Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রাজনৈতিক দলে এখনও পিছিয়ে নারীরা

  • রাজনীতিতে আসা নারীদের পেছনে ফেলতে তাদের চরিত্র হরণ করা হয়
  •  নারী রাজনৈতিক কর্মীর অবস্থান ভালো হলেও তৃণমূল থেকে উচ্চপর্যায়ে সেই তথ্য পৌঁছে না
  • নারীকে সমতায় আনতে হলে কিছু সক্রিয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে
আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২৪, ০৩:৩৫ পিএম

রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও নারী নেতৃত্বে অংশগ্রহণ কম। বড় দুই দল ছাড়াও বাম রাজনৈতিক দলগুলোও লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। ২০২০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলের সব কমিটিতে ৩৩% নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কোটা এখনও পূরণ হয়নি। 

নতুন করে ২০৩০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলের সকল কমিটিতে এক-তৃতীয়াংশ নারীর অন্তর্ভুক্তকরণেও নেই তেমন দৃশ্যমান কার্যক্রম।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য জারা জেবিন মাহবুব দীর্ঘ দিন ধরে রাজনীতি করেন। এর পরও পুরুষের সমান তালে নারীরা এগিয়ে যেতে পারে না বলে তিনি মনে করেন।

জারা জেবিন বলেন, “এলাকায় পুরুষের চেয়ে নারীর কার্যক্রম কম নয়। অথচ শুধু পুরুষের নাম ফলাও করে প্রচার করা হয়। নারী রাজনৈতিক কর্মীর অবস্থান ভালো হলেও তৃণমূল থেকে উচ্চপর্যায়ে সেই তথ্য পৌঁছে না। নারীরা মাঠে সমান শ্রম দিলেও নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকেন পুরুষ। নির্বাচনি প্রচারের খবরেও পুরুষদের কথাই বেশি তুলে ধরা হয়। তার মতে নির্বাচনে নারীদের মনোনয়ন পাওয়ার বড় বাধা পুরুষ, পেশিশক্তি ও অর্থের দাপট।”

এক-তৃতীয়াংশ নারী নেতৃত্বের বাস্তবায়ন কতদূর?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮ সালে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এক-তৃতীয়াংশ নারীর প্রতিনিধিত্ব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কী ব্যবস্থা নিয়েছে সে ব্যাপারে জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু ৪০টি দলের মধ্যে মাত্র ১০টি দল এ সংক্রান্ত তথ্য দেয়।

এতে দেখা যায়, কেবল গণফ্রন্ট তাদের নেতৃত্বে ৩৩% নারী প্রতিনিধি থাকার কথা জানায়। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের ৮১ জনের মধ্যে ১৫ জন নারী, শতকরা হারে তা ১৮%। সংসদে দলের সরাসরি আসনে বিজয়ী ২০ জন নারী রয়েছেন।

বড় দলগুলোর কর্মসূচিতে সামনের সারিতে অংশগ্রহণ নেই নারীর/ফাইল ছবি/ঢাকা ট্রিবিউন

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কেন্দ্রীয় কমিটিতে সদস্য সংখ্যা ৫০২ জন। এর মধ্যে নারী ৬৯ জন বা ১৩.৭০%। সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে সদস্য আছেন ৩৬৫ জন। তাদের মধ্যে নারী সদস্য ৪৫ জন। ১২.৩২%। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলের অবস্থা প্রায় একই রকম। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যার নারী রাজনৈতিক দলগুলোতে আছেন সংখ্যালঘু হয়ে।

অন্যান্য দলের মধ্যে সিপিবিতে ১৩.৩৩%, জাসদে ১১.৯২% নারী নেতৃত্ব রয়েছে।

২০২০ সালের এক হিসেবে দেখা যায়, বাসদ, গণতন্ত্রী পার্টি ও সাম্যবাদী দলে নারী নেতৃত্ব শূন্যের কোটায়। বাসদের কংগ্রেসে ১৪ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে তিনজন নারীকে যুক্ত করা হয়েছে। শতকরা হিসেবে তা ২১৪%।

দলগুলোর পদক্ষেপ

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশে যথেষ্ট নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদ থেকে সর্বত্র নারীরা ক্ষমতায়িত হয়েছে। বাংলাদেশ এখন নারীর ক্ষমতায়নে একটি আদর্শ মডেল।”

