Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বান্দরবনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চলে ভাড়াটে শিক্ষক দিয়ে

আলীকদমে মাসের পর মাস ধরে ৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকার অভিযোগ উঠেছে

আপডেট : ০৭ মে ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অনুপস্থিতির কারণে ভাড়াটে (বর্গা) শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয়ে পাঠদান চলছে। মাসের পর মাস ধরে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসীর দাবি, নিয়মিত বেতন তুললেও শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন ‘বর্গা’ শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয়ের কাগজপত্র হালনাগাদ ও স্কুল খোলা রাখার কাজ করানো হচ্ছে। তবে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রমের কোনো অস্তিত্ব নেই বিদ্যালয়ে। শ্রেণিকক্ষের টেবিল-চেয়ারে ধুলো জমে গেছে। শিক্ষকরা দুই তিন মাস পর একদিন এসে রাত যাপন করে পরদিন চলে যান। এতে শিশুদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিদ্যালয়ে শিক্ষক না থাকায় শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। শিক্ষকদের বিদ্যালয় বিমুখ হওয়ায় বছরের পর বছর ধরে শিক্ষা ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। যেসব শিক্ষার্থীরা বইখাতা নিয়ে স্কুলে যায়, কিছুক্ষণ খেলাধুলা করে বাড়ি ফিরে আসে।

কুরুকপাতা ইউনিয়নের কমচঙ ইয়ুংছা মাওরুমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খিদুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও রাংলাই দাংলিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাগজে কলমে অন্তত ২০০ ছাত্রছাত্রী অধ্যায়ন করলেও মাত্র কয়েকজন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে। তবে থাকেন না কোনো শিক্ষক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইয়ুংছা মাওরুমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক অভিভাবক জানান, পাঁচজন শিক্ষক আছেন। তাদের  মধ্যে অন্তত দুজন যদি নিয়মিত ১০ দিনও ক্লাস নিতেন, তাহলেও আপত্তি ছিল না। সরকার স্কুল করেছে, কিন্তু সেই স্কুল এখন আমাদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খিদুপাড়ার বাসিন্দা তুমলন ম্রো বলেন, “এ বছর মাত্র তিনবার শিক্ষকরা স্কুলে এসেছেন, দায়িত্ব পালন না করলে তারা চাকরি নিয়েছেন কেন? অভিযোগ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছি, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা হয় না।”

জানা গেছে, ২০১০ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) অর্থায়নে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে আলীকদম উপজেলায় ২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। বিদ্যালয়গুলোর অনেকগুলোই দীর্ঘদিন কার্যক্রমহীন থাকলেও ২০১৭ সালে জাতীয়করণ করা হয়। সে সময় ঘুষ ও অনিয়মের মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। ২০টি স্কুলের মধ্যে সবমিলিয়ে ৩ থেকে ৪টি স্কুল চলে।

খিদুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ নাঈম বলেন, “বিদ্যালয় দুর্গম এলাকায় হওয়ায় নিয়মিত যাওয়া সম্ভব হয় না, বদলির জন্য চেষ্টা করছি।”

অভিযুক্ত অন্য এক শিক্ষক আরিফ বিল্লাহ বলেন, “ঈদের পরে একবার গিয়েছিলাম, রাতে থেকে পরদিন চলে এসেছি।”

এদিকে, রাংলাই দাংলিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নুক্যএ মংয়ের বিরুদ্ধে মোবাইলে অনলাইন ক্যাসিনো খেলায় আসক্ত থাকার অভিযোগ তুলেছেন সহকর্মীরাই।

অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের কাছ থেকে মাসোহারা নিয়ে এসব অনিয়মের বিষয়ে নীরব রয়েছে খোদ উপজেলা শিক্ষা অফিস। কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তাও এই সুবিধার অংশ পান।

মংচিং হেডম্যান পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল আবচার বলেন, “আলীকদমে প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান অবস্থা ভালো না। শিক্ষকদের অনুপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে, যার ফলে যারা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন ও পাঠদান করেন, তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।”

আলীকদম উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শামসুল আলম বলেন, “শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে না গিয়ে বেতন নিচ্ছেন এমন অভিযোগ আমাদের নজরে এসেছে। তদের বেতন বন্ধ করা হবে।”

আলীকদম উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মনজুর আলম বলেন, “শিক্ষকরা নিয়মিত স্কুলে যান না। ভাড়াটে শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় চালানোর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন অভিযোগে ১৩ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে জেলা পরিষদের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিয়েছি, সামনে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

   

About

Popular Links

x