ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে ফুটবলের নকশা ও প্রযুক্তিতে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ১৯৩০ সালের ভারী, হাতে সেলাই করা চামড়ার বল থেকে শুরু করে আজকের বলগুলো হয়ে উঠেছে উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন ও পরিবেশবান্ধব। এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ১৯৭০ সালে টেলিভিশনে বল স্পষ্ট দেখানোর জন্য আসে ‘অ্যাডিডাস টেলস্টার’, ২০০৬ সালে সেলাইবিহীন বল তৈরিতে যুক্ত হয় ‘থার্মাল বন্ডিং’ প্রযুক্তি এবং বর্তমানে রেফারিদের নিখুঁত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যবহৃত হচ্ছে এআই-চালিত ডেটা প্রযুক্তি। চলুন জেনে আসা যাক ফিফা বিশ্বকাপে ব্যবহৃত ফুটবলের ঐতিহাসিক বিবর্তন -
ভারী চামড়ার যুগ (১৯৩০-১৯৬৬)
শুরুর দিকের বিশ্বকাপ ফুটবলগুলো ছিল অমসৃণ এবং ওজনে ভারী। চামড়া দিয়ে তৈরি এই বলগুলোর ভেতরে থাকা ব্লাডার আটকে রাখতে তুলোর মোটা ফিতে বা লেস ব্যবহার করা হতো। বৃষ্টির দিনে বলগুলো পানি শুষে নিয়ে ওজনে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেত, যা দিয়ে হেড করতে গিয়ে ফুটবলাররা প্রায়ই ‘কনকাশনের’ (হঠাৎ মাথায় ঝাঁকুনি) শিকার হতেন।
বলের আকার ও আকৃতি যে খেলায় কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারে, তার একটা বড় উদাহরণ হলো ১৯৩০ সালের বিশ্বকাপের ফাইনাল। যেখানে আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে দুই দলই তাদের দেশের তৈরি বলে খেলতে চায়। পরে টসের মাধ্যমে প্রথমার্ধে খেলা হয় আর্জেন্টিনার বল দিয়ে, আর পরের অর্ধে উরুগুয়ের বল দিয়ে। প্রথমার্ধ শেষে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও পরে ৪-২ গোলে ম্যাচ হারে আর্জেন্টিনা। পরিচিত বলের জন্যই হয়তো বা এমন হয়।
এরপর ১৯৩৪ সালে ইতালিতে ‘ফেদেরালে ১০২’ এবং ১৯৩৮ সালে ফ্রান্সে ‘অ্যালেন’বল দিয়ে খেলা হয়। ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে ব্যবহৃত ‘সুপারবল ডুপ্লো টি’ ছিল বাইরে কোনো ফিতে বা লেস ছাড়া প্রথম ফুটবল। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে সুইজারল্যান্ডে ‘সুইস ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন’ এবং ১৯৫৮ সালে সুইডেনে ‘টপ স্টার’ ব্যবহার করা হয়। ১৯৬২ সালে চিলি বিশ্বকাপের ‘মিস্টার ক্র্যাক’ বলটিতে প্রথম ল্যাটেক্স ভালভ (প্রাকৃতিক রাবার থেকে তৈরি) ব্যবহার করা হয়, যা বলের গোলাকৃতি দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখতে সাহায্য করতো। এই যুগের শেষ বলটি ছিল ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে ব্যবহৃত ‘চ্যালেঞ্জ ৪-স্টার’।
টেলস্টার ও দৃশ্যমানতার বিপ্লব (১৯৭০-১৯৮২)
১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রথম অফিসিয়াল বল সরবরাহের দায়িত্ব পায় জার্মানিভিত্তিক বহুজাতিক স্পোর্টস ব্র্যান্ড অ্যাডিডাস। সাদা-কালো টেলিভিশনের পর্দায় দর্শকরা যাতে বলের গতিবিধি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন, সেজন্য তারা ৩২ প্যানেলের আইকনিক সাদা-কালো ‘টেলস্টার’ (টেলিভিশন স্টার) বল বাজারে আনে। চামড়ার তৈরি এই বলগুলোতে কাদা বা পানি নিরোধক হিসেবে ‘ডিউরালাস্ট’ কোটিং ব্যবহার করা শুরু হয়।