শতকারে হারে এত কম কেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “বড় দল হওয়ায় সবাইকেই জায়গা দিতে হয়। নির্বাচন কমিশনের যে ৩৩%-এর কথা বলা হয়েছে আগামী কাউন্সিলে তা পূরণের চেষ্টা করব আমরা।”

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে প্রচারণা সমাবেশে কর্মীরা/প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ন মহাসচিব হারুনুর রশিদ ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি, সকল পর্যায়ে যতটুকু সম্ভব নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে। তবে দুর্যোগ মোকাবিলা, প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যবেক্ষণের জন্য গঠিত কমিটিসহ ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে নারীদের অতটা যুক্ত করা যায় না। কেউ এ ব্যাপারে আগ্রহও দেখায় না। বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির ১৯ পদের মধ্যে এই মুহূর্তে নারী সদস্য মাত্র দুজন। বিএনপির চেয়ারপারসনের ৭৩ সদস্য বিশিষ্ট উপদেষ্টা পরিষদে নারী মাত্র ছয়জন। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে ভাইস চেয়ারম্যান পদ ৩৫টি। এর মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র দুজন।”

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি শাহ আলম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমাদের প্রচেষ্টা আছে কিন্তু নারী নেতৃত্ব অগ্রগতিতে আমরা সন্তুষ্ট নই। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, ধর্মীয় অবস্থান ও পারিবারিক কাঠামো সবকিছুই নারীর রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বর পথে অন্তরায়। তারপরও নারীরা ক্ষমতায়িত হয়েছেন সিপিবিতে।”

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ওয়ার্কার্স পার্টিতে শীর্ষ পর্যায়ে ১৫ জনের মধ্যে একজন নারী। কেন্দ্রীয় কমিটিতে ৭৫ জনের মধ্যে আট জন নারী। ’৯০-এর পর থেকে বাম রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে দুই বড় দলে নারীর সংখ্যা বেড়েছে। তবে নেতৃত্বে আসতে পারছেন না।”

বাধা কোথায়

রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড শান্তনু মজুমদার ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “রাজনীতিতে আসা নারীদের পেছনে ফেলতে তাদের চরিত্র হরণ করা হয়। যেভাবে চলছে সেভাবে নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে না।”

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই অধ্যাপক আরও বলেন, “নারী নেতৃত্বের সংকট একটি বিশ্বময় সমস্যা। পিতৃতান্ত্রিক বাংলাদেশে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের প্রধান তিন দলের নেতৃত্বে নারী থাকলেও শুধু আওয়ামী লীগের সভাপতি ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। কিন্তু অন্যদের রাজনীতিতে প্রবেশ স্বামীর পথ ধরে। তারা নিজেদের মতো করে রাজনীতিতে জায়গা করে নিয়েছেন। তবে নারী নেতৃত্ব বিকাশে যে গণতান্ত্রিক চর্চা তা গড়ে ওঠেনি।”

আওয়ামী লীগের শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশে নারীর অংশগ্রহণ/সংগৃহীত

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, “নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে সংসদে যে রিজার্ভ সিট আছে, সেখানে আমরা সরাসরি নির্বাচন চাইলাম। সেখানে সরাসরি নির্বাচন না দেওয়া, সবকিছু মিলিয়ে এগুলো নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করবে। নারীর ক্ষেত্রে আমাদের যে অর্জন, সেগুলো সংরক্ষণ করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করতে না পারলে এটা সংরক্ষিত হবে না।”

তিনি বলেন, “নারীকে সমতায় আনতে হলে কিছু সক্রিয় পরিকল্পনা নিয়ে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা আছে। বাস্তবায়নের ক্ষেত্র সক্রিয় হচ্ছে বলে মনে হয় না। প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে নারী তার যোগ্যতা ও দক্ষতা নিয়ে যতটুকু পারছে এগোচ্ছে। রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা আরও বাড়ানো উচিত। তাহলে লিঙ্গ অসমতা দূর হবে। না হলে আজকে আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে আছি, আগামীতে হয়তো এই স্থানও হারাব।”

এই নারী সংগঠক আরও বলেন, “বর্তমানে সংসদ ৭০ জন নারী সংসদ সদস্য আছেন যাদের মধ্যে ২০ জন সরাসরি নির্বাচিত। শুধু ভোটের সময় নয়, সবসময় দল ও ভোটারের সঙ্গে নারী নেত্রীদের সম্পর্ক ভালো রাখতে হবে।”

   

About

Popular Links

x