Wednesday, July 22, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

নিজের জন্য শেষ কবে কিছু করেছিলাম? 

‘আমাদের সবার জীবনেই এমন একটা জায়গা থাকা দরকার, যেখানে কোনো দর্শক নেই, কোনো লাইক নেই, কোনো মন্তব্য নেই, আছে শুধু নিজের সঙ্গে নিজের দেখা হওয়া’

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম

একটা সময় ছিল, যখন শখের সঙ্গে কোনো হিসাব জড়িয়ে থাকতো না। বিকেলের একটু অবসর মানেই ছিল আমার নিজের একটা ছোট্ট পৃথিবী। চা বানাতে বানাতে অকারণে গুনগুন করে গান গাইতাম। বারান্দার টবগুলো নিজের পছন্দমতো রং করতাম। টিনটিনের সঙ্গে কখনো মিশর, কখনো তিব্বত, কখনো আবার সমুদ্র পেরিয়ে অজানা কোনো দেশে হারিয়ে যেতাম। খাতার শেষ পাতায় দু-একটি লাইন লিখে রাখতাম, যা আর কাউকে পড়ানোর প্রয়োজন হতো না। ঈদের আগে নিজের হাতে শুভেচ্ছা কার্ড বানাতাম, পুরোনো ম্যাগাজিন কেটে স্ক্র্যাপবুক তৈরি করতাম। বাসার ছাদে উঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুড়ি ওড়ানো দেখতেও যে এতো আনন্দ হতে পারে, তখন সেটাই ছিল খুব স্বাভাবিক।

এসবের কোনোটাই কোনো ভবিষ্যৎ গড়ার পরিকল্পনা ছিল না। ছিল শুধু ভালো লাগার জন্য। তারপর একসময় বড় হয়ে গেলাম। আর বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের প্রায় প্রতিটি কাজের পাশে একটি অদৃশ্য প্রশ্নচিহ্ন বসে গেল-এটা থেকে কিছু হবে তো? “কিছু হবে তো?” -এই চারটি শব্দই হয়তো আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনের সবচেয়ে পরিচিত প্রশ্ন। আমরা এখন আর শুধু কাজ করি না; প্রতিটি কাজেরই একটা পরিচয় বানাতে চাই। একটা দক্ষতা, একটা সনদ, একটা আয়, কিংবা অন্তত একটা সামাজিক স্বীকৃতি। হয়তো সে কারণেই নিজের আনন্দের জন্য করা কাজগুলোকেও আজকাল ব্যাখ্যা দিতে হয়।

কয়েক দিন আগে এক পরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। একসময় সাংবাদিকতা করতেন, এখন পুরোদস্তুর উন্নয়নকর্মী। আমার মতোই তার দিন কাটে বাজেট, স্ট্র্যাটেজি, ওয়ার্কপ্ল্যান, রিপোর্ট আর মিটিংয়ের ভেতর। কথায় কথায় তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “এখনও লেখেন?” তিনি একটু হেসে বললেন, “লিখি। শুধু আর ছাপার জন্য লিখি না। নিজের জন্য লিখি।” কথাটা শুনে আমি অদ্ভুতভাবে চুপ হয়ে গিয়েছিলাম। সেদিন বাসায় ফিরে কথাটা আমাকে আর ছাড়েনি। আমরা ঠিক কবে থেকে ধরে নিলাম, পেশা বদলালে ভালোবাসাটাও বদলে ফেলতে হয়? সাংবাদিকতা ছেড়ে দিলে কি নিজের জন্য লেখা যায় না? পেশাদার আলোকচিত্রী না হলেই কি ছবি তোলা বন্ধ করে দিতে হবে? সংগীতশিল্পী না হয়েও কি নিজের ঘরে গান গাওয়া যাবে না? অফিসের কাজ, সংসারের দায়িত্ব, পেশাগত পরিচয়-এসবের বাইরে কি মানুষের আর কোনো ব্যক্তিগত ভেতর থাকে না?

আসলে আমরা শুধু অন্যের অনুমোদনই চাই না; ধীরে ধীরে নিজের কাছ থেকেও অনুমতি নেওয়া ভুলে যাই। কোনো কিছু শুরু করার আগে ভাবি-মানুষ কী বলবে? ক’জন পড়বে? ক’জন পছন্দ করবে? ক’জন বাহবা দেবে? হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল, আমরা আনন্দ আর অর্জনকে এক জিনিস ভেবে ফেলেছি। যা করি, তার একটা ফল চাই। একটা স্বীকৃতি চাই। অন্তত একটা ব্যাখ্যা চাই। যেন শুধু ভালো লাগার জন্য কিছু করা এখন আর যথেষ্ট নয়।

আমি নিজেও কি এই ফাঁদে পড়িনি? আমি নিজেও আজকাল দিনের বড় অংশ কাটাই বাজেট, স্ট্র্যাটেজি, ওয়ার্কপ্ল্যান, ডোনর রিপোর্ট আর মিটিংয়ের ভেতর। এই কাজটাকেও আমি ভালোবাসি। কারণ এই কাজের মধ্যেও মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার স্বপ্ন আছে, দায়িত্ব আছে, অর্থ আছে।

