Sunday, August 09, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ছেলের জন্য দেশ ছেড়েছিলেন, ইনজেকশনের খরচ জোগাড় করেছিলেন-মেসির বাবার অজানা গল্প

রোজারিওতে ৬৮ বছর বয়সে থেমে গেছে হোর্হে মেসির হৃৎস্পন্দন, থেমে গেছে নীরব এক অধ্যায়ও

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০৬ এএম

রোজারিওর মালভিনাস মাঠে বিকেলের আলোয় গ্যালারির ধারে দাঁড়িয়ে থাকতেন এক লোক, চোখ থাকত মাঠের কোণে বল নিয়ে ছুটে বেড়ানো একরত্তি ছেলেটার দিকে। তিন দশক ধরে বদলেছে শুধু মাঠ, বদলায়নি লোকটার অবস্থান ছেলের পেছনে ছায়ার মতো থাকা। সেই ছায়া এবার চিরতরে সরে গেছে। রোজারিওতে ৬৮ বছর বয়সে থেমে গেছে হোর্হে মেসির হৃৎস্পন্দন, আর তার সঙ্গে থেমে গেছে ফুটবল ইতিহাসের নীরব এক অধ্যায়ও।

হোর্হে হোরাসিও মেসি নিজেও একসময় নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের যুবদলে বল নিয়ে দৌড়াতেন, কিন্তু সামরিক চাকরির বাধ্যবাধকতায় সেই স্বপ্ন থেমে যায়। রাসায়নিক প্রযুক্তিবিদ্যা পড়ে আশির দশকে যোগ দেন আকিন্দার ইস্পাত কারখানায়, বছরের পর বছর পরিশ্রমে হয়ে ওঠেন ব্যবস্থাপক।

ছেলে বল নিয়ে খেলতে শেখার পরই হোর্হে বুঝেছিলেন, এই ছেলে আলাদা। কিন্তু ১০ বছর বয়সেও লিওনেলের উচ্চতা না বাড়ায় ডাক্তার দেখানো হলে জানা যায়, তার শরীরে বেড়ে ওঠার জরুরি একটি হরমোন তৈরি হচ্ছে না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছিল মাসে দেড় হাজার ডলারের বিশেষ ইনজেকশন, যা মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বিশাল খরচ। কারখানার সহায়তা নিজের সঞ্চয় দিয়ে শুরুতে খরচ জোগাড় করলেও পরে তা কঠিন হয়ে ওঠে। নিওয়েলস ক্লাবও এত ছোট একজনের পেছনে বিনিয়োগে রাজি হয়নি।

২০০০ সালে মেসির ড্রিবলিং দক্ষতার একটি ভিডিও ঘুরে-ঘুরে পৌঁছায় বার্সেলোনার সাবেক খেলোয়াড় ক্লাবকর্তা রেশাকের কাছে। তিনি সরাসরি মেসিকে দেখতে চাইলে বাবা-ছেলে প্রথমবার উড়োজাহাজে চেপে পাড়ি জমান স্পেনে। বার্সেলোনায় প্রথম অনুশীলনেই নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করেন কিশোর মেসি, তবে চুক্তি চূড়ান্ত হতে দেরি হচ্ছিল। একপর্যায়ে অধৈর্য হয়ে পড়া বাবাকে ধরে রাখতে রেশাক এক ন্যাপকিনে লিখে দেন চুক্তির প্রতিশ্রুতি যা বদলে দেয় ফুটবল ইতিহাসের গতিপথ।

বার্সেলোনার প্রথম দিনগুলো ছিল কঠিন অচেনা ভাষা, বন্ধুহীন জীবন, পরিবার থেকে দূরে থাকা। ২০০৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে মেসি নিজেই বলেছিলেন, বাবা-ছেলে দুজনেই একা ঘরে কাঁদতেন, কিন্তু একে অপরের সামনে তা প্রকাশ করতেন না। একদিন বাবা জিজ্ঞেস করেছিলেন থাকতে চান কি না, ছোট্ট লিও 'হ্যাঁ' বলায় বাবাও থেকে যান পাশে।

চৌদ্দ বছর বয়সে ছেলের এজেন্ট হয়ে ওঠেন হোর্হে, আর এই দায়িত্ব পালন করে যান জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বার্সার চুক্তি নবায়ন থেকে পিএসজি হয়ে ইন্টার মায়ামি পর্যন্ত প্রতিটি বাঁকে থেকেছেন ছেলের পাশে, অথচ নিজে থেকেছেন প্রচারের আড়ালে।

চলতি বিশ্বকাপে মেসি বাবার অনুপস্থিতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল আগে থেকেই। প্রথম ম্যাচে গোল করে কেঁদে ফেলা মেসি পরে জানিয়েছিলেন, খেলার বাইরে কঠিন কিছু সময় পার করছেন তিনি। পরিবার তখন এক বিবৃতিতে বলেছিল, হোর্হে চিকিৎসাধীন এবং সুস্থ হয়ে উঠছেন কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।

ফুটবল ইতিহাস মনে রাখবে লিওনেল মেসির নাম আর তার অর্জনের কথা। তবে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তারা জানেন সেই যাত্রার প্রথম নীরব সাক্ষী ভরসার জায়গা ছিলেন একজন বাবা, যিনি নিজের স্বপ্ন-দেশ-স্বস্তি ছেড়ে ছেলের হাত ধরে হেঁটেছিলেন অনিশ্চয়তার পথে।

   

About

Popular Links

x