Saturday, May 25, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রোহিঙ্গা পাচারের টাকা: ভাগ নেয় এপারে আরসা, ওপারে আরাকান আর্মি

  • খু্ব শিগগিরই সাত শতাধিক রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছাড়তে পারে
  • পাচারকারীদের টার্গেট নারী ও শিশুরা
  • ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় পাচারকারীদের হাতে টাকা তুলে দেয়
আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২৪, ০৫:১৫ পিএম

কক্সবাজার থেকে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচার থেমে নেই। পাচারের প্রধান টার্গেট ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গারা। একটি প্রভাবশালী চক্র এ কাজ করে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানবপাচারের পেছনে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের কয়েকটি যৌথ গোষ্ঠী জড়িত। সাগরপথে বিদেশ যেতে আগ্রহী রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে নেওয়া টাকার ভাগ পাচ্ছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আরসা ও মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি।

ঢাকা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে এসব তথ্য মিলেছে। 

টার্গেট নারী ও শিশুরা

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাচারকারীদের টার্গেট নারী ও শিশুরা। সরেজমিনে টেকনাফ-উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। চক্রের বিরুদ্ধে ভয়ে কথা বলতে চায় না তারা। কারণ, পাচারকারীদের সঙ্গে ক্যাম্পের অবস্থানরত সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর যোগসাজশ রয়েছে।

গত ছয় মাসে সাগরে বেশ কয়েকটি রোহিঙ্গাবোঝাই নৌকা আটকে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গ্রেপ্তার হয়েছে কয়েকজন দালাল।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেওয়া তথ্য বলছে, গত ১৩ ডিসেম্বর সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের সময় টেকনাফের উপকূলীয় এলাকা থেকে নারী ও শিশুসহ ২৪ জন রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে পুলিশ।

২৫ নভেম্বর আন্তঃসীমান্ত অপরাধীদের একটি চক্র ৫৭ জন রোহিঙ্গাকে বিদেশে নেওয়ার কথা বলে মিয়ানমারে পাচার করে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করছিল। টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন সৈকত থেকে তাদের উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী এবং শিশু। তারা সবাই উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা। বিদেশ যাওয়ার জন্য তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা করে নিয়েছে পাচারকারীরা। আরও ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ছিল।

ইউএনএইচসিআর বলছে, ২০১৮-২৩ সালে প্রায় ৯ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করেছে। তাদের মধ্যে ৫৮৯ জনের সলিলসমাধি হয়েছে। নিখোঁজও হয়েছে অনেকে।

উখিয়া মানবপাচার প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল হামিদ বলেন, “অনেকেই সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। এর আগেও একই রুট দিয়ে প্রভাবশালী একটি চক্র মানবপাচার করে আসছিল। এবারও যদি আগের মতো পাচার শুরু হয়, তাহলে বিষয়টি খুব উদ্বেগজনক।”

কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি মো. মুহিব উল্লাহ বলেন, ‘‘দালালদের হাত ধরে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার হিড়িক পড়েছে। ইতোমধ্যে তিন শতাধিক রোহিঙ্গা সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছে। এবারের সিজনে সাত শতাধিক রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে যেতে পারে বলে শুনেছি। মালয়েশিয়ায় যেতে প্রায় তিন লাখ টাকা লাগে। এসব টাকার বড় একটা অংশ নেয় আরসা ও আরাকান আর্মি। দুই পারের দুই গোষ্ঠীকেই সন্তুষ্ট করা লাগে।’’

গন্তব্য মালয়েশিয়া

বিভিন্ন সময় সাগরপথে পাড়ি দিতে গিয়ে উদ্ধার হওয়া বেশিরভাগ ব্যক্তির ভাষ্য, তাদের অনেক স্বজন রয়েছে মালয়েশিয়াতে। তাদের সঙ্গেই যোগাযোগ করেই ক্যাম্প নিয়েছিলেন ক্যাম্প ছাড়ার প্রস্তুতি। আশ্রয়ের আশা ও ভালো থাকার লোভে পাড়ি জমালেও মালয়েশিয়ার বাস্তবতা ভিন্ন।

অভিযোগ রয়েছে, মালয়েশিয়ায় গিয়েও তাদের নানান নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়।

বিয়ের প্রলোভন

ক্যাম্পের চেয়ে ভালো থাকার আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করে এসব রোহিঙ্গা। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে, মানবপাচারকারীরা তাদের টার্গেট করে। বিশেষ করে নারীদের। কারণ মালয়েশিয়ায় থাকা রোহিঙ্গা পুরুষদের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার জন্য ক্যাম্পের মেয়েদের নিয়ে যায় সেদেশে থাকা স্বজনরা। তবে উখিয়ার একটি ক্যাম্পের প্রধান মাঝি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রোহিঙ্গা নারীদের মালয়েশিয়ায় বিয়ে হলেও, ওখানে থেকে বড় একটি অংশ অন্যান্য দেশে যেতে চায়। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া, জার্মানিসহ ইউরোপের দেশগুলোতে।

রোহিঙ্গাদের মধ্যে অবিবাহিত নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা সাহিদা বেগম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমার চার মেয়েকে নিয়ে বেশ মুশকিলে আছি। এখানে বাঁশ-বেতের বেড়ার ঘর। বেড়ার ছিদ্র ও ফাঁকা ঘরে বখাটেরা প্রায়ই উৎপাত করে। ঘরে মেয়েদের রাখা খুব কঠিন।”

টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান নূরুল আলম বলেন, “এই চক্রে স্থানীয় ও রোহিঙ্গা চক্র জড়িত। বিষয়টি নিয়ে আমরাও উদ্বিগ্ন। থানা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এ নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হয়।”

টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদ মাহমুদ আলী বলেন, “রোহিঙ্গাদের অনেকের আত্মীয়স্বজন মালয়েশিয়ায় থাকে। তারাই ক্যাম্পে থাকা স্বজনদের সমুদ্রপথে অবৈধভাবে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। আমরা তো সবসময় পাহারা দিয়ে রাখতে পারি না। প্রতিনিয়তই এই ধরনের ঘটনা ঘটে। এসব লোকজন বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশি পরিচয় দেয়। এটি খুব দুঃখজনক।”

তিনি আরও বলেন, “রোহিঙ্গা পাচারের টাকার ভাগ শুধু আরসা নেয়, এমন না। ওপারে আরাকান আর্মিও নেয়। টাকা না দিলে ওরা গুলি করে। এজন্য ওদেরও টাকা দেয় মানবপাচারকারীরা।”

পাচারে ব্যবহার হচ্ছে যেসব পয়েন্ট

রোহিঙ্গাদের বিদেশে পাচারের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় টেকনাফের বেশ কয়েকটি পয়েন্ট। সেগুলোর মধ্যে টেকনাফের শামলাপুর, শীলখালি, রাজারছড়া, জাহাজপুরা, সবারাং, শাহপরীরদ্বীপ, কাটাবনিয়া, মিঠাপানিরছড়া, জালিয়াপালং, ইনানী, হিমছড়ি, রেজুখাল, কুতুবদিয়াড়া, খুরুশকুল, চৌফলদণ্ডি, মহেশখালী উল্লেখযোগ্য। এছাড়া, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এবং মাঝিরঘাট এলাকা থেকেও ট্রলারে মানবপাচার হয়ে থাকে। স্থানীয় বাংলাদেশিদের পাশাপাশি পাচার চক্রে জড়িত বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা। তারা সবাই টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পের বাসিন্দা।

পাচারে জড়িত দুই হাজার ব্যক্তি

২০১৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর মানবপাচারের একটি তালিকা তৈরি করে পুলিশের সদর দপ্তরের স্পেশাল ক্রাইম অ্যান্ড প্রসিকিউশনে পাঠানো হয়। এতে ১১ জন আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী, ২৬ জন হুন্ডি ব্যবসায়ী এবং কক্সবাজারের ২৩০ জনসহ সারাদেশ থেকে প্রায় ৩০০ মানবপাচারকারীর নাম রয়েছে।

তবে তালিকা থেকে কক্সবাজার জেলার প্রায় ৫০০ মানবপাচারকারীর নাম বাদ পড়ে যায়। যারা ভয়ঙ্কর।

তালিকা ধরে শুরু হয় মানবপাচারকারী দমনের অভিযান। প্রথম পর্যায়ে কক্সবাজারের শীর্ষ মানবপাচারকারী ধলু হোসেনসহ জেলার ছয় পাচারকারী পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। গ্রেপ্তার হয় দেড় শতাধিক। গ্রেপ্তার এড়াতে জেলার তালিকাভুক্ত ও তালিকার বাইরের প্রায় দুই হাজার পাচারকারী  আত্মগোপন করে। এরপরেই সমুদ্রপথে মানবপাচার কমে আসে।

কিন্তু গত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংস ঘটনার পর প্রাণভয়ে আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশে পালিয়ে আসে বহু রোহিঙ্গা। এরপর মানবপাচারে সংশ্লিষ্টতা দ্বিগুণ হয়ে যায়।

দায়িত্বশীলরা যা বলছেন

মানবপাচার কেন বন্ধ হচ্ছে না, এক্ষেত্রে পুলিশ কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে জানতে চাইলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘আমরা মানবপাচাররোধে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু পাচারের শিকার ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় দালালদের টাকা দিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় যাচ্ছে। এক্ষেত্রে তাদের উদ্ধারে আমাদের চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়। স্থানীয় পর্যায়ে যেসব পাচারকারী সক্রিয়, তাদের ধরতে অভিযান শুরু করব আমরা।’’

এ বিষয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন  কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত কথা বলি, মিটিং করি কীভাবে পাচার কমানো যায়। তাছাড়া তাদের নিয়ে জনসেচতনতামূলক অনেক কাজ করে থাকি।”

পাচারের টাকার ভাগ আরসা-আরাকান আর্মি নেয়, এমন তথ্য জানেন কি-না? প্রশ্নে “না” সূচক উত্তর দেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক তানজিম উদ্দিন খান বলেন, “আসলে শুধু আইনি কাঠামো তৈরি করে রোহিঙ্গা অভিবাসন কমানো সম্ভব নয়। শক্তিধর ও বিবেকবান রাষ্ট্রগুলোকে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের যথাযথ মর্যাদায় স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করতে হবে। সেদেশে তাদের নিরাপদ আবাসের নিশ্চয়তা দিতে হবে। এতেই সব সমস্যার সমাধান নিহিত।”

About

Popular Links