Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

আখতার: বিচার, সংস্কার ও গণপরিষদ নির্বাচনের পর সংসদ নির্বাচন চায় এনসিপি 

জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেনের বিশেষ সাক্ষাৎকার

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২৫, ০৮:৫৬ পিএম

আখতার হোসেন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আইন বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী ছিলেন সর্বশেষ ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক। তিনি ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে অনশন করে দেশব্যাপী পরিচিতি পেয়েছিলেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছিল তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সম্প্রতি আখতার হোসেনের সঙ্গে ঢাকা ট্রিবিউনের তানভীর হাসান চলমান বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কথা বলেছেন।

ঢাকা ট্রিবিউন: মানুষ এনসিপিকে অন্য দল থেকে কেন আলাদাভাবে দেখবে?

আখতার হোসেন: বাংলাদেশে জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রত্যাশা থেকেই এনসিপির উত্থান হয়েছে। বাংলাদেশে নানা ধরনের রাজনৈতিক দল রয়েছে। আমরা ডানপন্থী বা বামপন্থি ধারার বাইরে এসে একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারা সূচনা করেছি। বাংলাদেশের রাজনীতিকে পূর্বের মতো চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির আবর্তে আবদ্ধ না রেখে, আমরা নীতিনির্ভর রাজনীতি করার প্রতিজ্ঞা করেছি। বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এনসিপি কাজ করে যাচ্ছে। এই সকল বৈশিষ্ট্যের কারণেই মানুষ আমাদেরকে অন্যান্য দল থেকে আলাদা করে দেখবে।

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনাদের দলে অভিজ্ঞদের যুক্ত করার কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

আখতার হোসেন: জাতীয় নাগরিক পার্টিতে তারুণ্যের একটি জাগরণ ঘটেছে, যা অন্য কোনো দলে দেখা যায় না। তবে এটিকে শুধু তরুণদের দল বলা ভুল হবে। আমরা সারাদেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে আমাদের দলে সংযুক্ত করার জন্য কার্যক্রম শুরু করেছি। আমাদের দলের জেলা কমিটিতে আমরা সিনিয়র সিটিজেনদের যুক্ত করার জন্য কাজ করছি। আমরা দলের একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করব, যেখানে সিনিয়র সিটিজেনদের প্রাধান্য থাকবে। আমাদের ভবিষ্যৎ বর্ধিত কমিটিতেও সিনিয়র সিটিজেনরা উপস্থিত থাকবেন। সবাইকে নিয়েই জাতীয় নাগরিক পার্টি ভবিষ্যতে তাদের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করবে।

ঢাকা ট্রিবিউন: এনসিপির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে খুব বেশি কর্মী-সমর্থক দেখা যাচ্ছে না, এর কারণ কী?

আখতার হোসেন: এনসিপি আত্মপ্রকাশের পর থেকেই মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ করা গেছে। মানুষের আগ্রহ ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনসিপি রয়েছে। আমরা দেখছি, মানুষ আমাদের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করে। তবে আমরা স্বীকার করি, বর্তমানে আমাদের দলের জনপ্রিয়তা মূলত শহরের তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা কাজ করে যাচ্ছি, এবং খুব দ্রুতই সারাদেশে আমাদের কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে পারব বলে আশা করছি।

ঢাকা ট্রিবিউন: নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করতে আপনাদের দল কীভাবে কাজ করছে?

আখতার হোসেন: নিবন্ধনের জন্য ২২টি জেলা ও ১০০টি উপজেলা কমিটি ও অফিস স্থাপনের বাধ্যতামূলক শর্ত রয়েছে। আমরা আমাদের সংগঠনকে সারাদেশে বিস্তার করার লক্ষ্যে অঞ্চলভিত্তিক কমিটি গঠন করেছি। যারা এই দায়িত্ব পেয়েছেন, তারা সাংগঠনিকভাবে খুবই কার্যকরভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল শর্ত পূরণ করে আবেদন করব।

ঢাকা ট্রিবিউন: বাংলাদেশের বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আপনাদের মূল্যায়ন কী?