১৯৭৪ সালে পশ্চিম জার্মানিতে আসে ‘টেলস্টার ডিউরালাস্ট’, যাতে পলিইউরেথেন কোটিং যুক্ত করা হয়েছিল। এরপর ১৯৭৭ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপে ‘ট্যাঙ্গো’ বলটির নকশায় ২০টি প্যানেলের ‘ট্রায়াড’ ডিজাইন আনা হয়। এই নান্দনিক নকশা পরবর্তী ২০ বছর ফুটবলের প্রধান টেমপ্লেট হিসেবে অনুসরণ করা হয়েছে। এই যুগের শেষ বল হিসেবে ১৯৮২ সালে স্পেনে ব্যবহৃত হয় ‘ট্যাঙ্গো এসপানা’।
সিন্থেটিক যুগ (১৯৮৬-২০০২)
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ব্যবহৃত ‘আজতেকা’ ছিল ইতিহাসের প্রথম সম্পূর্ণ সিন্থেটিক ম্যাচ বল। চামড়া বাদ দিয়ে পলিইউরেথেন ব্যবহারের ফলে বলটি পুরোপুরি ওয়াটারপ্রুফ হয়ে ওঠে এবং এর স্থায়িত্ব ও গতি বৃদ্ধি পায়। ১৯৯০ সালে ইতালিতে খেলা হয় ‘এত্রুস্কো ইউনিকো’ দিয়ে। এরপর ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘কুয়েস্ট্রা’ বলটিতে পলিস্টাইরিন ফোমের স্তর ব্যবহার করায় এটি পায়ের স্পর্শে অনেক নরম অনুভূত হতো এবং এর গতিও বেড়ে গিয়েছিল।
১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে ‘ত্রিকোলোর’ বলের মাধ্যমে ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী সাদা-কালো রঙের অবসান ঘটে। ফ্রান্সের পতাকার আদলে তৈরি এটিই ছিল প্রথম রঙিন ম্যাচ বল। এরপর ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বিশ্বকাপে ‘ফিভারনোভা’ বলটি বর্ণিল ত্রিকোণাকার এশিয়ান সংস্কৃতির অনুপ্রেরণায় তৈরি হয়ে প্রথাগত নকশাকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়।
ডিজিটাল ও অ্যারোডাইনামিক যুগ (২০০৬-২০২২)
আধুনিক ফুটবলে এখন যুক্ত হয়েছে অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছোঁয়া। ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে ‘টিমজিস্ট’ বলের মাধ্যমে অ্যাডিডাস সেলাইয়ের প্রথা ভেঙে ‘থার্মাল বন্ডিং’ বা তাপীয় জোড়া লাগানোর প্রযুক্তি শুরু করে, যা বলের উপরিভাগ সম্পূর্ণ মসৃণ করে তোলে। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘জাবুলানি’, ২০১৪ সালে ব্রাজিলে ‘ব্রাজুকা’ এবং ২০১৮ সালে রাশিয়ায় ‘টেলস্টার ১৮’ ব্যবহৃত হয়। ব্রাজুকা ও টেলস্টার ১৮-এ প্যানেলের সংখ্যা ৩২ থেকে কমিয়ে মাত্র ৬-এ নামিয়ে আনা হয়, যা বাতাসের মধ্যে বলের উড্ডয়ন স্থিতিশীলতাকে আরও উন্নত করে।
বর্তমান যুগ (২০২৬)
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ‘আল রিহলা’ এবং ২০২৬ সালের আসরের ‘ট্রিওন্ডা’ বল প্রযুক্তিকে একদম বদলে দিয়েছে।
এই বলগুলোতে ৫০০ হার্টজ ইনার্শিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট (আইএমইউ) সেন্সর চিপ যুক্ত করা হয়েছে। এই চিপটি প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার বলের প্রতিটি স্পর্শ ট্র্যাক করে রিয়েল-টাইম ডেটা সরাসরি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারিদের (ভিএআর) কাছে পাঠিয়ে দেয়, যার ফলে অফসাইডের মতো কঠিন সিদ্ধান্তগুলো এখন নিখুঁতভাবে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।



