Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

অঞ্চলভিত্তিক ব্যবসার ঐতিহ্য হারাচ্ছে সতের'শ বছরের পুরোনো পট্টির শহর কুমিল্লা

গবেষকরা বলছেন, অঞ্চলভিত্তিক এসব ব্যবসার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৫, ০৩:৩৯ পিএম

খাদি ও রসমালাইয়ের কথা বললেই যে জেলার নামটি সবার আগে মনে আসে সেটি হলো কুমিল্লা। ১৭শ' বছর আগে গুপ্ত যুগে শহরটির গোড়াপত্তন। তারও চৌদ্দশ' বছর পর এ শহরে ব্যবসা করতে আসেন ব্রিটিশ ও ভারতবর্ষের বণিকরা। তাদের হাত ধরে শহরের রাজগঞ্জ ও চকবাজারে গড়ে উঠে কাপড়িয়াপট্টি, গোয়ালপট্টি, তেরিপট্টি ও ছাতিপট্টিসহ অন্তত ২০টি পট্টির নামে আলাদা ব্যবসায়িক অঞ্চল। এতে কুমিল্লা হয়ে উঠে ভারতবর্ষের অন্যতম সমৃদ্ধ ব্যবসায়িক কেন্দ্র। অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী কুমিল্লা শহর মূলত অর্থনৈতিক গতি পায় গত তিনশ' বছর আগে। কিন্তু কালের বিবর্তনে অনেকটাই জৌলুশ হারিয়েছে এসব ব্যবসায়ীক অঞ্চল। ঐতিহ্য বিলীন হয়ে এসবের জায়গা দখল করে নিচ্ছে অন্য ব্যবসা। গবেষকরা বলছেন, অঞ্চলভিত্তিক এসব ব্যবসার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ।

ব্যবসায়িক অঞ্চলগুলো ঘুরে দেখা গেছে, এলাকাভিত্তিক বেশিরভাগ ব্যবসাই এখন প্রায় বিলীন। যে কয়েকটি এখনও টিকে আছে, সেগুলোতেও নেই আগের মতো জৌলুশ। দেশওয়ালিপট্টিতে নেই দেশওয়ালদের বসবাস, ছাতার দোকান নেই ছাতিপট্টিতে, গোয়ালপট্টিতে নেই গোয়াল, কোণঠাসা কামারপট্টির কামাররাও। সেইসঙ্গে অ্যালুমিনিয়ায়ের দাপটে বিলীনপ্রায় কাঁসারিপট্টি। বাঁশপট্টির পরিধিও কমেছে। একই অবস্থা পানপট্টি, তামাকপট্টি, কসাইপট্টি ও মুচিপট্টির। ঋষিপট্টির অস্তিত্ব কোনরকমে টিকে থাকলেও মুচি কসাইরা গেছেন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। তবে টিকে থাকার দৌড়ে এখনও নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে কাপড়িয়াপট্টি। পুরোনো ঐতিহ্যকে লালন করতে সাধ্যমত চেষ্টা করছেন এ পেশায় জড়িতরা।

কুমিল্লার ইতিহাসবিদদের মতে, কুমিল্লার নগরীর রাজগঞ্জ বাজারের পূর্বে গড়ে ওঠে ছোট ছোট শৃঙ্খলাবদ্ধ এসব ব্যবসায়িক অঞ্চল। ছিল গোছানো পরিপাটি। এক ব্যবসার সঙ্গে অন্য ব্যবসার সংমিশ্রণ ছিল না। বর্তমানে অঞ্চলগুলো বিদ্যমান থাকলেও কালের বিবর্তনে পরিবর্তন হয়েছে ব্যবসার ধারা। অবিভক্ত ভারতবর্ষের অন্যতম ব্যবসায়িক কেন্দ্রবিন্দু ছিল এসব পট্টি। দেশ ভাগের পরও ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত এসব পট্টির আধিপত্য ছিল। ৬৫ পরবর্তীতে ব্যবসায়িক অঞ্চল সীমিত হয়ে আসে। পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশকে আরও সংকুচিত হয়ে আসে। 