কিন্তু দিনের শেষে যখন “সুবর্ণ”-এর কোনো পাণ্ডুলিপি খুলে বসি, তখন মনে হয় আমি আরেকটা কাজ করছি না; আমি নিজের কাছেই ফিরছি। মজার ব্যাপার হলো, দুটো কাজেই আমি সম্পাদনা করি। একদিকে ডোনর রিপোর্টের ভাষা ঠিক করি, অন্যদিকে কোনো পাণ্ডুলিপিতে লাল দাগ টানি। বাইরে থেকে দেখলে দুটোই সম্পাদনা। অথচ আমার কাছে তারা দুটো ভিন্ন রকমের প্রাপ্তি। একটি আমাকে জীবনে চলার পথের খোরাক দেয়। অন্যটি দেয় মনের খোরাক।

দিনের শেষে দুটোই আমি। কোনোটাকেই অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু দিনের শেষে যখন “সুবর্ণ” প্রকাশনার জন্য কোনো পাণ্ডুলিপি হাতে নিই, তখন সেটি দ্বিতীয় কোনো কাজ বলে মনে হয় না। বরং মনে হয়, দিনের সব কোলাহলের পর নিজের সবচেয়ে পরিচিত জায়গাটায় ফিরে এসেছি। অনেকেই জানতে চান, এতো ব্যস্ততার মধ্যেও প্রকাশনার সঙ্গে কেন জড়িয়ে আছি। প্রশ্নটা শুনে আমার বরং মনে হয়, সব কাজের ব্যাখ্যা কি একই হয়? কিছু কাজ জীবিকা দেয়। কিছু কাজ পরিচয় তৈরি করে। আবার কিছু কাজ আছে, যেগুলো আমাদের ভেতরের মানুষটাকে বাঁচিয়ে রাখে।

নতুন কোনো পাণ্ডুলিপি পড়তে বসা, প্রুফে লাল দাগ টানা, একটি প্রচ্ছদ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা, কিংবা ছাপা হয়ে আসা নতুন বইয়ের প্রথম কপিটা হাতে নেওয়া-এসবের কোনো সহজ আর্থিক হিসাব নেই। কিন্তু আছে এক ধরনের নীরব তৃপ্তি। এমন এক তৃপ্তি, যা দিনের শেষে মনে করিয়ে দেয়, আমরা শুধু কাজ করার জন্য জন্মাইনি; অনুভব করার জন্যও জন্মেছি।
হয়তো এই টানটা আরো গভীর, কারণ বইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আজকের নয়।

ছোটবেলায় বাবাকে দেখতাম, একটি বইয়ের প্রুফ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আছেন। কখনো একটি কমা, কখনো একটি বানান, কখনো একটি শব্দের ব্যবহার-এসব নিয়েই তার এতো মনোযোগ। তখন বুঝতাম না, একটি কমার জন্য এতো সময় কেন! বড় হতে হতে বুঝেছি, তিনি শুধু একটি বই সম্পাদনা করছিলেন না; তিনি আমাকে শিখিয়ে দিচ্ছিলেন, যত্নেরও একটি ভাষা আছে। আজ যখন “সুবর্ণ” প্রকাশনার কোনো পাণ্ডুলিপি হাতে নিই, তখন মনে হয় আমি শুধু একটি বইয়ের কাজ করছি না; সেই ভাষাটাই নতুন করে শিখছি।

আজও কোনো পাণ্ডুলিপি পড়তে পড়তে মনে হয়, বাবা থাকলে হয়তো এই শব্দটা আমাকে বদলাতে বলতেন! তখন বুঝি, কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাদের শেখানো যত্ন আমাদের হাতের ভেতর রয়ে যায়। হয়তো বাবা আমাকে শুধু প্রকাশনার কাজ শেখাননি। শিখিয়েছিলেন, সব কাজের ফল চোখে দেখা যায় না। কিছু কাজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কাজটির ভেতরেই লুকিয়ে থাকে। 

আবার বড় হতে হতে আমার মনে একটি প্রশ্নের উদয় হয়-আমার এই কাজ করে কি হবে? “কিছু হবে কি?”-এই শব্দগুলোই হয়তো আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনের সবচেয়ে পরিচিত প্রশ্ন। আমরা এখন আর শুধু কাজ করি না; প্রতিটি কাজেরই একটা পরিচয় বানাতে চাই। দক্ষতা, সার্টিফিকেট, আয়, কিংবা অন্তত একটা সামাজিক স্বীকৃতি। হয়তো সে কারণেই নিজের আনন্দের জন্য করা কাজগুলোকেও আজকাল ব্যাখ্যা দিতে হয়।

অথচ প্রশ্নটা অন্য রকমও হতে পারতো। আমি কি এতে আনন্দ পাচ্ছি? এই প্রশ্নটি আমরা কবে যেন হারিয়ে ফেলেছি। হয়তো সে কারণেই বড় হতে হতে আমাদের অনেক শখই হারিয়ে যায়। হারিয়ে যায় না বললে ভুল হবে-আমরা সেগুলোকে নিজের হাতেই বিদায় জানাই। কারণ সেগুলো থেকে “কিছু” হয় না। সেগুলো দিয়ে সিভি ভারী হয় না, আয়ের পথ খোলে না, সামাজিক পরিচয় তৈরি হয় না। অথচ মানুষ কি শুধু পরিচয় দিয়ে বাঁচে?

