাই যেকোনো পণ্যে খুবই অল্প পরিমাণে দিলেই হয়। কিন্তু অধিকাংশ উপাদানই থাকে ইরিথ্রিটল, যা ক্রেতাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী চিনির মতো স্ফটিক-সদৃশ চেহারা ও টেক্সচার দিতে সাহায্য করে।

অপ্রত্যাশিত এক আবিষ্কার

ডা. স্ট্যানলি হ্যাজেনের ভাষ্যমতে, ইরিথ্রিটল ও কার্ডিওভাস্কুলার সমস্যাগুলোর মধ্যে থাকা যোগসূত্র অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই আবিষ্কার হয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমরা এটা প্রত্যাশাই করিনি। এমনকি আমরা এটা খুঁজছিলামও না।

হ্যাজেনের গবেষণার লক্ষ্য তেমন জটিল কিছু ছিল না। মানুষের অচেনা কোনো রাসায়নিক বা যৌগ খুঁজে বের করা, যা হয়তো আগামী তিন বছরের মধ্যে তাদের হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে- এটি প্রমাণের উদ্দেশ্যেই ২০০৪ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে হ্যাজেনের দলের সদস্যরা হৃদরোগের ঝুঁকিতে থাকা ১,১৫৭ জন মানুষের রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ শুরু করে।

হ্যাজেন বলেন, আমরা দেখতে পাই একটি পদার্থ বড় ভূমিকা রাখছে। কিন্তু তখনও আমরা জানতাম না এটা আসলে কী ছিল। পরে আমরা দেখতে পাই যে এটা আসলে ইরিথ্রিটল।

মিষ্টিজাতীয় খাবার ডায়াবেটিস রোগীদের শত্রু/সংগৃহীত

মানবদেহে প্রাকৃতিকভাবেই কিছু ইরিথ্রিটল উৎপন্ন হয়। তবে প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন এ ইরিথ্রিটলের পরিমাণ হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট না।

গবেষণার ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ২,১০০ জনেরও বেশি মানুষের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে হ্যাজেনের দল। পাশাপাশি ২০১৮ সালের মধ্যে ইউরোপের সহকর্মীদের মাধ্যমে সংগৃহীত অতিরিক্ত ৮৩৩টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়।

হ্যাজেন জানান, তিন ধরনের নমুনার অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তিন-চতুর্থাংশ ব্যক্তির করোনারী রোগ বা উচ্চ রক্তচাপ এবং প্রায় এক-পঞ্চমাংশের ডায়াবেটিস ছিল। তাদের মধ্যে অর্ধেকের বেশিই ছিল পুরুষ এবং তাদের বয়স ছিল ষাট ও সত্তরের কোঠায়।

তিনটি আলাদা জনসংখ্যার নমুনার মধ্যেই গবেষকরা উচ্চ মাত্রায় ইরিথ্রিটল গ্রহণ করতে থাকলে আগামী তিন বছরের মধ্যে ব্যক্তির হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা দেখেন। কারণ খুঁজতে গিয়ে গবেষকরা আরও প্রাণীদের দিয়ে পরীক্ষাগাএ পরীক্ষা চালান। তখনো দেখা যায়, ইরিথ্রিটল রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করছে।

মানবদেহের জন্য অবশ্যই রক্ত জমাট বাঁধা প্রয়োজনীয়। অন্যথায় কোথাও কেটে গেলে শরীর থেকে প্রচুর রক্ত বেরিয়ে যেত। ক্রমাগত একই প্রক্রিয়া অভ্যন্তরীণভাবেও ঘটছে। হ্যাজেন বলেন, আমাদের রক্তনালীগুলো সবসময় একটা চাপের মধ্যে থাকে। ছিদ্র খুলে গেলে রক্তের প্লাটিলেটগুলো সবসময় ছিদ্রগুলোকে বন্ধ করে দিতে কাজ করে।

তিনি আরও বলেন, কিন্তু প্লাটিলেট কতটুক রক্ত জমাট বাঁধাবে, তা নির্ভর করে কোষগুলোকে উদ্দীপিত করা ট্রিগার-এর আকারের ওপর। যেমন, ট্রিগার যদি মাত্র ১০% হয়, তাহলে শুধু ১০% রক্তই জমাট বাঁধবে। কিন্তু আমরা  ইরিথ্রিটলের উপস্থিতিতে প্লাটিলেটগুলোকে বেশি সাড়া দিতে দেখেছি। যেমন, ট্রিগার যদি মাত্র ১০% হয়, তবুও ৯০-১০০% রক্ত জমাট বাঁধে।

