উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নকআউট পর্বে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের কথা বললেই সবার আগে আসবে রিয়াল মাদ্রিদের নাম। গত মৌসুমে রেকর্ড চতুর্দশ শিরোপা জয়ের পথে শেষ ষোলোয় পিএসজি এবং সেমিফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে প্রথম লেগে পিছিয়ে থেকেও পরের পর্বে ওঠে স্প্যানিশ পরাশক্তিরা।
বিপরীতে প্রথম লেগে এগিয়ে থেকেও চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নকআউট পর্ব থেকে রিয়াল মাদ্রিদের বিদায় নেওয়ার নজির খুবই কম। এই প্রতিযোগিতায় ১৮ বারই প্রথম লেগে দুই বা তিন গোলের ব্যবধানে জিতে পরের পর্বে উতরে গেছে লস ব্লাঙ্কোসরা।
২০২২-২৩ মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শেষ আটের প্রথম লেগে রিয়াল মাদ্রিদের কাছে ০-২ গোলে হেরেছে চেলসি। সেমিফাইনালের টিকেট পেতে মঙ্গলবার (১৮ এপ্রিল) ঘরের মাঠ স্টামফোর্ড ব্রিজে তাই নতুন ইতিহাস গড়তে হবে ব্লুজদের।
তবে প্রথম লেগে এগিয়ে থেকেও চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নকআউট পর্ব থেকে রিয়াল মাদ্রিদের ছিটকে যাওয়ার নজির আছে। নিচের দৃষ্টান্তগুলো থেকে তাই ইংলিশ ক্লাবটি অনুপ্রেরণা নিতে পারে-
১৯৯৫-৯৬ (জুভেন্টাস)
১৯৯৫-৯৬ মৌসুমে দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতে জুভেন্টাস। সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়েছিল তারা। ঘরের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে প্রথম লেগে রাউল গঞ্জালেসের একমাত্র গোলে ইতালিয়ান ক্লাবটিকে ১-০ ব্যবধানে হারায় রিয়াল। তবে ফিরতি লেগে ক্লাবের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো আর মিশেল পাদোভানোর গোলে স্প্যানিশ ক্লাবটিকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে দুই লেগ মিলিয়ে ২-১ গোলের অগ্রগামিতায় সেমিফাইনালে পা রাখে তুরিনের বুড়িরা।
২০০২-০৩ (জুভেন্টাস)
এবারেও রিয়াল মাদ্রিদের হন্তারক জুভেন্টাস। এবার অবশ্য দুই ক্লাব মুখোমুখি হয়েছিল সেমিফাইনালে। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে প্রথম লেগে দুই ব্রাজিলিয়ান রোনালদো এবং রবার্তো কার্লোসের গোলে জুভেন্টাসকে ২-১ ব্যবধানে হারায় লস ব্লাঙ্কোসরা। ইতালিয়ান ক্লাবটির পক্ষে একমাত্র গোলটি করেন ডেভিড ত্রেজেগে। তুরিনে ফিরতি লেগে ত্রেজেগে, দেল পিয়েরো এবং সেই বছরের ব্যালন ডি অর জেতা পাভেল নেদভেদের গোলে একপর্যায়ে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ইতালিয়ান পরাশক্তিরা। শেষদিকে জিনেদিন জিদান রিয়ালের পক্ষে একটি গোল করলেও তা যথেষ্ট হয়নি। দুই লেগ মিলিয়ে ৪-৩ গোলের অগ্রগামিতায় ফাইনালে পৌঁছে যায় জুভেন্টাস।
২০০৩-০৪ (এএস মোনাকো)
