ঢাকার সাভারের রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর পার হলেও বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিয়ে হতাশা কাটেনি ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও তাদের পরিবারের। একইভাবে আশুলিয়ার তাজরিন গার্মেন্টসের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাতেও ন্যায়বিচার ও দায়ীদের শাস্তি এখনো অনিশ্চিত। এ প্রেক্ষাপটে শ্রমিক সংগঠনগুলো সাত দফা দাবি তুলে ধরে দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বিকেলে রানা প্লাজা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু এসব দাবি তুলে ধরেন।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ভবন ধসে পাঁচটি পোশাক কারখানার অন্তত ১ হাজার ১৩৮ জন শ্রমিক নিহত হন এবং আড়াই হাজারের বেশি শ্রমিক আহত হন। ঘটনার আগের দিন ভবনে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিলেও শ্রমিকদের জোর করে কাজে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এই অবহেলা ও দায়িত্বহীনতাকেই শ্রমিক নেতারা “পরিকল্পিত শ্রমিক হত্যা” হিসেবে উল্লেখ করেন।
এর মাত্র পাঁচ মাস আগে, ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তাজরিন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডে ১১৪ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। অভিযোগ রয়েছে, কারখানার গেট বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা বের হতে না পেরে প্রাণ হারান। এ ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও অধিকাংশই এখন জামিনে মুক্ত।
শুধু এই দুটি ঘটনাই নয়, এর আগে ২০০৫ সালে আশুলিয়ার স্পেকট্রাম গার্মেন্টসে ৭৩ জন এবং ২০১০ সালে হামিম গ্রুপের দ্যাটস ইট স্পোর্টস ওয়্যারে ২৯ জন শ্রমিক নিহত হন। এসব ঘটনার পরও ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও চিকিৎসা নিশ্চিত না হওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে শ্রমিকদের মধ্যে।
শ্রমিক নেতারা বলছেন, “বারবার দুর্ঘটনা ঘটলেও দায়ীদের শাস্তি না হওয়ায় মালিকদের মধ্যে নিরাপত্তা বিষয়ে উদাসীনতা তৈরি হয়েছে। ফলে একই ধরনের ঝুঁকি এখনো বহাল রয়েছে অনেক কারখানায়।“
রানা প্লাজা ও তাজরিন ট্র্যাজেডির আন্তর্জাতিক গুরুত্বও রয়েছে। এসব কারখানায় ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক তৈরি হতো। শ্রমিক নেতারা মনে করেন, এসব ব্র্যান্ডেরও নৈতিক ও আইনি দায় রয়েছে।
খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, “শ্রমিকদের জীবন কোনোভাবেই অবহেলার বিষয় নয়। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষের দায়িত্ব।”
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন তাজরিনের শ্রমিক জরিনা বেগম, রানা প্লাজার শ্রমিক নিলুফা ইয়াসমিন, সংগঠনের সভাপতি ইদ্রিস আলী, আহত শ্রমিক মুনির ও হৃদয় এবং সাভার ইউনিটের সভাপতি সাইফুল্লাহ আল মামুন।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে সাত দফা দাবির মধ্যে রয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পুনর্মূল্যায়ন করে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিমের আওতায় অন্তর্ভুক্তি, দায়ীদের বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, অনুদানের হিসাব প্রকাশ, দায়ীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যবহার, স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও ২৪ এপ্রিলকে শ্রমিক হত্যা দিবস ঘোষণা, এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা।
শ্রমিক নেতারা বলছেন, এসব দাবি বাস্তবায়ন না হলে রানা প্লাজা ও তাজরিনের মতো ট্র্যাজেডি আবারও ঘটতে পারে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।



