Wednesday, May 22, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সোয়াই নদী: দুই প্রজন্ম এতদিন শুধু নামই শুনেছে

  • দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছে প্রশাসন, স্থানীয়রা
  • খনন শেষ হলে ময়মনসিংহের সঙ্গে নদীপথে যুক্ত হবে নেত্রকোনা
  • পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, সেচ কাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সহজতর হবে
আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:২৩ পিএম

ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণা জেলার মিলনস্থলে একটি ব্যস্ত জনপদ শ্যামগঞ্জ বাজার। ময়মনসিংহ থেকে আসা রেললাইন এখান থেকেই দুই ভাগ হয়ে চলে গেছে নেত্রকোণার সীমান্তবর্তী দুই উপজেলা মোহনগঞ্জ ও পূর্বধলার দিকে। এই বাজারে সারাবছর ধান কেনা-বেচা হয়। অন্যান্য কৃষিপণ্য, মাছ এবং বিখ্যাত গরুর হাটে প্রচুর লোকসমাগম হয়। এছাড়া এখানে আছে এই অঞ্চলের বড় বড় কয়েকটি চাল কল, যেখান থেকে পাশের জেলা হয়ে ঢাকাসহ সারাদেশে চাল সরবরাহ করা হয়।

হিন্দু-মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভ্রাতৃসুলভ সহাবস্থান, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে অগ্রযাত্রা, একাত্তরে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ, স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন এবং সব প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডে শ্যামগঞ্জের সুনাম আছে।

এসবের পাশাপাশি এখানকার শিশু থেকে মধ্যবয়সীদের কাছে আর যে বিষয়টি গত ৪০-৫০ বছর গল্পের মতোই ছিল তা হলো- সোয়াই নদী। এটি পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের একটি শাখা। আশির দশকে জন্ম নেওয়া এলাকার অনেকেই ছোটবেলায় শ্যামগঞ্জ বাজারের মধ্য দিয়ে নালার মতো প্রবাহমান একটি জলধারা দেখেছেন। অগ্রজদের কাছে তারা শুনেছেন এটি আসলে নালা বা খাল নয়, এটি সেই সোয়াই নদী যা ময়মনসিংহের সঙ্গে নেত্রকোণা শহরকে নদীপথে যুক্ত করেছে।

শ্যামগঞ্জের কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, ভূমিদস্যু ও নদীখেকো দখলদারদের হস্তক্ষেপে গত ৫০ বছরে নাব্য হারাতে হারাতে একসময় শুকিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায় এই নদী। প্রায় এক কিলোমিটার প্রশস্ত সোয়াই নদীর স্রোতধারা ও পাড়ে গড়ে ওঠে দোকানপাট, বাড়িঘর, ইটভাটা ও কৃষিজমি।

নদীটি ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদীর চরনিলক্ষীয়া ভাটিপাড়া থেকে উৎপন্ন নদীটি শ্যামগঞ্জ বাজার দিয়ে দাপুনিয়া বাজারের কুকুয়ালি খালের সঙ্গে মিলে নেত্রকোণার মগড়া নদীতে মিলে গেছে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৬ কিলোমিটার। একসময় এই নদীতে অনেক মাছ পাওয়া যেত আর সেচের জন্য পানিও আসত এখান থেকে। অন্যদিকে ব্যবসায়ী, কৃষক ও জেলেদের কাছে নৌপথই ছিল একমাত্র ভরসা।

সোয়াই নাব্য হারিয়েছে, একই সঙ্গে মহাসড়ক হয়েছে প্রশস্ত। ফলে স্থানীয় জনসাধারণ ট্রেন ও বাসেই চলাচল করছেন। বিগত প্রায় এক দশক ধরে স্থানীয়রা নদীটি পুনরুদ্ধার ও খননের জন্য নিয়মিত আন্দোলন করেছেন।

কয়েক বছর আগে সাবেক সংসদ সদস্য ওয়ারেসাত হোসেন বেলালের উদ্যোগে নদীটি খননের উদ্যোগ নেওয়া হলেও একে “সোয়াই খাল” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে স্থানীয় সচেতন মহল ফুঁসে ওঠে। তারা এই খননকাজকে লোক দেখানো ও অকার্যকর হিসেবে মতামত দেয়।