সেবারের কোয়ার্টার ফাইনালে এএস মোনাকোর বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল রিয়াল মাদ্রিদ। ঘরের মাঠে প্রথম লেগে ইভান হেলগুয়েরা, জিদান, লুই ফিগো এবং রোনালদোর গোলে ৪-২ গোলে জয় পায় ইউরোপের সফলতম দলটি। প্রথম লেগে স্কিলাচ্চি এবং ফার্নান্দো মরিয়েন্তেস গোল করে ফরাসি ক্লাবটিকে লড়াইয়ে রাখেন। ফ্রান্সে ফিরতি লেগে প্রথমে রাউলের গোলে স্প্যানিশরা এগিয়ে গেলেও মধ্যবিরতির আগে ভিনসেন্ট গুইলির গোলে সমতায় ফিরে আসে মোনাকো। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে মরিয়েন্তেস এবং পরে গুইলির গোলে ৩-১ ব্যবধানে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে মোনাকো। দুই লেগ মিলিয়ে ৬-৬ গোলের সমতা থাকলেও অ্যাওয়ে গোলের সুবিধায় পরের পর্বে চলে যায় ফরাসি ক্লাবটি। আর দুই লেগেই গোল করে রিয়ালের সামনে আততায়ীর ভূমিকায় আবির্ভূত হন মোনাকোতে ধারে যাওয়া তাদের ঘরের ছেলে মরিয়েন্তেস। প্রথম লেগে দুই গোলের ব্যবধানে জিতেও পরের পর্বে এই একবারই পা রাখতে ব্যর্থ হয় রিয়াল।
২০০৪-০৫ (জুভেন্টাস)
এক মৌসুমের বিরতি দিয়ে আবারও জুভেন্টাসের ফাঁদে কাটা পড়ে রিয়াল মাদ্রিদ। দুই ইউরোপীয় পরাশক্তি এবার পরস্পরের মুখোমুখি হয় শেষ ষোলোতেই। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে প্রথম লেগে হেলগুয়েরার একমাত্র গোলে ইতালিয়ান ক্লাবটিকে ১-০ ব্যবধানে হারায় লস ব্লাঙ্কোসরা। তুরিনে ফিরতি লেগে জুভেন্টাসের ডেভিড ত্রেজেগের গোলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। চার মিনিট বাকি থাকতে মার্সেলো জালায়েতার গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে জুভেন্টাস। ফলে দুই লেগ মিলিয়ে ২-১ গোলের অগ্রগামিতায় কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখে তুরিনের বুড়িরা।
২০০৬-০৭ (বায়ার্ন মিউনিখ)
ওই মৌসুমের শেষ ষোলোয় ইউরোপিয়ান ক্লাসিকোয় মুখোমুখি হয় রিয়াল মাদ্রিদ ও বায়ার্ন মিউনিখ। ন্তিয়াগো বার্নাব্যুতে প্রথম লেগে রাউলের জোড়া গোল এবং রুড ভ্যান নিস্টলরয়ের লক্ষ্যভেদে ৩-২ গোলে জয় পায় স্প্যানিশ ক্লাবটি। তবে লুসিও এবং মার্কো ভ্যান বোমেলের করা দুই অ্যাওয়ে গোলে লড়াইয়ে ভালোমতোই টিকে ছিল বাভারিয়ানরা। অ্যালিয়াঞ্জ অ্যারেনায় মাত্র ৯ সেকেন্ডে রিয়ালের জালে বল জড়িয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে দ্রুততম গোল করেন ম্যাকে। পরে লুসিওর গোলে ব্যবধান দ্বিগুণ করে জার্মান ক্লাবটি। শেষদিকে পেনাল্টি থেকে নিস্টলরয়ের গোলে ব্যবধান কমলেও রিয়াল হার এড়াতে পারেনি। দুই লেগ মিলিয়ে ৪-৪ গোলের সমতা থাকলেও অ্যাওয়ে গোলের সুবিধায় পরের পর্বে চলে যায় বায়ার্ন।
২০১৮-১৯ (আয়াক্স)
২০১৮-১৯ মৌসুমের শেষ ষোলোয় চারবারের চ্যাম্পিয়ন আয়াক্সকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ। নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডামে প্রথম লেগে করিম বেনজেমা এবং মার্কো অ্যাসেন্সিওর গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় পায় লস ব্লাঙ্কোসরা। তবে প্রথম লেগে নিজের ৬০০তম ম্যাচে ইচ্ছেকৃতভাবে হলুদ কার্ড দেখে নিষিদ্ধ হন অধিনায়ক সার্জিও রামোস। ঘরের মাঠে দ্বিতীয় লেগে ডাচ ক্লাবটির সামনে তাই টিকতে পারেনি রিয়াল। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে স্প্যানিশ পরাশক্তিদের ৪-১ গোলে এবং দুই লেগ মিলিয়ে ৫-৩ গোলে হারিয়ে শেষ আটের টিকেট পায় আয়াক্স।



