শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জ্ঞান আর গল্পের প্রধান ঠিকানা ছিল লাইব্রেরির বিশাল সব সারি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে, যার বড় প্রভাব পড়েছে বই পড়ার অভ্যাসেও। আলমারির পর আলমারি ঘেঁটে যে বই খুঁজে পেতে একসময় বেশ বেগ পেতে হতো, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই পুরো লাইব্রেরিই এখন জায়গা করে নিয়েছে মানুষের হাতের মুঠোয়।
এখন একটি মাঝারি মানের ই-রিডার বা কিন্ডল ডিভাইসে অনায়াসে হাজার হাজার বই সংরক্ষণ করা সম্ভব। ক্লাসিক সাহিত্য থেকে শুরু করে সমসাময়িক বেস্টসেলার - সবকিছুই এঁটে যায় ব্যাকপ্যাকের ছোট্ট একটি পকেটে। ফলে ঘরজুড়ে বিশাল বুকশেলফের জায়গা বাঁচানো এবং ভ্রমণের সময় ভারী বই বহনের ঝামেলা সামলানোর দিন ফুরিয়েছে। বর্তমানে ই-রিডারের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় কিন্ডল।
কিন্ডল: বই, অভিধান ও নোটবুক সব এক সুতোয়
আধুনিক এই ই-রিডার কেবল বই পড়ার স্ক্রিন নয়, বরং এটি পড়ার অভিজ্ঞতাকে সহজ করার এক চমৎকার ইকোসিস্টেম।
ইন-বিল্ট ডিকশনারি: পড়তে পড়তে কোনো কঠিন বা নতুন শব্দের মুখোমুখি হলে আলাদা করে অভিধান খোলার প্রয়োজন পড়ে না। শব্দের ওপর ট্যাপ করলেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে তার অর্থ ও ব্যাখ্যা।
স্মার্ট নোটবুক: গুরুত্বপূর্ণ লাইনগুলো হাইলাইট করা, মার্জিনে নিজের মন্তব্য বা নোট লিখে রাখা এবং পরে সেগুলো এক ক্লিকে আলাদা ফাইল হিসেবে এক্সপোর্ট করার সুবিধা রয়েছে এতে।
ডিজিটাল ট্র্যাকিং: বিভিন্ন রিডিং অ্যাপ বা অ্যাকাউন্টের সাথে যুক্ত থাকায় একজন পাঠক বছরে কয়টি বই পড়লেন, কোন বইয়ে কতটুকু সময় দিলেন - তার পুরো হিসাব এক জায়গাতেই সংরক্ষিত থাকে।
কিন্ডল - এ ডিজিটাল ফরম্যাটের বই ফ্রিতে পাওয়া যায়। কিন্তু সমস্যা হলো, আইন মেনে ফ্রি বই খুঁজে পাওয়া সবসময় সহজ নয়।
অনেক সময় কিন্ডল স্টোরে হাজার হাজার ফ্রি বই থাকলেও সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায় না, শুধু নির্দিষ্ট একটি অংশই আলাদা করে দেখানো হয়। ফলে ব্যবহারকারীরা সাধারণত ‘কিন্ডল ফ্রি বই’ লিখে সার্চ করেন করে এবং মূল্য অনুযায়ী ফিল্টার ব্যবহার করেন।
এখানেই পাঠকদের জন্য এগিয়ে এসেছে প্রযুক্তি সাইট এনগ্যাজেট। তারা এক ব্লগ পোস্টে জানিয়েছে কিন্ডল প্ল্যাটফর্মে ফ্রি বই পাওয়ার কিছু উপায়:
অ্যামাজনের বেস্ট সেলার তালিকা: প্রতিঘণ্টায় আপডেট হওয়া বেস্ট সেলার তালিকা থেকে সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড হওয়া ফ্রি বই দেখা যায়। ব্যবহারকারীরা চাইলে বইয়ের ধরন অনুযায়ী তালিকা ফিল্টার করে নিজেদের পছন্দের বই খুঁজে নিতে পারেন।
প্রাইম সাবস্ক্রিপশনের সুবিধা: অ্যামাজন প্রাইম ব্যবহারকারীরা বিশেষ কিছু বই প্রোগ্রামের সুবিধা পান। এর মধ্যে রয়েছে ফার্স্ট রিডস, যেখানে প্রতি মাসে সম্পাদকদের নির্বাচিত দুটি বই আগাম পড়ার সুযোগ মেলে।