এককালের প্রবাহমান সোয়াই নদীর স্রোতধারা দখল করে নালা বানিয়ে ফেলা হয়েছে। দু`পাশে তোলা হয়েছে দোকান/ঢাকা ট্রিবিউন

এরপর এটিকে সোয়াই নদী হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে খননের উদ্যোগ নেয় সরকার।

খননকাজকে সাধুবাদ জানালেও স্থানীয়দের একাংশের দাবি, খননকাজের সময় যেন কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, যেমন মসজিদ, মন্দির, কবরখানা বা শশ্মান যেন ভেঙে ফেলা না হয়।

মরা নদী এখন দৃশ্যমান

এই নদীপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৬ কিলোমিটার। আর শ্যামগঞ্জ বাজারের অবস্থান এর মাঝামাঝি জায়গায়। আর এখানেই দখলদারদের দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি।

গত বছর শুরু হওয়া চলমান এই প্রকল্পের আওতায় নদীর পুরনো মানচিত্র দেখে নেত্রকোণা জেলার আওতাধীন সোয়াইসহ মোটি তিনটি নদী ও ১২টি খাল পুনঃখননের কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ফলে নদীর প্রস্থ হবে ৩০ মিটার এবং গভীরতা হবে ২০ মিটার।

এর মধ্যে ময়মসিংহ ও নেত্রকোণা অংশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইউসুফ ব্রাদার্স ও আমিন অ্যান্ড কোম্পানি খনন চালিয়ে যাচ্ছে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৭ কোটি টাকা।

অতি সম্প্রতি খননকাজে ব্যবহৃত এক্সক্যাভেটরগুলো শ্যামগঞ্জের কাছাকাছি পৌঁছালে এলাকাবাসীর মধ্যে বিপুল সাড়া ফেলে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাজার হাজার উৎফুল্ল মানুষ নদীর তীরে গিয়ে খননকাজ দেখছেন।

বৃদ্ধরা খুশি, কারণ তাদের চিরচেনা নদীতে আবার পানি আসবে! শিশু থেকে মধ্যবয়সীদের মধ্যে এই খননকাজ এক নতুন অভিজ্ঞতার জন্ম দিচ্ছে।

স্থানীয়রা বলছেন, মরা সোয়াই নদীতে পানি এলে এলাকায় প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে। সেচের পানি, পণ্য পরিবহন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই নদী বিরাট ভূমিকা রাখবে। তারা মনে করেন, নদীর খননকাজ শেষ হলে এটি এই এলাকায় একটি উদাহরণ তৈরি করবে এবং ভবিষ্যতে আর কেউ নদী-খাল-বিল বা পুকুর ভরাটের সাহস পাবে না।

তবে গত কয়েক সপ্তাহে দখলদাররা নানাভাবে খননকাজ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।

সিএস মৌজা ম্যাপ দেখিয়ে তারা দাবি করছে শ্যামগঞ্জ বাজারে সেতুর উত্তর ও দক্ষিণ পাশে নদীর জমিতে বাড়ি, দোকান, ইটের ভাটা এবং বিভিন্ন স্থাপনাগুলো বৈধ। তার মানে এখানে কোন নদীই ছিলো না। উদ্ভট এ দাবি নিয়ে হাজির হয়েছেন শ্যামগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী তিলক কুমার রায় টুলু, শেখ সালাউদ্দিন (চাঁন মিয়া), খোকন মিয়া ও সালাম মিয়া।

সোয়াই নদীতে খননকাজ/ঢাকা ট্রিবিউন

ধান-চালের আড়ৎ, ইলেকট্রনিক্স শোরুম ও ওষুধের ব্যবসায়ী টুলু রায়ের দাবিকে অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন স্থানীয়রা। সব দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার দাবিতে মহাসড়কে নিয়মিত মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করছে সচেতন মহল।

