গত মৌসুম রিয়াল মাদ্রিদের ভালো যায়নি একদমই। লা লিগায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার চেয়ে ১০ পয়েন্ট পেছনে থেকে মৌসুম শেষ করতে হয়েছে। স্প্যানিশ সুপার কাপের ফাইনালে বার্সার কাছেও ধরাশায়ী হয় লস ব্ল্যাঙ্কোসরা। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালেও ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে নাস্তানাবুদ হতে হয়।
২০২৩-২৪ মৌসুমটা তাই রিয়াল মাদ্রিদের জন্য এক অর্থে ঘুরে দাঁড়ানোরই মিশন। শনিবার (১২ আগস্ট) অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের বিপক্ষে ২-০ গোলের জয় দিয়ে লা লিগা পুনরুদ্ধারের মিশন শুরু করে কার্লো অ্যানচেলত্তির শিষ্যরা।
এ মৌসুমে রিয়াল কেমন করবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে ইতোমধ্যে রিয়ালের জন্য কিছু অশনিসংকেত দেখা যাচ্ছে।
ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে নতুন উদ্যমে মাঠে নামতে যাওয়া রিয়াল মাদ্রিদ হঠাৎ করেই চোটের থাবায় ছিন্নভিন্ন। আগে থেকেই চোটের কারণে মাঠের বাইরে আছেন লেফটব্যাক ফার্ল্যান্ড মেন্ডি। এই ফরাসি ডিফেন্ডার বছর দুয়েক ধরেই চোটের সঙ্গে নিয়মিত যুদ্ধ করছেন। নতুন করে হাসপাতালের বিছানায় তার সঙ্গে জায়গা হয়েছে দুই বিশ্বস্ত-নির্ভরযোগ্য সৈনিক ও এক তরুণ তুর্কির।

গোলরক্ষক পজিশনটি নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই বেশ নির্ভার ছিল রিয়াল মাদ্রিদ। গোলবারের নিচে থিবো কর্তোয়া নিজেকে তর্কসাপেক্ষে সময়ের সেরা গোলরক্ষকের অবস্থানে নিয়ে গেছেন। আগামী কয়েক মৌসুমেও এই বেলজিয়ানকেই নিশ্চিতভাবে রিয়ালের গোলবারে দেখা যাবে এমনটাই আশা করছিলেন সবাই। তবে গত সপ্তাহেই বাম হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ায় ও অস্ত্রোপচারের টেবিলে যাওয়ায় অন্তত আগামী বছরের এপ্রিল পর্যন্ত মাঠের বাইরে থাকবেন ৩১ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক।
রিয়াল শিবিরে চোটের থাবা পড়েছে মৌসুমের প্রথম প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচেই। শনিবার অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের বিপক্ষে লা লিগায় নিজেদের প্রথম ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়কে ট্যাকল করতে গিয়ে হাঁটুতে চোট পান এডার মিলিটাও। ব্যথায় কাতর ব্রাজিলিয়ান সেন্টারব্যাক সঙ্গে সঙ্গেই মাঠ ছাড়েন। পরে জানা যায় কর্তোয়ার মতো তারও হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেছে। মাস ছয়েকের আগে ২৫ বছর বয়সী এ ডিফেন্ডারের মাঠে ফেরার সম্ভাবনা নেই।