আমার বাবার কাছ থেকেই আমার শেখা-সব কাজ লাভের জন্য করা হয় না। কিছু কাজ মানুষকে একটু ভালো মানুষ করে। কিছু কাজের দাম থাকে না, কিন্তু মূল্য থাকে অনেক। হয়তো এই কারণেই আজও পুরান ঢাকার বাসার ছাদে দাঁড়িয়ে ঘুড়ি ওড়ানো বিকেলগুলোর কথা মনে পড়ে। নিজের ঘুড়ি ছিল কি ছিল না, সেটা কখনো বড় বিষয় ছিল না। কার ঘুড়ি কেটে গেলো, কোনটা বাতাসে ভেসে আরো ওপরে উঠ্ল, কোনটা ছাদের পর ছাদ পেরিয়ে কোথায় হারিয়ে গেলো-এসব দেখতেই সন্ধ্যা নেমে আসতো। আনন্দ পাওয়ার জন্য তখন অংশগ্রহণ করতেই হতো না। উপস্থিত থাকাটাই যথেষ্ট ছিল। ঈদের আগে নিজের হাতে কার্ড বানানোর সেই আনন্দেরও কোনো বিকল্প ছিল না। রঙিন কাগজ, পুরোনো ম্যাগাজিন, আঠা, কাঁচি-ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতাম। পেপার বা ম্যাগাজিনের পাতা কেটে কেটে স্ক্র্যাপবুক বানাতে গিয়ে সময় কোথায় চলে যেত, টেরই পেতাম না। টিনটিনের একটা বই খুললেই মনে হতো আমিও বুঝি আফ্রিকা বা তিব্বতের অভিযানে বেরিয়ে পড়েছি কুট্টুশকে সাথে নিয়ে। তখন এসবের কোনোটাই কাউকে দেখানোর জন্য করতাম না। এগুলো ছিল আমার নিজের ছোট্ট পৃথিবী।

আজ ভাবি, সেই পৃথিবীটা কোথায় গেল? আমরা কবে থেকে আনন্দ পাওয়ার আগেই আনন্দ দেখানোর কথা ভাবতে শিখলাম? সবকিছু কি সত্যিই প্রকাশ করতে হয়? সব ছবি কি পোস্ট করতেই হবে? সব অনুভূতির কি দর্শক প্রয়োজন? আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিরুদ্ধে নই। আমিও ছবি দিই, লিখি, আনন্দ ভাগ করে নিই। কিন্তু কখনো কখনো মনে হয়, আমরা কি ধীরে ধীরে নিজের জন্য বেঁচে থাকার ছোট্ট জায়গাটা হারিয়ে ফেলছি? হঠাৎ মাঝেমধ্যে আমি নিজেকেই প্রশ্ন করি-আমার এখনকার সব কাজে আসলে আমি কোথায়? আমার ভেতরে কি এখনও সেই মানুষটা আছে, যে অকারণে চা বানাতে বানাতে বেসুরো গলায় গুনগুন করে গান গাইতো? যে শুধু ভালো লাগার জন্য একটা খাতার শেষ পাতায় রফিক আজাদের বা রুদ্র’র কবিতার দু-একটি লাইন লিখে রাখতো? যে নিজের হাতে বানানো একটা কার্ড দিয়ে বন্ধুর মুখের হাসি দেখেই খুশি হয়ে যেতো?  

হয়তো আমাদের সবার জীবনেই এমন একটা জায়গা থাকা দরকার, যেখানে কোনো দর্শক নেই। কোনো লাইক নেই। কোনো মন্তব্য নেই। আছে শুধু নিজের সঙ্গে নিজের দেখা হওয়া। আমার কাছে সবচেয়ে বিপজ্জনক দিনটি সেই দিন, যেদিন আমরা নিজের জন্য কিছু করা বন্ধ করে দেই। তারপরও জীবন কিন্তু থেমে থাকে না। কাজ বাড়ে। পরিচয় বাড়ে। দায়িত্বও বাড়ে। শুধু একদিন হঠাৎ মনে হয়-অনেক দিন নিজের সঙ্গে বসা হয়নি। হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন কিছু হয়ে ওঠা নয়। বড় হতে হতে যাকে কোথাও রেখে এসেছি, তার কাছেই আরেকবার ফিরে যাওয়া!

 

 শাহরিন হক
প্রকাশক, সুবর্ণ প্রকাশনী
   

About

Popular Links

x