এছাড়া প্রাইম রিডিং নামের সেবায় একসঙ্গে সর্বোচ্চ ১০টি বই ধার নেওয়া যায়। এখানে হাজারের বেশি বই, ম্যাগাজিন ও কমিকস পাওয়া যায়। কিছু বইয়ে অডিও বর্ণনার সুবিধাও থাকে, যা শ্রবণযোগ্য বইয়ের অভিজ্ঞতা দেয়। বইগুলো নির্দিষ্ট সময়সীমায় সীমাবদ্ধ না থাকলেও একসঙ্গে ১০টির বেশি রাখা যায় না।
স্টাফ ইয়োর কিন্ডল ডে: স্টাফ ইয়োর কিন্ডল ডে নামের বিশেষ প্রচারণামূলক ইভেন্টে লেখকরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের ই-বুক বিনামূল্যে দিয়ে থাকেন। এ ধরনের ইভেন্ট সাধারণত ইন্ডি লেখক ও ছোট প্রকাশনা সংস্থার উদ্যোগে পরিচালিত হয়। পাঠকদের জন্য এটি নতুন লেখক ও নতুন ঘরানা পরিচিত হওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে কাজ করে।
তবে এসব ইভেন্ট খুঁজে পাওয়া সবসময় সহজ নয়। অনেক সময় দেরিতে খুঁজলে ভালো অফার মিস হয়ে যায়। এজন্য বুকবিলো এবং বুকবাবের মতো ওয়েবসাইটে থাকা ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা হয়। বুকটক ও বিভিন্ন ঘরানা ভিত্তিক সোশ্যাল গ্রুপ থেকেও তথ্য পাওয়া যায়।
অনলাইন লাইব্রেরি ওভারড্রাইভের লিব্বি অ্যাপের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা স্থানীয় লাইব্রেরি থেকে বিনামূল্যে ই-বুক ধার নিতে পারেন। এর জন্য শুধু একটি লাইব্রেরি কার্ড প্রয়োজন হয়।
ধার নেওয়া বই নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়, ঠিক সাধারণ লাইব্রেরির নিয়মের মতো। একই সঙ্গে অডিওবুকও পাওয়া যায়, যা ব্যয়বহুল অডিওবুক সাবস্ক্রিপশন কমাতে সাহায্য করে। একাধিক লাইব্রেরি কার্ড থাকলে বিভিন্ন ক্যাটালগ থেকে সহজে বই খুঁজে পাওয়া যায়।
প্রজেক্ট গুটেনবার্গ: প্রজেক্ট গুটেনবার্গ একটি ফ্রি ওপেন সোর্স প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ৭৫ হাজারের বেশি ই-বুক পাওয়া যায়। এটি ই-বুক ধারণার উদ্ভাবকের উদ্যোগে শুরু হয় এবং হাজারো স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমে বইগুলো ডিজিটাল করা হয়েছে।
এখানে মূলত সেসব ক্লাসিক বই রাখা হয়েছে যেগুলোর কপিরাইট মেয়াদ শেষ হয়েছে। ফলে এটি বিশ্বসাহিত্যের একটি বড় মুক্ত সংগ্রহ হিসেবে বিবেচিত। ব্যবহারকারীরা নির্দিষ্ট বই খুঁজে নিয়ে সরাসরি কিন্ডলে পাঠাতে পারেন। এছাড়া বিভিন্ন ফরম্যাটে বই ডাউনলোড করার সুযোগও রয়েছে, যা কিন্ডল ছাড়াও অন্য ই-রিডারে ব্যবহার করা যায়।
কাগজের বইয়ের নস্টালজিয়া ও পাতার ঘ্রাণ চিরন্তন হলেও, ব্যস্ত জীবন ও সুবিধার বিচারে এই অল-ইন-ওয়ান প্রযুক্তি এখন বইপ্রেমীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। সব বই এক জায়গায় পাওয়ার এই আধুনিক লাইব্রেরি দিন দিন হয়ে উঠছে পড়ার অভ্যাসের এক অপরিহার্য অংশ।



