একটির দাম প্রায় ৩০,০০০ টাকা। আর প্রতি কেজির দাম গিয়ে ঠেকে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকায়। আন্তর্জাতিক বাজারে এমনি অদ্ভূত দাম মিয়াজাকি বা সূর্যডিম আমের; যাকে বলা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে দামি আম।
বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু হয়েছে মিয়াজাকি আমের। আমের অন্যান্য জাত থেকে ব্যতিক্রমী হওয়ায় দারুণ সাড়া ফেলেছে জাপানি আমটি।
বিশেষ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই আম রং, স্বাদ-গন্ধ ও আকারে অন্য সব আম থেকে আলাদা। মিয়াজাকি বা সূর্যডিম আমের আকাশচুম্বি দামের পেছনে আসল কারণটা কী, চলুন জেনে নেওয়া যাক।
২০১৬ সালে জাপানের ফুকুওকায় নিলামে এক জোড়া মিয়াজাকি আমের মূল্য উঠেছিল ৫ লাখ জাপানি ইয়েন। মূল্যটি সে সময়ের বাজারদর অনুযায়ী ৪,৫৪৭ মার্কিন ডলারের সমতুল্য। ইন্টারনেটের সুবাদে এই খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই মূলত সবার নজর কাড়ে জাপানি আমটি।
জাপানে মিয়াজাকি আমের সর্বোচ্চ ফলন হয় এপ্রিল থেকে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে। গাছ থেকে সংগ্রহের পর সেরা আমগুলো সরাসরি চলে যায় নিলামে। প্রতি বছর এপ্রিল মাসে জাপানের মিয়াজাকি শহরের পাইকারি বাজারে শুরু হয় এই নিলাম। স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে আমের রং, মিষ্টতা, স্বাদ, ও আকার-আকৃতির বিচারে নির্ধারিত হয় সেরা মানের আম।
নিলামে দেশের বড় বড় ফল ডিস্ট্রিবিউটররা সেগুলোর জন্য বিড করে। গড়পড়তায় নিলামের মূল্য থাকে আমপ্রতি ৫০ মার্কিন ডলার বা ৫,৮৬৩ টাকা। তবে কখনও কখনও এই মূল্য অনেক বেড়ে যায়। এখন পর্যন্ত একটি আমের সর্বোচ্চ দাম উঠেছে ২,০০০ মার্কিন ডলার (২ লাখ ৩৪ হাজার ৫০৩ টাকা)।
২০১৯ সালে জাপানে এক জোড়া মিয়াজাকি আমের দাম উঠেছিল প্রায় ৫,০০০ মার্কিন ডলার, যা সে সময়ের বাজার দর অনুসারে প্রায় ৪ লাখ টাকারও বেশি। ২০২৩ সালে ভারতে এই আমের কেজি বিক্রি হয়েছে আড়াই লাখ রুপিতে।
এমন চোখ কপালে তোলা দামের নেপথ্যে রয়েছে আমটির সুনির্দিষ্ট চাষাবাদ পদ্ধতি এবং দুষ্প্রাপ্যতা। সঠিক পরিবেশের মাঝে সুক্ষ্ম পরিচর্যার মাধ্যমে যে উন্নত মানের আমের উৎপাদন হয় তা পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না। এছাড়া পরিপক্কতা লাভের পর যে গভীর লাল বর্ণটি আসে তা আমের অন্যান্য জাতের মধ্যে বেশ দুর্লভ।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই আমগুলোর কেনাবেচা শুধুমাত্র সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং বিভিন্ন কর্পোরেট উপহার এবং বিশেষ উদযাপনের দিনগুলোতে উপহার হিসেবে বিক্রি হয় এই আম। এমনকি হাত বদলের আগে এগুলোকে যত্ন সহকারে সুক্ষ্ম কারুকাজ মেশানো বাক্স বা মোড়কে ভরা হয়।
উৎকৃষ্ট মানের মিয়াজাকি আমের দাম বেশি হওয়ার আরও কারণ রয়েছে। এই আম অন্য আমের মতো সহজে উৎপাদন করা যায় না। ভালো মানের আমের জন্য কৃষকরা যত্ন সহকারে আম গাছগুলোর জন্য গ্রিনহাউসের ব্যবস্থা করেন। ঘরগুলো ফলের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ সরবরাহ করে। বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিটি আম সতর্কতার সঙ্গে একটি জালে আবদ্ধ করা হয়। এই জাল গ্রিনহাউস সিলিংয়ের সঙ্গে একটি ওভারহেড তারের সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা থাকে। ফলে ঘরে ভেতরে থাকলেও প্রতিটি ফল গ্রিনহাউস গ্লাসে প্রতিফলিত সূর্যালোক পায়। এতে করে বৃদ্ধির পাশাপাশি সেই নজরকাড়া গভীর লাল রং পেতেও সহায়তা করে। ব্যবহার করা হয় যাতে রং অভিন্ন হয়।
সম্পূর্ণরূপে পরিপক্কতা পেয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে আমগুলোকে ছিড়ে ফেলা হয় না। বরং সেগুলো নিজে নিজেই গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়। নিচে স্থিতিশীল জাল থাকায় আমগুলো পড়ে শক্ত আঘাতে ওপরের ত্বক নষ্ট হয়ে যায় না। এভাবে হাতের কোনো স্পর্শ ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে বেড়ে ওঠা আমগুলো তাদের মৌলিক গড়ন, ওজন, গন্ধ ও স্বাদ পায়।
এরপর চূড়ান্তভাবে বাজারে সরবরাহের আগে স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে আমের গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়। এখানে চাষ ও পরিচর্যার পুরোটা সময় কৃষকরা থাকলেও তাদেরকে দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয় না।



বিশ্বের সবচেয়ে দামি আমের দাম বাংলাদেশে কম কেন?
বাংলাদেশের যেসব জায়গায় চাষ হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে দামি আম
আমের জন্ম হয়েছিল কোথায় জানেন?