বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আক্রমণকারীদের বিচারের ব্যবস্থা, আওয়ামী লীগ আমলের সব উপাচার্যের দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ, মাদকমুক্ত ও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস, ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতি সংস্কারসহ ৪১ দফা প্রস্তাবনা দিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবির।
রবিবার (৩ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব প্রস্তাবনা পেশ করেন সংগঠনটির তিন নেতা।
তারা হলেন- শিবিরের সভাপতি হারুনুর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক মহিবুর রহমান ও প্রচার সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন।
তাদের অন্যান্য প্রস্তাবনাগুলো হলো- গণঅভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তির স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে; ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হামলায় অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে অপরাধের মাত্রা ও সীমা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে বহিষ্কার, সনদ বাতিল, ভর্তি বাতিল, পদ বাতিল, নিয়োগ বাতিল বা প্রাসঙ্গিক সাজা দেওয়ার পাশাপাশি মামলা করে রাষ্ট্রীয় আইনে বিচারের আওতায় আনা; ১৬ জুলাইকে সন্ত্রাস প্রতিরোধ দিবস ঘোষণা; ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার মূল কারিগর শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তিদের নামে সব স্থাপনার নাম পরিবর্তন করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের শহীদদের নামে নামকরণ।
প্রস্তাবনার মধ্যে আছে, জাকসু, হল সংসদ ও বিভাগওয়ারি শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা; সাবেক উপাচার্য ফারজানা ইসলামের আমলের উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতিসহ স্বৈরাচার আমলের সব উপাচার্যের দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ; ফ্যাসিবাদী আমলে ক্যাম্পাসে সংঘটিত সব ছাত্র নিপীড়ন, র্যাগিং ও নির্যাতনমূলক ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও রাষ্ট্রীয় আইনে যথাযথ বিচারের ব্যবস্থা করা; বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সংঘটিত প্রতিটি খুন ও শিক্ষার্থী হত্যার পূর্ণাঙ্গ বিচারের ব্যবস্থা করা; আবাসিক হলের নিয়মতান্ত্রিক আসন বণ্টন নিশ্চিত করা; গত ১৬ বছরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অবৈধভাবে হল দখলের ঘটনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারের আওতায় আনা ও মাদকমুক্ত ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা।
প্রস্তাবের মধ্যে আরও আছে, শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগের পদ্ধতি অবিলম্বে বাতিল; ফ্যাসিস্ট সরকারের বিগত ১৫ বছরে সব অবৈধ নিয়োগ বাতিল করার লক্ষ্যে উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন; নারী শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ নিরাপদ ক্যাম্পাস তৈরি; ছাত্রী হলগুলোতে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকসহ অন্য কর্মকর্তাদের শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা; পোশাকের কারণে কোনো শিক্ষার্থী যেন শ্রেণিকক্ষে ও ক্যাম্পাসে শিক্ষক, সহপাঠী বা অন্যদের দ্বারা নিগৃহীত না হন, এটা নিশ্চিত করার জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা; নারী নির্যাতন ও নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে যৌন নির্যাতনবিরোধী সেলের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অপসারণ করে অবিলম্বে নতুন কমিটি গঠন করা।
সংবাদ সম্মেলনে শাখা ছাত্রশিবিরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের বিষয়ে সেক্রেটারি মুহিবুর রহমান মুহিব বলেন, “দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেওয়া হয়নি। ইতোমধ্যে আমরা প্রকাশ্যে কাজের ঘোষণা দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকা আমাদের মন মানসিকতা সম্পন্ন শিক্ষার্থীরা সাড়া দিতে শুরু করেছেন। আমরা খুব দ্রুতই তাদের একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে এনে উপর্যুক্ত সময়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করবো।”
প্রস্তাবনা পাঠ শেষে শিবির নেতারা বলেন, “আমরা আমাদের আন্দোলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এই প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছি। আমাদের মূল লক্ষ্য একটি সুষ্ঠু, নিরাপদ এবং আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ছাত্র সংগঠন হিসেবে কাজ করে যাওয়া, যেখানে সকল শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ ও সম্মান থাকবে। আমাদের বিশ্বাস, একটি কার্যকরী ও সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা কেবল শিক্ষার গুণগত মান বাড়াবে না, বরং আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শক্তিশালী, সচেতন এবং নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।”
এর আগে, গত ২৯ অক্টোবর রাতে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রকাশ্যে রাজনীতির ঘোষণা দেন শাখা ছাত্রশিবিরের নেতারা। এ সময় এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে শাখা ছাত্রশিবিরের এ তিন নেতা প্রকাশ্যে আসেন।
উল্লেখ্য, ১৯৮৯ সাল থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ছিল।