এ শহরে দেশওয়ালদের এক সময় দারুণ প্রতিপত্তি ছিল। ভারতের রাজস্থান থেকে আসা দেশওয়ালদের বসবাস ছিল এ অঞ্চলে। শহরের অনেক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে তারা। তাদের পর গিরিধারি ও ক্ষৈত্রীয়রা এই অঞ্চলে বসবাস করেন। কুমিল্লা নগরীর রাজগঞ্জ বাজারের দক্ষিণাংশে দেশওয়ালি পট্টি নামে একটি পট্টির নাম থাকলেও দেশওয়ালদের বসবাস নেই এই পট্টিতে।

কাপড়িয়া পট্টিতে কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলাসহ নানা অঞ্চলের থান কাপড় আনা হতো। ওই সময়ে রেডিমেড বলতে শুধুমাত্র স্যান্ডো গেঞ্জি ছিল। ছেলেরা নিমা আর ফতুয়া পরতো। হাফ শার্ট, ফুল শার্ট, পাঞ্জাবি ছিল। শার্ট, ফতুয়া এসব ছিল তিন পকেটের। ওপরে একটি বুক পকেট, নিচের দিকে দুই হাত বরাবর দুই পকেট রাখা হতো। কুমিল্লাতে এখনও কাপড়িয়া পট্টি নামে একটি অঞ্চল আছে। আগের জৌলুস নেই, তবে কাপড়িয়া পট্টি ছাড়াও বস্ত্রের দোকান নগরীর অলিগলি ছেয়ে গেছে। পট্টির কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে অগোছালোভাবে।

আর স্বর্ণপট্টি। স্বর্ণপট্টির নাম পূর্বে আঞ্চলিক ভাষায় হোনারু পট্টি ছিল। পরে সোনারু, বর্তমানে এর নাম হয় স্বর্ণপট্টি। কুমিল্লা নগরীর রাজগঞ্জ বাজারের পূর্ব দিক লাগোয়া এই অঞ্চলটি এখনও শৃঙ্খলিত ব্যবসায়িক অঞ্চলের একটি। আগেকার দিনে উঁচু বংশীয় লোকজনই ভারী গহনা পরতো। বেশিরভাগ মানুষ ছিল দরিদ্র শ্রেণির। বিয়েশাদি ব্যতীত তারা স্বর্ণ খুব কম ব্যবহার করতো। দোকানগুলোতে তেমন চাকচিক্য ছিল না। বর্তমানে স্বর্ণপট্টির দোকানগুলোতে চাকচিক্য বেড়েছে। প্রচুর ভারী ভারী গহনা আছে। এসবের চাহিদা তুমুল।

রাজগঞ্জ বাজারের দক্ষিণে গোয়ালপট্টি। কুমিল্লার মিষ্টি, রসমালাইয়ের যে ঐতিহ্য তার ধারাপাত হয় এই গোয়ালপট্টি থেকেই। এখনও দধি-মিষ্টির বেশকিছু দোকান আছে গোয়াল পট্টিতে। এটি আরও সম্প্রসারিত হয়ে চলে গেছে নগরীর কান্দিরপাড় ও রাজগঞ্জ বাজারের মাঝামাঝি মনোহরপুরে। গোয়াল পট্টিতে ঘোষরাই বংশ পরম্পরায় তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন। মনোহরপুরে ঘোষরা ছাড়াও অন্য সম্প্রদায় এবং মুসলিমরা মিষ্টান্ন উৎপাদন করছেন।

কামারপট্টি। চকবাজারের উত্তরে আমির দিঘী সংলগ্ন স্থানে কামারট্টির অবস্থান আজও আছে। তবে চীনা ও স্টিলের পণ্যের কারণে কামাররা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। পট্টির বাইরেও শহরের নানা প্রান্তে কামাররা ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছেন। যা প্রকৃত কামারদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তেরিপট্টি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য মেলেনি। সাধারণত নগরীর মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজনের বাসস্থান ছিল চকবাজার, মোগলটুলি, চর্থা, সংরাইশ এলাকায়। তাদের পছন্দের খাবার ছিল তেহারি। সে থেকেই এই নামের উৎপত্তি হতে পারে বলে মনে করেন কুমিল্লার ইতিহাস-ঐতিহ্য গবেষক আবুল কাশেম হৃদয় মনে করেন চাল, ডাল, বুট, বাদাম, পেঁয়াজ, মসলাসহ পাইকারি পণ্য বিক্রির কেন্দ্রবিন্দু এই চকবাজার। নানা রকম পণ্যের সমাহারের কারণে এর নাম তেরি পট্টি।

