স্থানীয় ও পাকিস্তান-ভিত্তিক জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলার পাশাপাশি সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে বিরোধীদের নির্যাতন ও ভয় দেখানোর জন্য বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের ২০০১-০৬ মেয়াদ দেশের ইতিহাসে কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।
বিএনপির বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতাসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক অধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ও মিডিয়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে এবং বিএনপির আপাত উত্তরাধিকারী তারেক রহমান ও তার "হাওয়া ভবন"র বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তোলে।
সম্প্রতি বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা তারেক রহমান ও হাওয়া ভবনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিডিয়ার সৃষ্টি বলে দাবি করেছেন।
তবে প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টির ভাষ্য, সরকারি ক্রয় কার্যক্রম এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে ঘুষ নেওয়ার জন্য তারেক রহমান বাংলাদেশ সরকারের দুর্নীতি এবং সহিংস রাজনীতির প্রতীক।
২০০৬ সালের এপ্রিলে প্রবীণ রাজনীতিবিদ কর্নেল (অব.) অলি আহমদ তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তোলেন। মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালেও তিনি তারেক রহমানের এসব কর্মকাণ্ডেরর জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন
২০০৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে অলি আহমেদ প্রকাশ্যে তার দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষকতার করার অভিযোগ তোলেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতার আস্থাভাজন বীর মুক্তিযোদ্ধা অলি আহমেদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য পশ্চিমা কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে বিএনপির উত্তরাধিকারীকে "বিপজ্জনক ও অপরিণত" বলে উল্লেখ করেন।
বগুড়ার সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ তারেকের সমালোচনা করে বলেন, তার চালচলন ছিল "রাজকীয়” এবং তার আচরণ ছিল “আপত্তিজনক”। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন দূতাবাসের এক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে সংস্কারপন্থী গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ বলেন, "তারেক যখন রাজনীতিতে আসে তখন আমরা তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিলাম না। আমরা খুব অস্বস্তিতে ছিলাম।"
তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিস ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে বলেছিলেন, তারেকের কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট বিএনপি নেতারা বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তিগতভাবে অভিযোগ জানিয়েছেন এবং তার দুর্নীতির হাত অনেক শক্তিশালী বলেও উল্লেখ করেছেন।
দেশের তৎকালীন উদীয়মান এই নেতা সম্পর্কে রাষ্ট্রদূত বলেন, "কেউ কেউ দাবি করেন যে, তারেকের বিরোধীতা করায় হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ওপর গোয়েন্দ নজরদারি বাড়ানো হয়।”
২০০৭ সালে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের আগে ও পরে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করতে তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। হারিস চৌধুরী এবং গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের মতো অসাধু সহযোগীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
কখনো রাজনীতিতে না জড়ানোর শর্তে জেল থেকে প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার পর তারেক রহমান ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর লন্ডনে চলে যান, তারপর থেকে সেখানে বসেই দল পরিচালনা করছেন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ২০০৫ সালে বেশ কয়েকটি বোমা হামলাসহ ক্রমবর্ধমান সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা সেই সময়ে বাংলাদেশকে মানবাধিকার সংকটের শেষ প্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।
২০০৬ এক প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, ২০০৫ সালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছিল। দেশটি সারা বছর ধরে প্রায় প্রতিদিনই বোমা হামলা দেখেছে। যার মধ্যে ৬৩ জেলায় একযোগে বিস্ফোরণের ঘটনাও হয়েছে, যার সবগুলোই জেএমবি কর্তৃক সরকারি প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছিল।
এতে বলা হয়, "গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বেড়ে যাওয়ায় কয়েক লাখ হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান দেশ ছেড়ে পালিয়েছে।"
সেই সময়ে নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার গোষ্ঠীটি বলেছে, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বল প্রয়োগ এবং হেফাজতে নির্যাতনসহ অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। প্রতিবাদ করা মানবাধিকার কর্মী এবং এসব বিষয়ে প্রতিবেদন করা সাংবাদিকদের হয়রানিও ভয় দেখানো হচ্ছে।
জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা
২০০১ সালের নির্বাচনের পরপরই সরকার সমর্থকরা সারাদেশে আওয়ামী লীগ কর্মী এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংস হামলা চালায়।