চলমান দলবদলে বার্সেলোনার মুখ থেকে একরকম ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করেই আর্দা গুলারকে দলে টেনেছে রিয়াল মাদ্রিদ। ইতোমধ্যেই তুরস্কের মেসি হিসেবে বেশ নামডাক এ তুর্কি মিডফিল্ডারের। কিন্তু ফেনারবাখ থেকে ২০ মিলিয়ন ইউরোতে আনা ১৮ বছর বয়সী প্রতিভার মাঠের ফুটবলীয় নৈপুণ্য দেখার সৌভাগ্য হয়নি কারোই। গত মাসে হাঁটুতে চোট পাওয়া এ ফুটবলারকেও যেতে হবে শল্যবিদের ছুরির নিচে। কবে তাকে মাঠে দেখা যাবে, সেটিও অনিশ্চিত।
চোট ছাড়াও প্রয়োজনীয় পজিশনে উপযুক্ত খেলোয়াড় না থাকা নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছে রিয়াল। মূল রাইটব্যাক দানি কার্ভাহালের যোগ্য ব্যাকআপ বা জেনুইন কোনো রাইট উইঙ্গার না থাকায় দলের ডান প্রান্ত বলতে গেলে একরকম অকেজোই। কার্ভাহালের জায়গায় লুকাস ভাসকেজ আর রাইট উইংয়ে কখনো রদ্রিগো গোয়েস ও আবার কখনো ফেডেরিকো ভালভার্দেকে দিয়ে ঠেকার কাজ চালানো হচ্ছে।
রাইটব্যাক ছাড়াও লেফটব্যাক নিয়েও বেশ অস্বস্তিতে গত মৌসুম পার করেছে রিয়াল। ১৫ বছর পর মার্সেলোর বিদায় আর মেন্ডি অনিয়মিত থাকায় সেই পজিশনে খেলতে হয়েছে তরুণ এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গাকে, আদতে যিনি একজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার। বেনজেমা থাকায় দীর্ঘদিন ধরে নয় নম্বর নিয়ে নিশ্চিন্ত ছিল রিয়াল। তার বিদায়ে এবার স্ট্রাইকার পজিশন নিয়েও ভাবতে হচ্ছে লস ব্ল্যাঙ্কোসদের।
যদিও এসব পজিশনের ঘাটতি পূরণের জন্য দলবদলের বাজারে রিয়াল এবার খালি হাতে বসেছিল, তাও না। বরুশিয়া ডর্টমুন্ড থেকে ৬ বছরের জন্য প্রতিভাবান ইংলিশ মিডফিল্ডার জুড বেলিংহামকে দলে টানে স্প্যানিশ ক্লাবটি। তার আগেই বাই ব্যাক ক্লজ কাজে লাগিয়ে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ক্লাবের একাডেমির ফুলব্যাক ফ্রান গার্সিয়াকে। এছাড়া, স্ট্রাইকার হিসেবে আরেক একাডেমি গ্র্যাজুয়েট হোসেলু ও গোলরক্ষকের ভূমিকায় কেপা আরিজাবালাগাকে এক বছরের জন্য ধারে এনেছে রিয়াল।
তবে এই দলবদলগুলো আদৌ রিয়ালের জন্য যথেষ্ট হবে নাকি, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। হোসেলুকে তো বেনজেমার বিকল্প হিসেবে না, বরং মূল স্ট্রাইকারের ব্যাকআপ হিসেবে আনা হয়েছিল। রিয়ালের সেই মূল স্ট্রাইকার হতে পারতেন হ্যারি কেইন। টটেনহাম ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ায় ৩০ বছর বয়সী এই ইংলিশ স্ট্রাইকারের সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে আসার জোর সম্ভাবনা ছিল।
কিন্তু খোদ ক্লাব কর্তৃপক্ষ আগ্রহী না হওয়ায় আর কিলিয়ান এমবাপ্পের আগমনের সম্ভাবনা থাকায় হ্যারি কেইনের দিকে রিয়াল সেভাবে হাত বাড়ায়নি। সেই কেইন সম্প্রতি পাড়ি জমিয়েছেন বায়ার্ন মিউনিখে। অন্যদিকে, এমবাপ্পেও পিএসজির সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করবেন বলে জোর গুঞ্জন। সব মিলিয়ে দলে নেই কোনো গোলশিকারি স্ট্রাইকার, যা রিয়ালের মতো ক্লাবের ইতিহাসে বিরলতম নজিরই বলা যায়।