কালের বিবর্তনে অনেকটাই জৌলুশ হারিয়েছে এসব ব্যবসায়ীক অঞ্চল/ঢাকা ট্রিবিউন

বাঁশপট্টি। একসময় কুমিল্লায় ছনের ঘর ছিল বেশি। ছনের ঘরে বাঁশ ও বাঁশজাত পণ্যের চাহিদা ছিল। ছনের ঘরের পর টিনের ঘরেও এর চাহিদা ছিল। এখনও এর চাহিদা আছে। তবে কম। সে কারণে বাঁশপট্টির পরিধিও ছোট হয়ে এসেছে।

কাঁসারি পট্টির খুব নামডাক ছিল। কমদামি অ্যালুমিনিয়ায়ের বিস্তারের কারণে কাঁসার পণ্য বিলীন প্রায়। কাঁসার হাঁড়ি-পাতিল, কলসি, পূজার সামগ্রীর কদর ছিল কুমিল্লায়। কাঁসারিপট্টি নামে থাকলেও কাঁসার দোকানপাট তেমনটা দেখা যায় না।

মেথরপট্টি। কুমিল্লা, বাংলাদেশ এমনকি গোটা ভারতবর্ষে ৫০ বছর পূর্বেও বলার মতো স্যানিটারি ল্যাট্রিন ছিল না। সেসময়ে কুমিল্লায় সার্ভিস ল্যাট্রিন নামে এক প্রকারের ভ্রাম্যমাণ ল্যাট্রিন ছিল। রাত ১০টার পর মেথরপট্টির মেথররা এসব পরিষ্কার করতো। সময়ের দাবিতে মেথরপট্টি হারিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

এ শহরে সাহা সম্প্রদায় ছাড়াও কর্মকার, মোদক বা কুড়ি, স্বর্ণকার, ঘোষ, কুমার, তেলি, নাপিত ইত্যাদি সম্প্রদায়ের লোকজন ব্যবসাপাতির নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। ব্যবসার সাথে সম্পৃক্তদের জন্য ছিল পানশালা। মনোরঞ্জনের জন্য সিনেমা হল আর আমোদ-ফুর্তির জন্য বর্তমানে চকবাজার বাসস্ট্যান্ডের পাশে একটি পতিতালয় ছিল।

ব্যবসায়ীক অঞ্চলগুলো জৌলুশ হারানোর পিছনে ইতিহাসবিদরা মনে করেন, ১৯৬৫ সালে আইয়ুব সরকার কিছু বিষয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ওই সময়েই অনেক বণিক বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। তাছাড়া সময়ের বিবর্তনে কিছু ব্যবসাপাতির প্রয়োজন ফুরিয়ে আসে। যার কারণে পট্টি অঞ্চলও ছোট হয়ে আসে। কিছু কিছু পট্টি আবার বিলীনও হয়ে যায়।

বিলীন হওয়া পট্টির মধ্যে অন্যতম হলো তামাক পট্টি। তামাক পট্টি ছিল পান পট্টি লাগোয়া। পাশে ছিল রূপালী সিনেমা হল। যা আজও চালু আছে। এর পাশেই বর্তমান চকবজার বাসস্ট্যান্ডের পাশে ছিল পতিতালয়। মুচি পট্টি ও মেথর পট্টিতে চোলাই মদ পাওয়া যেতো। বাবু সাহেবরা বেশ্যালয়ে নেশাজাতীয় সুগন্ধি তামাক সেবন করতেন। সাথে থাকতো হুক্কা। বংশানুক্রমে হুক্কার রং সংরক্ষিত ছিল। ছেলেরা এ রং তৈরি করতে পারতো। মেয়েদের তা শেখানো হতো না। কারণ স্বামীর পরিবারে গেলে কাজটি অন্য কেউ শিখে ফেলার শঙ্কা থাকতো।

পানশালার বৈধ মদ ছাড়াও চোলাই মদ পান করতেন বাবু সাহেবরা। কালের বিবর্তনে পানপট্টি, তামাকপট্টি দুটিই বিলীন হয়ে যায়। যদিও চকবাজারের ওই অঞ্চলে পান-তামাকের ব্যবসা আছে। তবে তা সীমিত।