এ বিষয়ে সাবেক জেলা জজ ও রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে ২০০৯ সালে তিন সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। দেশব্যাপী সংঘটিত আঠার হাজারের বেশি ঘটনায় বিএনপি-জামায়াত সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর জড়িত থাকার প্রমাণ পায় কমিটি।
র্যাব গঠনের আগে খালেদা-তারেক সরকার ২০০২ সালের ১৭ অক্টোবর থেকে ২০০২ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশে "অপারেশন ক্লিন হার্ট" নামে নির্মম যৌথ অভিযান চালায়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, সেই সময়ে যৌথ বাহিনীর হাতে আটকের পর নির্যাতনে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়। পরে অবশ্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা ও সেনা সদস্যদের বিচার থেকে জাতীয় সংসদের মাধ্যমে দায়মুক্তি দেওয়া হয়।
নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামি বাংলাদেশের (হুজি-বি) প্রধান মুফতি আবদুল হান্নান আদালতে জানান, তিনি ২০০৪ সালের আগস্টের মাঝামাঝি "হাওয়া ভবনে" এক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। সেই সময়ে তাকে সার্বিক সহযোগিতার জন্য স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুকে নির্দেশ দেন তারেক রহমান।
মিডিয়া প্রতিবেদন বলছে, নব্বই দশকের শেষের দিকে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে দেখা হওয়া আফগান যুদ্ধে অংশ নেওয়া কয়েকজন জঙ্গি বাংলাদেশে হুজি গঠন করে। ১৯৯২ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারা প্রকাশ্যে হামলা শুরু করে। ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের তৎকালীন হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী এবং শাহ এএমএস কিবরিয়াসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর গ্রেনেড হামলা চালায় হুজি।
পর্ব ১: ডার্ক প্রিন্স ও তার ‘হাওয়া ভবন'
২০০৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে টমাস ওয়াশিংটনে লেখা এক চিঠিতে উল্লেখ করেন, এই ধরনের ঘটনাগুলো (২০০৪ সালে সংঘটিত) সমাধানে সরকারের অক্ষমতা বা অনিচ্ছা অপরাধী ও জঙ্গিদের রাজনৈতিক সুরক্ষা প্রদান করবে।
একই বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে টমাস। এই বৈঠকের বিষয়ে এক বার্তায় তিনি লিখেছেন, ২১ আগস্ট হামলার পর আমাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করছি কারণ, ঘটনার আলামত সংগ্রহে সরকারের অনীহা রয়েছে এবং প্রধান সাক্ষীদের সঙ্গে এটিএফ পরামর্শদাতাদের সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
২১ আগস্টের ঘটনার তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে, শাহ এমএএস কিবরিয়া হত্যার তদন্ত অর্থবহ করতে মার্কিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সম্পৃক্ততা চেয়েছিলেন হ্যারি কে টমাস।
তিনি উল্লেখ করেন, ২০০৪ সালে ২১ মে যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী এবং ২১ আগস্ট ঢাকায় গ্রেনেড হামলার বিষয়ে তদন্ত করতে চেয়ে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডেরও তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে।
পর্ব ২: ডার্ক প্রিন্স ও তার ‘হাওয়া ভবন': টাকার পাহাড়
২০০৫ সালের ১৩ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আগের রাতে তারেক রহমানের ধানমন্ডির শ্বশুরবাড়ি থেকে একটি গাড়িতে চারজন অস্ত্রের চালান নিয়ে যায়।
২০০৪ সালে গোয়েন্দা সংস্থা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সহায়তায় চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী দল উলফার জন্য অস্ত্র বোঝাই একটি জাহাজ চলাচলের সুযোগ করে দেয় "হাওয়া ভবন"।
২০০৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) এবং জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি) এর সঙ্গে তারেক রহমানের যোগাযোগের কথা জানান।
তিনি জানান, তারেক রহমানের সঙ্গে ফোনালাপের পর তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর নির্দেশে বাংলা ভাইয়ের প্রধান সহযোগী খামারুকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ।
সেই সময়ে স্থানীয় কিছু সন্ত্রাসীদের ওপর হামরা চালানোয় বাংলা ভাই রাজশাহী বিভাগে বেশ আলোচিত ছিলেন। কয়েকজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও তাকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ ছিল। এসব মন্ত্রীদের কেন জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে না, এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাকে লুৎফুজ্জামান বাবর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন, "এটি একটি কঠিন প্রশ্ন।”
মার্কিন দূতাবাসের আরেক টেলিগ্রামে উল্লেখ করা হয় যে, ২০০৭ সালের এপ্রিলে পুলিশের মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদ মিডিয়াকে বলেছিলেন যে, জেএমবির পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সাবেক টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী আমিনুল হক এবং সাবেক সংসদ সদস্য নাদিম মুস্তাফা জড়িত।
আরেক বার্তায় বলা হয়, ২০০৪ সালে রাজশাহী ও নাটোর এলাকায় বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ এবং বামপন্থীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযান পরিচালনার জন্য বাংলা ভাইকে যুক্ত করেছিলেন আমিনুল হক।