হ্যাজেন বলেন, যাদের রক্ত জমাট বাধা, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি আছে; কিংবা যারা ইতোমধ্যেই কার্ডিয়াক রোগ অথবা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত- আমার মনে হয় ইরিথ্রিটল থেকে তাদের দূরে থাকতে বলাই নিরাপদ। অন্তত যতদিন না পর্যন্ত এ নিয়ে আরও গবেষণা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার আরএমআইটি  বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অলিভার জোন্স জানান, গবেষকরা শুধুমাত্র ইরিথ্রিটল ও কার্ডিওভাস্কুলার সমস্যাগুলোর মধ্যে একটা সংযোগ আছে বলে প্রকাশ করেছেন, কার্যকারণ দেখাননি।

জোন্স  বলেন, গবেষকরা বলছেন যে তারা ইরিথ্রিটল ও রক্ত জমাট বাঁধার মধ্যে একটা সংযোগ খুঁজে পেয়েছেন, তবে সংযোগ থাকার ব্যাপারে নিশ্চিত প্রমাণ নেই। অতিরিক্ত ইরিথ্রিটল গ্রহণের সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলোর (এখনও অনিশ্চিত) কথা মাথায় রাখলে তা মাত্রাধিক গ্লুকোজের ঝুঁকি প্রতিরোধেও সহায়ক হবে।

স্বেচ্ছাসেবক

গবেষণার চূড়ান্ত এক অংশে ৮ জন সুস্থ স্বেচ্ছাসেবক ৩০ গ্রাম ইরিথ্রিটল যুক্ত পানীয় পান করেন। যুক্তরাষ্ট্রের পুষ্টি নিরীক্ষাকারী ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশন এক্সামিনেশন সার্ভে অনুযায়ী, প্রতি বছর মার্কিনরা এ পরিমাণেই ইরিথ্রিটল গ্রহণ করে। পানীয় পানের পরের তিন দিনে তাদের রক্তে ইরিথ্রিটলের মাত্রা এবং জমাট বাঁধার ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করা হয়। 

ডা. স্ট্যানলি হ্যাজেন বলেন, রক্তে ইরিথ্রিটলের মাত্রা হাজারগুণ বেড়ে যাওয়ার জন্য ৩০ গ্রামই যথেষ্ট। পানীয় পানের পরের দুই-তিনদিনে ইরিথ্রিটলের মাত্রা এতই বেশি থাকে যে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকিও থেকে যায়। ৩০ গ্রাম ইরিথ্রিটলের পরিমাণ বুঝাতে এটি এক পিন্ট কিটো আইসক্রিমের সমতুল্য বলেও উল্লেখ করেন হ্যাজেন।

তিনি আরও বলেন, অনেক কিটো আইসক্রিমের লেবেলেই স্বল্প চিনিযুক্ত বা সুগার অ্যালকোহল লেখা দেখতে পাবেন, যা আসলে ইরিথ্রিটলের উপস্থিতিকে নির্দেশ করে। সাধারণত এক পিন্টে ২৬ থেকে ৪৫ গ্রামের মতো ইরিথ্রিটল থাকে। আমার সহ-লেখক এবং আমি অনেকগুলো মুদি দোকানে গিয়ে পণ্যের লেবেল চেক করি। তিনি ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য বাজারজাত করা একটি কনফেকশনারিতে ৭৫ গ্রাম ইরিথ্রিটলও খুঁজে পেয়েছেন।

ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ইরিথ্রিটলকে নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অন্যদিকে, এখন পর্যন্ত দৈনিক ইরিথ্রিটল ব্যবহারের জন্য ইউরোপীয়ান ফুড সেফটি অথরিটি নির্দিষ্ট কোনো মাত্রা নির্ধারণ করেনি।

 এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল জিউয়িশ হেলথের ডা. অ্যান্ড্রু ফ্রিম্যান বলেন, এ উপাদানটি (ইরিথ্রিটল) বহুল ব্যবহৃত এবং বর্তমানে সর্বত্র পাওয়া যাচ্ছে। সত্যিই যদি এটা ক্ষতিকর হয়ে থাকে, তাহলেতাড়াহুড়ো না করে এ বিষয়ে ভালোভাবে জানাই আমাদের জন্য মঙ্গলজনক। 

About

Popular Links