স্থানীয়রা বলেন, সোয়াই নদী ছাড়াও বাজারের পূর্ব পাশে রেলওয়ের জমি এবং বৃহদাকৃতির একটি বিখ্যাত পুকুর দখলের পাঁয়তারা করছে কিছু ভূমিদস্যু। সেই উদ্দেশ্যে গত কয়েক বছর ধরে পুকুরে নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা ফেলে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জায়গা ভরাট করে ফেলা হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এই পুকুরটিও অদৃশ্য হয়ে যাবে বলে তাদের আশংকা।

এছাড়া রেল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারনে রেললাইনের পাশে অবৈধভাবে ঘর ও দোকানপাট তুলে ব্যবসা করছে দখলদারেরা।

‘যেকোনো মূল্যে কাজ শেষ হবে’

স্থানীয়রা বলছেন, দখলদার প্রভাবশালী পরিবারগুলোর কারণেই কয়েক যুগ ধরে নদী পুনরুদ্ধার ও খনন কাজ শুরু করা যায়নি। আর এখন যেহেতু শুরু হয়েছে, তাই নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে তারা সব ধরনের সহায়তা করবেন।

শ্যামগঞ্জ উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হারুন আল বারি বলেন, ‘‘স্বাধীনতার পর থেকে একটি গোষ্ঠী সোয়াই নদী দখল করে আসছিল। ফলে শ্যামগঞ্জ এলাকায় নদীটি নাব্য হারিয়ে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। নদীর বুকে অনেকে পাকা ঘরবাড়িও নির্মাণ করেছেন। আমরা দীর্ঘদিন ধরে নদীর সীমানা নির্ধারণ ও খননের দাবি জানিয়ে আসছি। পানি উন্নয়ন বোর্ড এখন সোয়াই নদী খননের কাজ করেছে। আর স্বার্থান্বেষী মহল কাজ বন্ধের পাঁয়তারা করে নানা জায়গায় চেষ্টা-তদবির করে যাচ্ছে।’’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় স্কুলের এক শিক্ষক বলেন, “পাট, আলু ও ধান বোঝাই করা হাজার মণের নৌকা এই নদীতে চলত। নদীর শুরুর ভাগ থাকলে অবশ্যই শেষপ্রান্তও আছে। নদী তার সঠিক গন্তব্যে না পৌঁছা পর্যন্ত এর সুফল ভোগ করা যাবে না।”

তিনি আরও বলেন, “নদী যেহেতু একটি জীবন্ত সত্তা সেহেতু এটাকে ধ্বংস করার কোনো সুযোগ নেই। দখলদারেরা সিএস, আরএস যা কিছুই দেখাক না কেন, এগুলো তৈরি করা হয়েছে নদী সৃষ্টির বহু বছর পর।”

এ বিষয়ে নেত্রকোণা জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রকৌশলী মো সারওয়ার জাহান বলেন, “টুলু রায়ের দাবির বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। তবে ম্যাপ অনুযায়ী খননের কাজ চলছে।”

এ বছরের শেষদিকে খনন শেষ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে গৌরীপুর উপজেলার পাউবো কর্মকর্তারা বলেন, “দীর্ঘদিন পর সোয়াই নদী খননের কাজ চলছে। দখলদারদের কারণে কোনো জটিলতা তৈরি হলে বিধি অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নেত্রকোণা জেলা প্রশাসক শাহেদ পারভেজ জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে কর্তৃপক্ষ সব দখলদারদের উচ্ছেদ করে খননকাজ চালিয়ে যাবে।

একই রকম ইঙ্গিত দেন নেত্রকোণা-৫ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আহমদ হোসেন। তিনি বলেন, “খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে দখলদারদের উচ্ছেদ করে নদী খননের কাজ শেষ হবে।”

খননকাজ বন্ধে দখলদারদের দেনদরবারের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মাহফুজ মাসুম বলেন, “সরকার নদী রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। জেলার সব নদী ও খাল-বিলের নাব্য রক্ষায় সবাই আন্তরিকতার সাথে কাজ করছে।”

About

Popular Links