আখতার হোসেন: ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগে খুবই ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। বর্তমানে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। পুলিশ বাহিনী উশৃঙ্খল জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে বলে আমরা দেখতে পাচ্ছি। যেখানে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে, সেখানে পুলিশ প্রশাসন সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছে। অনেককে গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। তবে আমরা দেখতে পাই, পুলিশের ভেতরে এখনো আগের সরকারের সুবিধাভোগী অনেকেই রয়ে গেছেন। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাবো- দ্রুত সময়ের মধ্যে পুলিশ সংস্কার করতে হবে। পুলিশকে শাসকের বাহিনী নয়, জনগণের সেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

ঢাকা ট্রিবিউন: ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন না হলে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে বলে বিএনপি দাবি করছে। এই বিষয়ে এনসিপির বক্তব্য কী?

আখতার হোসেন: আমরা মনে করি, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন না হলে বিশৃঙ্খলা হবে- এমন ধারণা সঠিক নয়। বর্তমানে দেশের সার্বিক অবস্থা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যদি রাজনৈতিক দলগুলো সহনশীল থাকে, তাহলে সরকার খুব শিগগিরই বিচার ও সংস্কার শেষ করে একটি নির্বাচনের দিকে এগোতে পারবে। আমরা দেশকে একটি অস্থিতিশীল অবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়ার মতো কোনো আশঙ্কা দেখছি না।

ঢাকা ট্রিবিউন: এনসিপি ঠিক কখন নির্বাচন চায়?

আখতার হোসেন: অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের কিছু দাবি রয়েছে- যেমন, জুলাই গণহত্যার বিচার, সংস্কার এবং গণপরিষদ নির্বাচন। আমরা চাই, এসব দাবি পূরণ করার পরই নির্বাচন আয়োজন করা হোক। আমরা মনে করি, সরকার ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে এসব কাজ সম্পন্ন করে নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে।

ঢাকা ট্রিবিউন: আগামী নির্বাচন নিয়ে এনসিপির পরিকল্পনা কী?

আখতার হোসেন:  জাতীয় নাগরিক পার্টি তাদের স্বাতন্ত্র বজায় রেখে সংগঠনকে দেশব্যাপী বিস্তৃত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের নির্বাচনি জোট নতুন কিছু নয়। নির্বাচনের সময় এলে, আমরা দলের ভেতরে আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।

ঢাকা ট্রিবিউন: বাংলাদেশে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে এনসিপি কীভাবে দেখে?

আখতার হোসেন: বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান করছে এবং আমাদের আয়তন সীমিত। বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো অবস্থানে আমরা নেই। তবে, আমরা চাই- যেসব পরাশক্তির স্বার্থ এই অঞ্চলে রয়েছে, সেসব দেশের প্রভাবক হিসেবে থাকতে পারি। ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে সম্পর্ক উন্নয়নের পক্ষেই আমরা।

ঢাকা ট্রিবিউন: ভারতের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক চায় এনসিপি?

আখতার হোসেন: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে একটি দলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে, যা এক ধরনের অধীনতা সৃষ্টি করেছে। আমরা চাই, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ন্যায্যতার ভিত্তিতে একটি মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠুক। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে এবং আমরা আমাদের পানির ন্যায্য হিস্যা চাই। বর্তমানে আমরা দেখছি, ভারতের কিছু গণমাধ্যম বাংলাদেশ নিয়ে মিথ্যা তথ্য প্রচার করছে। আমরা ভারত সরকারের কাছে আহ্বান জানাবো, তারা যেনো এসব তথ্য প্রচার বন্ধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও শেখ হাসিনা ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশবিরোধী উস্কানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন। বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। আমরা চাই, ভারত সরকার তাকে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের কাছে হস্তান্তর করুক। আমরা প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সঙ্গে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও সমান সম্পর্ক চাই।

ঢাকা ট্রিবিউন: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যে সহিংসতা চলছে, তার প্রভাব বাংলাদেশে পড়তে পারে বলে মনে করেন কি?

আখতার হোসেন: ইতোমধ্যে রাখাইনে সহিংসতার কারণে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে এসেছে। সেখানে যদি নতুন করে একটি রাষ্ট্র গড়ে ওঠে, তাহলে আমাদের তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। আমরা চাই, মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গারা নিরাপদে নিজেদের দেশে ফিরে যাক এবং তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হোক। এই লক্ষ্যে আমরা কাজ করব।

   

About

Popular Links

x