হোসেলু দলে থাকলেও তিনি বেনজেমার অভাব পুরোপুরি পূরণ করতে পারবেন, এমনটা বোধহয় খোদ ৩৩ বছর বয়সী স্ট্রাইকার নিজেও বিশ্বাস করবেন না। নিখাদ স্ট্রাইকারের অভাবে তাই চিরচেনা ৪-৩-৩ ফর্মেশন থেকে বেরিয়ে দলকে ৪-৪-২ ছকে সাজাতে পারেন অ্যানচেলত্তি। বর্ষীয়ান এ ইতালিয়ান কোচ প্রাক মৌসুমে তার ইঙ্গিত দিয়েছেন অনেকটাই। কিন্তু দল তাতে খাপ খাওয়াতে পারবে নাকি, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
বেনজেমার সঙ্গে একাধারে মার্কো অ্যাসেন্সিও, ইডেন হ্যাজার্ড, মারিয়ানো ডিয়াজের মতো ফরোয়ার্ডরা ক্লাব ছাড়ায় মৌসুম শুরুর আগে রিয়ালের জন্য বড় দুশ্চিন্তার জায়গা ছিল আক্রমণভাগ। কিন্তু সপ্তাহ খানেকের ব্যবধানে সেই জায়গা দখল করেছে রক্ষণভাগ। গেল মৌসুমে দলের রক্ষণভাগ একরকম ভঙ্গুরই ছিল। প্রাক মৌসুমেও চার ম্যাচে ৮ গোল হজম করেছে স্প্যানিশ ক্লাবটি। এর ওপর দলের গোলরক্ষক কর্তোয়া আর নিয়মিত সেন্টারব্যাক মিলিতাওয়ের হাঁটুর চোট অ্যানচেলত্তির কপালের ভাঁজটা বড়ই করেছেন।
দলবদলে আরেক সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হেসুস ভ্যালেহোকে ধারে পাঠানোয় মিলিতাওয়ের অনুপস্থিতিতে রিয়ালের স্কোয়াডে বর্তমানে সেন্টারব্যাক মাত্র তিন জন- ডেভিড আলাবা, আন্তোনিও রুডিগার ও নাচো ফার্নান্দেজ। কিন্তু দীর্ঘ মৌসুমে মাত্র তিনজন সেন্টারব্যাক নিয়ে শুরু করার চিন্তাও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ বটে। মৌসুমে রিয়ালকে কমপক্ষে ৫০টির মতো ম্যাচ খেলতে হবে। এই দীর্ঘ পথচলায় আর কোনো ডিফেন্ডার চোটে পড়বেন না, সেই নিশ্চয়তাও বা কোথায়।
দলবদলের বাজার শুরুর আগে রিয়াল মাদ্রিদের মাথাব্যথা ছিল ফুলব্যাক, রাইট উইঙ্গার এবং স্ট্রাইকার নিয়ে। লেফটব্যাক বাদ দিলে বাকি পজিশনগুলোর কোনোটাতেই যে যোগ্য খেলোয়াড় আসেনি, তা বলাই বাহুল্য। এর মধ্যেই গোঁদের ওপর বিষফোঁড়া হিসেবে আবার রক্ষণভাগে গোলরক্ষক আর সেন্টারব্যাক নিয়ে নতুন দুশ্চিন্তা। কেপাকে ধারে এনে গোলবার সামলানো নিয়ে খানিকটা নির্ভার হলেও রক্ষণভাগ নিয়ে ভাবনা রয়েই যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে নতুন মৌসুমে সামনের দিনগুলোতে মাদ্রিদের জন্য কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। এদিকে, স্প্যানিশ ফুটবলের দলবদলের বাজার বন্ধ হতে এখনো সপ্তাহ তিনেকের মতো সময় বাকি আছে। তবে এত পজিশনের অভাব পূরণে সময়টা একদমই অপ্রতুল। চোট আর খেলোয়াড়ের অভাবের চলমান সংকটকে ৩৫ বারের লা লিগা আর ১৪ বারের ইউরোপ সেরারা কীভাবে সামাল দেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।