কুমিল্লার ইতিহাস-ঐতিহ্য গবেষক ও কুমিল্লার কাগজের সম্পাদক আবুল কাশেম হৃদয় মনে করেন, কুমিল্লাতে কমপক্ষে তিনশ বছর পূর্বে এসব পট্টির সম্প্রসারণ শুরু হয়। তিনি বলেন, কুমিল্লাতে ১৪৫৮ সালে মহারাজা ধর্মমাণিক্য বাহাদুর ধর্মসাগর দিঘী খনন করেন। এ থেকে বোঝা যায়, তারও পূর্ব থেকে কুমিল্লা নগরকেন্দ্রিক মানুষের বসবাস ছিল। যেহেতু ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ অবিভক্ত ছিল, সেহেতু এটা স্পষ্ট যে এই পট্টি শুধুমাত্র পূর্ববাংলার ব্যবসায়িক কেন্দ্রবিন্দু ছিল না, এটা ছিল গোটা ভারতবর্ষের অন্যতম ব্যবসায়িক কেন্দ্রবিন্দু।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এখানে দিল্লি, রাজাস্থানের বণিকরা, মোগলরা, সুফিরা তাদের বাসস্থান গড়ে তুলেছিলেন। তাছাড়া নৌপথে বাংলাদেশ ও ভারতে যাতায়াতের জন্য মেঘনা, ডাকাতিয়া ও গোমতীর সংযোগ ছিল এই কুমিল্লায়। বাংলাদেশের সকল জেলার মানুষের সহজ যাতায়াতের সুযোগ ছিল। বোঝাই যায়, চকবাজার কেন্দ্রিক এই পট্টি কতটা গুরুত্ববহ ছিল।

ইতিহাস-ঐতিহ্য গবেষক আহসানুল কবির বলেন, কুমিল্লাতে জিলা, ফয়জুন্নেছা স্কুল ও ভিক্টোরিয়া কলেজের মতো প্রতিষ্ঠান ছিল। যার কারণে অন্য জেলার মানুষরাও এখানে আবাসন গাড়া শুরু করেন। ধীরে ধীরে কুমিল্লা মানুষে ভরপুর হয়ে যায়। ব্যবসার ধাঁচ পাল্টে যায়। আর পট্টিগুলো চলে যায় অন্ধকারে।

কুমিল্লার ইতিহাস-ঐতিহ্য গবেষক ও কুমিল্লার কাগজের সম্পাদক আবুল কাশেম হৃদয় বলেন, কুমিল্লা ছিল পরিপাটি গোছালো শহর। শহর ছিল দুই ভাগে বিভক্ত। রাজগঞ্জের পশ্চিমে আবাসন পূর্বদিকে ব্যবসা। উত্তরে সরকারি অফিস, আদালত ইত্যাদি। দক্ষিণাংশে স্থানীয় আদিবাসীদের বসবাস ছিল। শহরে তেমন কোনো ট্রাক ছিল না। ট্রেন ও নদীপথে কুমিল্লায় মালামাল আনা-নেওয়া হতো। একসময় শহর রাজগঞ্জের পশ্চিম দিকে ধাবিত হয়। নতুন নতুন পাড়া, তলা, গাঁও ইত্যাদি নাম দিয়ে মানুষের আবাসন শুরু হয়। ভবন ওঠা শুরু হয়। ব্যবসাপাতিরও আর শৃঙ্খলা থাকে না। পট্টির শহর হয়ে যায় শুধুই শহর।

এ দুই গবেষক মনে করেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বে দূরদর্শিতা থাকলে চকবাজার কেন্দ্রিক এই বাণিজ্য কেন্দ্রটি বাংলাদেশের জন্য মডেল হতে পারতো। কিন্তু সুদূরপ্রসারী চিন্তা করার মতো মানুষের জন্ম খুব কমই হয়েছে। রাষ্ট্রীয় কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগই পারে অঞ্চলভিত্তিক এসব ঐতিহ্যবাহী ব্যবসার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে। এতে ব্যবসায়িক ঐতিহ্য সমৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়বে কুমিল্লার।

   

About

Popular Links

x